Sylhet Today 24 PRINT

সুনামগঞ্জে চাঁদাবাজি মামলার আসামীর অত্যাচারে অতিষ্ট এলাকাবাসী,প্রশাসন নিরব

তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি |  ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

সুনামগঞ্জে চাঁদাবাজি মামলার আসামীর অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে উঠেছে এলাকাবাসী। চাঁদাবাজের চাঁদাবাজির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সম্প্রতি আদালতে দুইটি চাঁদাবাজি মামলা দায়ের করায় বেড়ে গেছে অত্যাচার। এলাকার সাধারণ নিরীহ মানুষ থেকে শুরু করে সাংবাদিক,জনপ্রতিনিধি,কয়লা ব্যবসায়ী কেউ রক্ষা পাচ্ছে না। ওই চাঁদাবাজের বিভিন্ন কর্মকান্ড নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিক পত্রিকাসহ অনলাইন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেনা পুলিশ। আদালতে দায়েরকৃত ২টি মামলা সূত্রে জানায়,তাহিরপুর উপজেলার আওয়ামীলীগের আহবায়ক,উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আবুল হোসেন খাঁ ও উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি,চাঁরাগাঁও কয়লা আমদানী কারক সমিতি সভাপতি জয়ধর আলীর কাছে ৫লক্ষ টাকা চাঁদা দাবী করে বাদাঘাট ইউনিয়নের কামড়াবন্দ গ্রামের বিশিষ্ট সুধী ব্যবসায়ী বদ মিয়ার ছেলে থানা পুলিশের দালাল ও এলাকার চিহ্নিত চাঁদাবাজ আজাদ মিয়া। এঘটনায় চেয়ারম্যানের ছেলে পারুল খাঁ বাদী হয়ে গত ২৯শে জানুয়ারী কোট পিটিশন মামলা নং-১০/২০১৫ইং ও কয়লা সমিতির সভাপতির ছেলে নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে গত ২২শে জানুয়ারী কোর্ট পিটিশন মামলা নং-০৮/২০১৫ইং দায়ের করে চাঁদাবাজ আজাদ মিয়ার বিরুদ্ধে। আদালত মামলাগুলো আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য তাহিরপুর থানায় পাঠায়। এমতাবস্থায় থানার এসআই সামিউল ও এসআই জামাল উদ্দিন চাঁদাবাজি মামলার আসামী আজাদকে বোগল দাবা করে এলাকায় ঘুরছে। আজাদ মিয়া বাদাঘাট বাজারে ব্লু ফ্লিম চালাতো।

জুয়া খেলা,মদ,গাঁজা সেবন ও রাস্তাঘাটে মেয়েদের ইভটিজিং করা ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। একারণে গলায় জুতার মালা পড়ানোসহ এলাকাবাসীর অনেকবার গণধৌলাই খেয়েছে। তার এসকল কর্মকান্ডে এলাকাবাসীর নালিশ শুনতে শুনতে অতিষ্ট হয়ে আজাদ মিয়াকে তার বাবা তেজ্য করে দেয়। পরে সে এলাকা ছেড়ে সিলেট চলে যায়। দীর্ঘদিন পর আবার এলাকায় ফিরে এসে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সীমান্ত এলাকায় তৈরি করে একটি চোরাচালান সিন্ডিকেট। রাতের আধাঁরে সীমান্তের লাকমা,লালঘাট,টেকেরেঘাট,চানপুর,চাঁরাগাঁওসহ আরো একাধিক পয়েন্ট দিয়ে প্রতিরাতে অবৈধভাবে হাজার,হাজার কয়লার বস্তা পাচাঁর করে। পাচাঁরকৃত কয়লার বস্তা থেকে বিজিবি ক্যাম্পের নামে ১০টাকা,তার নিজের নামে ৫টাকা হারে চাঁদা উত্তোলন করে আজাদ মিয়া। এরপর আবার তার ছোট ভাই আর এক দালাল সাজ্জাদ মিয়া,শালা তারেক মিয়া স্থানীয় প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের নাম ব্যবহার করে চাঁদার পরিমান বৃদ্ধি করে।

