নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬
দেখে মনে হতে পারে এটা একটা ড্রেন। যাবতীয় আবর্জনা ফেলার স্থান। কিংবা আবর্জনার ভাগাড়ও মনে হতে পারে। এমনই দশা এখন সিলেট নগরীর বুক চিড়ে বয়ে চলা সুরমা নদীর। যেনো নগরীর সব কদর্যতা ধারণ করে আছে সুরমা।
শুষ্ক মৌসুমে এমনিতেই শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হয়ে যায় সুরমা। হেঁটেই পার হওয়া যায় নদীর এপার থেরক ওপার। পলি জমে গজিয়ে ওঠ চর। অনেক স্থানে বন্ধ হয়ে পড়ে পানি চলাচল। এ অবস্থায় ময়লা আবর্জনার কারণে এখন মৃতপ্রায় নদীতে পরিণত হয়েছে সুরমা।
সিলেট নগরীর কুশীঘাট থেকে টুকেরবাজার। প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা। এই পুরো এলাকাজুড়েই সুরমা নদীকে আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত করা হয়েছে।
একদিকে বাসা-বাড়ি-কলকারখানার দূষিত বজ্য পড়ছে সুরমা নদীতে। অপরদিকে সরাসরি আবর্জনা ফেলে দেয়া হচ্ছে নদীতে।
গত কয়েকদিন কুশীঘাট থেকে টুকের বাজার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে একেবারে বিবর্ণ হয়ে গেছে সুরমা। নদীর পানিতে ভাসছে অসংখ্য ময়লা-আবর্জনার স্তুপ। নগরীর কাজীর বাজার মাছের আড়তে গিয়ে দেখা যায় ককশিট ভাসছে নদীতে। বাজারের সকল ময়লা আবর্জনা সরাসরি ফেলে দেওয়া হয় নদীতে। মাছের খাঁচা, ককশিট ছাড়াও বিভিণœ ধরনের আবর্জনা ভেসে যেতে দেখা গেছে নদীর উপর দিয়ে। কাজীরবাজারের মাছের আড়তের শৌচাগারের পাইপ সরাসরি নামানো হয়েছে নদীতে। সরজমিন দেখা গেছে নদীতে গিয়ে পড়ছে শৌচাগারের ময়লা। এছাড়া পাশ্ববর্তী বস্তির টয়লেটের ময়লার পাইপও নদীতে সরসরি লিংক দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে সিলেটের পাইকারী বাজার কালীঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে পিয়াজ রসুনের ময়লা আবর্জনা ভেসে যাচ্ছে নদীতে। কালীঘাটের সকল আবর্জনা সরাসরি নদীতে ফেলা হয় বলে জানালেন ওই এলাকার পরিচ্ছনতা কর্মী আবুল হোসেন। তিনি জানান, সিটি করপোরেশনের গাড়ি এসে যে আবর্জনা নিয়ে যায় তার চেয়ে ৫ গুণ আবর্জনা ফেলা হয় নদীতে। তিনি জানান, নদীর পানি দিন দিন দুষিত হয়ে পড়ছে। ওই পানি হাতে লাগলে চুলকায় বলে জানান তিনি। একইভাবে কুশীঘাট এলাকা থেকে টুকের বাজার সবখানেই দেখা গেছে নদীর পানি দুষিত করে আবজর্না সরসরি ফেলা হচ্ছে।
নগরীর মাছিমপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, গৃহস্থালির যাবতীয় ময়লা ফেলে দেওয়া হচ্ছে নদীতে। আবার পাশেই দলবেঁধে নদীতে গোসল করছেন এলাকার লোকজন।
নগরীতে বর্জ্য ব্যবস্থা হড়ে না ওঠা ও পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায়ই এমনটি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিস্টরা। আবার নগরবাসীর সচেতনতার অভাবকেও দায়ী করেছেন তারা।
এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নদীর এ চিত্র আমাকেও পীড়া দেয়। আমাদের অফিসটাও নদীর পাশেই। তিনি বলেন, মিলেট সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি আছে। তারা চাইলে নদীর পানি দূষন রোধ ও আবর্জনা ফেললে ব্যবস্থা নিতে পারত। কিন্তু তারা সেটি করছেনা। তারা যদি ব্যবস্থা নেয় তাদেরকে আমাদের পক্ষ থেকেও সহযোগিতা করা যাবে।
এ ব্যপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, আমরা অনেক চেষ্ঠা করেছি। কিন্তু মানুষের অভ্যাস পরিবর্তন হচ্ছে না। তিনি বলেন, সবার আগে অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। সচেতন হতে হবে। সচেতন হলেই আমাদের নদী রক্ষা করা সম্ভব। পরিবেশ অধিদপ্তরের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি তাদের দায়িত্ব। তারা এ ব্যপারে ব্যস্থা নিতে পারে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) অ্যাডভোকেট শাহ শাহেদা বলেন, ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষন আইনে নদী, খাল, পুকুর ভরাট ও দূষণ করা যাবে না। এমনকি শ্রেণী পরিবর্তণ করা যাবে না বলে উল্লেখ রয়েছে। একইভাবে ২০১৩ সালের পানি অধিকার আইনেও পানি নিষ্কাশনে বাধাঁ দেওয়া যাবেনা বা দূষন করা যাবে না বলে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া ২০০০ সালের জলাধার আইনেও নদীর শ্রেনী পরিবর্তন করা যাবে না বলে উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন, সিলেট সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকা থেকে ময়লা আবর্জনা ফেলে নদীর পানি দূষনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি। এসব তথ্য সংগ্রহ হলেই বেলার পক্ষ থেকে আইনী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান শাহেদা।
কাজীরবাজার মৎস্য আড়তের পাশের কলোনীর বাসিন্দা অনোয়ারা বেগম ও সুতিকা বিবি। তাঁরা জানান, গোছলসহ গৃহস্থালির সকল কাজেই তারা নদীর পানি ব্যবহার করেন। বর্ষায় নদীর পানিতে তেমন দুর্গন্ধ মিলে না জানিয়ে তারা বলেন, ইদানীং নদীর পানি দিয়ে গোসল করার কারনে শরীরে চুলকায়। শিশুরা নানা ধরণের চুলকানি জাতীয় রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।