Sylhet Today 24 PRINT

জুড়ীতে কন্যাশিশু হত্যার কারণ এখনও রহস্যাবৃত

তপন কুমার দাস |  ১০ মার্চ, ২০১৬

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় নিজ কন্যাশিশুকে বিষপান করিয়ে হত্যার পর পারভিন বেগম (২৫) নামে এক মায়ের আত্মহত্যা চেষ্টার ঘটনার সাত দিন অতিবাহিত হলেও এখনো হত্যার কারণ রহস্যের অন্ধকারে রয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে মঙ্গলবার (৮মার্চ) অভিযুক্ত মা পারভিন বেগমকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।

গত (৩ মার্চ) রাতে জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের মনতৈল গ্রামের জাকির হোসেনের স্ত্রী পারভিন বেগম নিজের কন্যাশিশু সাদিয়াকে বিষপান করিয়ে নিজেও বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। ওইদিন রাতেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি মারা গেছে। মা পারভিন বেগম বেঁচে যান।

পুলিশ জানায়, হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে নিয়ে যাবার সময় পারভিনের সাথে হত্যার বিষয় নিয়ে কথা বললেন। কিন্তু পারভিন মুখ না খোলায় এ হত্যা রহস্যের কারণ এখনো গোলকধাঁধায়। আর এ কারণে হত্যাকা-ের পেছনে এমন কোন বিষয় রয়েছে যা এখনও সামনে আসছে না।

গত রোববার (৬ মার্চ) জুড়ী উপজেলার মনতৈল গ্রামে নিহত সাদিয়ার বাড়িতে গেলে তাঁর বড় চাচী আলেকা বেগম জানান, পারভিন আমার শ্বাশুড়ির আপন ভাইঝি। পিতা-মাতা মারা যাওয়ায় আমার শ্বাশুড়ি তাঁকে আমাদের এখানে এনে জাকিরের সাথে বিয়ে দেন। আনুমানিক ৮ থেকে ৯ বছর পূর্বে পারিবারিক সিদ্ধান্তে এ বিয়ে হয়। কোনোদিন তাঁদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ হয়নি। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো মনোমানিল্য ছিল না। এমনকি পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও মনোমানিল্য ছিল না।

ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার (৩ মার্চ) আনুমানিক রাত ৯টার দিকে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। তখন পাশের ঘর থেকে সাদিয়ার কান্না শুনে আমার ও শ্বাশুড়ির ঘুম ভাঙে। কান্নার কারণ জানতে চাইলে পারভিন বলে ঔষধ খাওয়ানোর কারণে সে কান্নাকাটি করছে। পরে সাদিয়ার অবস্থার অবনতি হওয়ায় আমরা জাকিরকে ঘটনাটি জানাই। তিনি জানান, বিয়ের কয়েক বছর পর জাকির কাতারে চলে যান। প্রায় দু’মাস আগে কাতার থেকে জাকির হোসেন দেশে ফিরে আসেন।

জাকির হোসেনের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জানা গেছে, জাকির হোসেন ও পারভিন দম্পতির একমাত্র সন্তান সাদিয়া। সে ওই এলাকার ব্লু-বার্ড কিন্ডার গার্টেন স্কুলের নার্সারি শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত বুধবার (২ মার্চ) হঠাৎ সাদিয়ার জ্বর ওঠায় তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান বাবা-মা। এসময় স্ত্রীকেও ডাক্তার দেখান জাকির।

পরদিন বৃহস্পতিবার (৩ মার্চ) রাতে মনতৈল বাজারের একটি দোকানে বসে ক্রিকেট খেলা দেখছিলেন জাকির। ওইসময় খবর পান তাঁর মেয়ে সাদিয়া বমি করছে। তিনি দ্রুত বাড়ি গিয়ে দেখেন কাঁথা দিয়ে সাদিয়াকে চাপা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। এ সময় কি হয়েছে জানতে চাইলে পারভিন কোনো উত্তর দেননি। এক পার্যায়ে স্ত্রী পারভীনকে বমি করতে দেখে জাকিরের সন্দেহ হয়। মেয়ে ও স্ত্রীর মুখ থেকে তখন বিষের গন্ধ বের হচ্ছিল। পরে মেয়ে ও স্ত্রীকে আশংকাজনক অবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন। ওইদিন রাত তিনটার দিকে মেয়ে সাদিয়া চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। পরে পুলিশ সাদিয়ার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে।

এদিকে এ ঘটনায় গত শনিবার (৫ মার্চ) সকালে স্বামী জাকির হোসেন স্ত্রী পারভীনের বিরুদ্ধে মেয়ে সাদিয়াকে বিষপানে হত্যা করে স্ত্রীও আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন উল্লেখ করে জুড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

এ বিষয়ে সরেজমিনে মনতৈল গ্রামের কয়েকজনের সাথে আলাপকালে তাদের কেউ বলেন, বিষয়টি তারা জানেন না। আবার কেউ এই পরিবারের সাথে তাদের যোগাযোগ নেই বলে কৌশলে এড়িয়ে যান। পরে মনতৈল বাজার ঘুরে কথা হয় আরও একাধিক ব্যক্তির সাথে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দু একজন বলেন, শুনেছেন স্বামী-স্ত্রী মধ্যে কয়েকদিন আগে ঝগড়া হয়েছে। কিন্তু কি বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়েছে। তারা সেই কারণটি জানেন না। বাজার থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কিছু দূর যাওয়ার পর কথা হয় এক রিক্শাচালকের সাথে।

শিশুকন্যাকে বিষপান করিয়ে হত্যার কথাটি তুলতেই তিনি জানালেন, তিনি শুনেছেন একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ক্রয়ের বিষয় নিয়ে স্ত্রীর সাথে জাকিরের ঝগড়া হয়েছিল এবং জাকির তার স্ত্রীর গায়ে হাতও তুলেছিলেন। হয়তো স্বামীর আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে ‘প্রতিশোধ’ নিতে শিশুকে হত্যা করতে পারেন পারভিন। নিজেও মরতে চেয়েছেন।

সাদিয়ার স্কুলের প্রধান শিক্ষক মুহিবুর রহমান বলেন, ‘সাদিয়া খুব শান্ত শিষ্ট ছিল। লেখা-পড়ায় ভালো ছিল। তার মৃত্যুতে আমরা শোকাহত।’ তিনি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানান।

নিহত সাদিয়ার বাবা জাকির হোসেন মোবাইল ফোনে বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি বাড়িতে ছিলাম না। আমার অজান্তে এ ঘটনা ঘটেছে। আমি মেয়ে হত্যার বিচার চাই। তবে স্ত্রীর সাথে কখনো ঝগড়া হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি ঝগড়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন।’

এ ব্যাপারে জুড়ী থানার এসআই ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইব্রাহীম আলী খান বলেন, ‘পারভিনকে মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার পর বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট (৫নং আমলী আদালত) মৌলভীবাজারে হাজির করি। আদালত তাকে জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। সিলেট থেকে আদালতে নিয়ে আসার পথে পারভিনের সাথে হত্যার বিষয় কথা বলেছি কিন্তু সে মুখ খোলেনি। হত্যার রহস্য বের করার জন্য তাকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হবে।’

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.