পাহাড়ী ছড়া থেকে কুড়ানো বাংলা কয়লা থেকে প্রতিটনে ১শত টাকা,মদ-গাজা পাচাঁরের জন্য সপ্তাহে ২হাজার টাকা,চুরি করে ভারতে লোক উঠনোর জন্য জনপ্রতি ৩শত টাকা,যাদুকাটা নদী দিয়ে ভারত থেকে পাথর পাচাঁরের জন্য প্রতি বারকি নৌকা থেকে ১শত টাকা,এ নদীতে সেইভ মেশিন চালানোর জন্য ২শত টাকা,নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলনের জন্য প্রতি নৌকা থেকে ১হাজার টাকা এবং এলাকার বিভিন্নস্থানে জুয়ার বোর্ড বসিয়ে প্রতিরাতে প্রতিবোর্ড থেকে ৫শত টাকা হারে চাঁদা উত্তোলন শুরু করে। এসব করে রাতারাতি হয়ে যায় আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। এরপরও ক্ষান্ত হয়নি তারা। অবৈধ টাকাকে আরো দ্বিগুন থেকে দ্বিগুন করতে শুরু করে অস্ত্র,হুন্ডি,হেরুইন ও ইয়ারার ব্যবসা। আজাদের চাঁদাবাজি,সীমান্তে কয়লা চোরাচালান,মাদক ব্যবসা ও সাধারণ মানুষকে অত্যাচার,থানার দালালি,মোটর সাইকেল চালানোর সত্য সংবাদ প্রকাশ করার কারণে দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকার সাংবাদিক রাজু আহমেদ রমজানকে তুলে নিয়ে মারধর করে। পরে নির্যাতিত সাংবাদিক রাজু তাহিরপুর থানায় জিডি নং ৬৩১,তারিখ:২০/০৪/১১ইং দায়ের করলে,তাকে উল্টো মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানী করে। সংবাদ প্রকাশের জেরে মাইটিভির জেলা প্রতিনিধি মোজাম্মেল আলম ভূঁইয়ার কাছে ক্ষতি পূরণ বাবদ ১লক্ষ টাকা চাঁদা দাবী করে।

চাঁদা না দেওয়ায় হামলা চালিয়ে জেবিসি.জিআর. ডি.২৭০ মডেলের ১টি ডিবি ক্যামেরা,আধা ভরি ওজনের স্বর্ণের চেইন ও নগদ টাকা জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয় আজাদ ও সাজ্জাদ গংরা। এঘটনার প্রেক্ষিতে মোজাম্মেল আলম ভূঁইয়া বাদি হয়ে আজাদ ও সাজ্জাদসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে গত ২০১৩সালের ১৩ই মে সুনামগঞ্জ আমলগ্রহণকারী জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাহিরপুর জোনে দন্ডবিধি আইনের ৪২০/৩৮৫/৩৮০/৩২৫/৩২৪/৩০৭ ও ৩৪ ধারায় ৪৪/২০১৩নং পিটিশন মোকদ্দমাটি দায়ের করেন। মামলাটি অধ্যাবধি তদন্তাধীন রয়েছে। এছাড়া বিভিন্নস্থানে চাঁদাবাজির অভিযোগে গত ২৫/০৪/২০১১ইং ০৫.৯০৫...০৬.০৩.০৩১.২০১১নং স্মারকে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন কর্তৃক কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেন। ২০০৭ সালের ৬ আগষ্ট স্থানীয় উত্তর বড়দল ইউনিয়নের গুটিলা গ্রামে প্রশাসনের লোকেরা স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ঘুষ গ্রহণের দায়ে তাহিরপুর থানার মামলা নং-৩,তারিখ:০৬.০৮.২০০৭ইং,ধারা-১৬২/১১৪ দঃবিঃ এর আসামী সেটেলম্যান্ট অফিসার মোহাম্মদ আলী হোসেনকে হাতে নাতে গ্রেফতার করলে,প্রশাসন ও উপস্থিত জনতার সামনে গ্রেফতারকৃত মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন,আজাদ প্রতিমাসে তার কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা হারে নিয়মিত চাঁদা নিত। এঘটনার পর লেজগুটিয়ে আজাদ এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।

