নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৮ নভেম্বর, ২০২৬
সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২ ফটকের সামনে মুক্তির পর চা-শ্রমিক নাইটু মুণ্ডা রাজু (লাল গেঞ্জি পরা)। ইনসেটে বিএনপি নেতা নাসিম হোসাইন।
একটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল চা-শ্রমিক নাইটু রাজু মুণ্ডার (৫০)। সেই সাজা মাথায় নিয়ে ২০০৩ সাল থেকে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন তিনি। জীবনের ২৩টি বছর কেটে গেছে কারাগারের চার দেয়ালের ভেতর। সম্প্রতি সাধারণ ক্ষমায় তার কারাদণ্ড মওকুফ হয়। কিন্তু মুক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজার টাকার অর্থদণ্ড। এই টাকা পরিশোধের সামর্থ্য ছিল না তার পরিবারের। দীর্ঘ কারাভোগের পরও তাই মুক্তি মিলছিল না রাজুর।
অসহায় চা-শ্রমিকের মুক্তির পথে টাকার এই বাধার কথা উঠে আসে জেলা আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সভায়। বিষয়টি সভায় তুলে ধরেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কর্মকর্তা তৈমুর হোসেন চৌধুরী। সভায় উপস্থিত সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন বিষয়টি শুনে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থদণ্ডের ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের দায়িত্ব নেন। তার দেওয়া টাকায় শেষ পর্যন্ত মুক্তির পথ খুলে যায় রাজু মুণ্ডার।
রবিবার (৮ নভেম্বর) সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২ থেকে মুক্তি পান তিনি। দীর্ঘ ২৩ বছর পর কারাগারের ফটক পেরিয়ে বাইরের পৃথিবীতে পা রাখার মুহূর্তটি ছিল তার জন্য আবেগের। প্রবেশন কর্মকর্তা ও সিনিয়র জেল সুপারের উপস্থিতিতে মুক্তির পর আপ্লুত হয়ে পড়েন রাজু। যার আর্থিক সহায়তায় মুক্তি মিলেছে, সেই বিএনপি নেতা নাসিম হোসাইনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বনিক বলেন, একটি হত্যা মামলায় দণ্ডিত হয়ে ২০০৩ সাল থেকে কারাগারে ছিলেন নাইটু মুণ্ডা রাজু। জেল কোডের ৫৬৯ বিধান অনুযায়ী, কোনো কয়েদি ২০ বছর সাজা ভোগ করলে মানবিক দিক বিবেচনায় সাধারণ মুক্তির সুযোগ রয়েছে। সেই বিধান অনুযায়ী আবেদন করার পর রাজুর মুক্তির আদেশ আসে। তবে অর্থদণ্ডের ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ না হওয়ায় তার মুক্তি আটকে ছিল। বিষয়টি সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কর্মকর্তাকে জানানো হলে তিনি অর্থের সংস্থান করতে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেন। শেষ পর্যন্ত অর্থদণ্ড পরিশোধের ব্যবস্থা হওয়ায় রাজুকে মুক্তি দেওয়া হয়।
প্রবেশন কর্মকর্তা তৈমুর হোসেন চৌধুরী জানান, মানবিক কারণে রাজুর জন্য একজন দাতা খুঁজছিলেন তিনি। কয়েক জায়গায় যোগাযোগ করেও সফল হননি। পরে বিষয়টি জেলা আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সভায় তুলে ধরেন। সভায় বিষয়টি শোনার পর নাসিম হোসাইন ৫০ হাজার টাকা দিতে সম্মত হন। সভা শেষে তিনি টাকা পাঠিয়ে দেন এবং দ্রুত রাজুর মুক্তির ব্যবস্থা করতে বলেন।
তিনি আরও বলেন, নাসিম হোসাইনকে কারাগারের ফটকে আসার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেখানে আসতে চাননি। তার কথা ছিল, দ্রুত যেন রাজুর মুক্তির ব্যবস্থা করা হয়। মুক্তির পর তাকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। রাজুও তার সঙ্গে কথা বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের বাসিন্দা রাজু মুণ্ডা স্থানীয় একটি চা-বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। বিয়ে করেননি। দীর্ঘ কারাবাসে জীবনের অনেক স্মৃতিই এখন ঝাপসা। যে হত্যাকাণ্ডের মামলায় তার সাজা হয়েছিল, সেই ঘটনার কথাও অনেকটা ভুলে গেছেন। মুক্তির পর নিজের অতীত নিয়ে আক্ষেপের চেয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ই বেশি তার কণ্ঠে।
রাজু বলেন, ‘ভুলের মাশুল তো জেল খাটলাম। পাপ মুছেছে। এখন সামনের দিনটা ভালো করে কাটাতে চাই।’
আবার চা-শ্রমিকের কাজ করবেন কি-না, জানতে চাইলে কিছুটা হতাশার সুরে বলেন, ‘সঙ্গীসাথি কেউ তো আর নাই। জেলে যে কাজ (বাবুর্চি) করছি, সেইটাই করার চেষ্টা করমু।’
২৩ বছরের বন্দিজীবন শেষে রাজু মুক্তি পেয়েছেন। তার জন্য অপেক্ষায় নেই আপনজন, নেই ফিরে যাওয়ার মতো কোনো পারিবারিক আশ্রয়। কারাগারের বাইরে তার জীবন কতটা সহজ হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। রাজুর এই অসহায়ত্বের কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রবেশন কর্মকর্তা তৈমুর হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, রাজু বাবুর্চির কাজ করতে চাইলে তাকে কোনো হোটেল বা রেস্তোরাঁয় কাজ দেওয়ার চেষ্টা করবেন। দীর্ঘ কারাভোগের পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে তার কর্মসংস্থান জরুরি বলেও মনে করেন তিনি।