এছাড়াও তার চাঁদাবাজী,ব্ল্যাকমেইল ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের অভিযোগে আজাদ মিয়া ও তার ভাই সাজ্জাদ মিয়ার বিরুদ্ধে তাহিরপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচিত কমান্ডার মোহাম্মদ মুজাহিদ উদ্দিন আহম্মদ কর্তৃক গত ০৪/০৫/২০১১ইং জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। বড়ছড়া কয়লা আমদানী কারক সমিতির অর্থ সম্পাদক ব্যবসায়ী কুদ্দুছ মিয়া বাদী হয়ে আজাদ ও সাজ্জাদের বিরুদ্ধে বাংলদেশ দন্ড বিধি আইনের ৩৮৫/৫০০/ ৫০১/৫০২/১০৯ ধারায় বিজ্ঞ আদালতে ১১৫/২০১১নং পিটিশন মামলা দায়ের করেন। তাহিরপুর উপজেলার বালিজুরী হাজী এলাহি বক্স উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমানের কাছে ২০হাজার টাকা চাঁদা চাওয়ায়,স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও শিক্ষকবৃন্দ গত ১১ এপ্রিল ২০১২ইং তারিখে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে প্রতিবাদ জানান।

২০০৪সালে এক শিশুকে বলৎকারের ঘটনায় সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাবে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে ওই নির্যাতিত শিশুটির মা। এব্যাপারে উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল হোসেন খান বলেন,চাঁদাবাজ আজাদ মিয়া সীমান্তের স্মাগলিং পয়েন্টগুলোতে দীর্ঘদিন যাবত আধিপত্য বিস্তার করে মাসোহারা,সাপ্তাহিক ও দৈনিক চাঁদা উত্তোলন করে যাচ্ছে। একারণে অনেকবার গণধৌলায়ের শিকার হয়েছে। চারাগাঁও কয়লা আমদানী কারক সমিতির সভাপতি জয়ধর আলী,ব্যবসায়ী হাসিম মিয়া,নজরুল ইসলামসহ আরো অনেকে বলেন-চাঁদাবাজ আজাদ মিয়া নিজেকে র‌্যাবের অফিসার,কখনো বিজিবির সিও,আবার কখনো বড় সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সীমান্তের নদীপথ,বাংলা কয়লা,পাথর,বালি থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা চাঁদা উত্তোলন করাসহ ওপেন মদ-গাঁজা,হেরুইন,ইয়াবা ও হুন্ডির ব্যবসা করছে। এলাকায় জুয়ার বোর্ড বসিয়ে ধ্বংস করছে যুব সমাজ। কিন্তু পুলিশ তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে বরং এক সঙ্গে চলাফেরা করছে। ফলে তার অত্যাচার দিনদিন বেড়েই চলেছে। সীমান্তের লালঘাট গ্রামের দিনমজুর কালাম,টেকেরঘাট কাচা কলোনির শহিদ মিয়া ও বানিয়াগাঁও গ্রামের সিরাজ মিয়াসহ আরো অনেকে বলেন,সন্ত্রাসী আজাদ মিয়ার কথা মতো কয়লা,মদ-গাঁজা ও হেরুইন পাচাঁর না করায় আমাদেরকে মিথ্যা মামলা ফাঁসিয়ে হয়রানী করছে। এব্যাপারে চাঁদাবাজ আজাদ মিয়া দাপটের সাথে বলেন,আমরা এত কিছু কিন্তু কেউ আমাদের কিছু করতে পারেনা। আর পত্রিকায় লিখলে কি হয়। কোন সাংবাদিক আমাদেরকে নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলে মিথ্যা মামলা দিয়ে সাইজ করে ফেলব এটা কোন ব্যাপারই না,কারণ পুলিশ ও বিজিবি আমার কথা উঠে বসে।

এব্যাপারে সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন-আজাদের বিরুদ্ধে আদালতে দায়েরকৃত দুইটি চাঁদাবাজি মামলা তদন্ত করা হচ্ছে,তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সন্ত্রাসী আজাদের হাত থেকে জনসাধারণকে করতে প্রশাসনের সহযোগীতা কামনা করেছেন তাহিরপুর উপজেলাবাসী।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.