Sylhet Today 24 PRINT

ইউপি নির্বাচন বড়লেখা : ‘ভোট দিয়া কিতা করতাম, পাশ করিয়া খোঁজ নেইন না!’

(বর্ণি, দাসেরবাজার ও তালিমপুর ইউপি)

তপন কুমার দাস, বড়লেখা : |  ২৮ মার্চ, ২০১৬

মৌলভীবাজার-চান্দগ্রাম (বড়লেখা) সড়কের তালিমপুর ব্রিজ অতিক্রম করতেই টের পাওয়া গেল ইউনিয়ন নির্বাচনের হাওয়া। রাস্তার পাশে গাছে ঝুলানো, বিভিন্ন বাড়ির দেয়ালে সাঁটানো পোস্টার। সড়কের গোয়ালটা বাজার, দাসেরবাজারসহ ইউনিয়ন এলাকার বাজারগুলোতে সুতোয় ঝুলছে পোস্টারের সারি। পোস্টারের সারিতে বাজারগুলোর রঙই পাল্টে গেছে। এই উপজেলার বর্ণি, দাসের বাজার ইউনিয়নের গ্রাম ও পাড়ার একই অবস্থা।

কিন্তু ভোটের হাওয়া, উৎসবের আমেজের সঙ্গে সঙ্গে আছে ভীতি, শঙ্কা। ভোটার ও প্রার্থীদের মনে প্রশ্ন, সত্যিই কি তারা উৎসবমুখর পরিবেশে নিরাপদে, নির্ভয়ে ও নির্বিঘেœ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন?

তবে ভোটের আলোচনায় প্রার্থী ও প্রতীকের বিষয়টি ছাপিয়ে এসব ইউনিয়নের অনেক জায়গায় আবার ভোটের সময় ছাড়া অন্য সময়ে ভোটারদের মর্যাদা বা সম্মান না দেওয়ার ক্ষোভই বড় হয়ে ওঠেছে। তাই এবারের ভোটে সচেতন ভোটাররা প্রার্থীর যোগ্যতা, সততা, তাদের অতীত ও বর্তমান কর্মকা-সহ নানা বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেণ করছেন।
 
সরেজমিনে উপজেলার বর্ণি, দাসের বাজার ও তালিমপুর ইউনিয়নে এলাকার বিভিন্ন গ্রাম ও স্থান ঘুরে ইউনিয়নবাসীর সাথে কথা বলে এ ধারণাটি পাওয়া যায়।

সরেজমিনে উপজেলার দাসেরবাজার ইউনিয়ন ঘুরবার সময় দাসেরবাজারে ৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা বাজারের পান ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম (৩৮) প্রথমে ভোট নিয়ে কোনো কথাই বলতে চাইলেন না। সোজাসাজা বললেন, ‘আমি এইসবে কান পাতিনা। নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়া দিন কাটাই।’ তবুও ভোট দিতে যাবেন-এমনটা বললে জানান, তিনি ভোট দিতে যাবেন কিন্তু প্রতীক বিবেচনায় নয় ব্যক্তি দেখে ভোট দিবেন।

তাঁর পাশেই বসা তাঁর গ্রামের বাসিন্দা জয়নাল আহমদ (৭৫)। শীর্ণকায় জয়নাল আহমদের শরীরে স্পষ্ট বয়সের ছাপ। তিনি বলেন, ‘ভোট দিয়া কিতা করতাম। আমরার ভোটে তারা চেয়ারম্যান অয় (হয়)। কিন্তু তারপর আর খবর নেয় না। আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন জয়নাল।’

এরপর দাসের বাজার থেকে পশ্চিমদিকে দাসেরবাজার-জুড়ী রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে দেখা হয় পানিসাইল গ্রামের বাসিন্দা বিজয় বিশ্বাস (৫৫) কে। ভোটের প্রসঙ্গে কথা তোলতেই বললেন, ‘কে যাইব অখনো বোঝতাম পাররাম না, সেকেন্ডে সেকেন্ডে ভোট ঘুরের।’

এরপর দাসের বাজার ইউনিয়ন থেকে তালিমপুর ইউনিয়ন এলাকার বাংলাবাজার (নয়াবাজার) গেলে বাজারের একটি চা-স্টলে বসে চা খেতে খেতে শোনা গেল নির্বাচন নিয়ে অনেকের চুপিচুপি হিসাব-নিকাশ। স্টলে বসে কথা হয় ৬নং ওয়ার্ড দ্বিতীয়ারদেহী গ্রামের বাসিন্দা মাখন লালের সাথে। তিনি সামনের দোকানের দেয়ালে সাঁটা তিনটি পোস্টার দেখিয়ে জানালেন, আমরার ইনো নৌকা ও ধানের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে।
 
আবার এই বাজার থেকে বের হয়ে কানোনগো বাজারে গেলে পাওয়া গেল আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ সুনাম উদ্দিনকে। গণসংযোগ করছেন তিনি। তাঁর সাথে থাকা বড়লেখা হাজিগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল আজিজ, আবুল কালাম জানালেন, সুনাম উদ্দিন আমরার গ্রামের (তালিমপুরের) বাসিন্দা। আমারার গ্রামের হখলে সুনাম উদ্দিনের লাগিয়া ক্যাম্পাস (গণসংযোগ) করিয়ার। সুষ্ঠু ভোট অইলে আমাদের প্রার্থী অবশ্যই জিতব।
 
কানোনগো বাজার ঘুরবার সময় গৌর নিতাই ফার্মেসীর সামনে কথা হয় কাপড় ব্যবসায়ী কুতুব উদ্দিন (৬৫) সাথে। তিনি বলেন, ‘বাবারে মানুষের অন্তুরতো বুঝা যায়না। বিদ্যুতের লগে (নৌকার প্রার্থী) মানুষ বেশি দেখা যার।’

এরপর বাজারের পশ্চিম গলিতে হাঁটর সময় ৭নং ওয়ার্ডের মুর্শিদাবাদকুরা গ্রামের বাসিন্দা রফিক উদ্দিন (৪৫) ও কুটাউরা গ্রামের বাসিন্দা ইন্দ্র বিশ্বাসের সাথে কথা হয়। দুজনেই জানালেন, আমারার গ্রামে কোনসময় ভোটে মারামারি অইছে না। এবারও আশা কোন সমস্যা অইতো নায়। তারা জানালেন, তালিমপুর ইউনিয়নে লাড়াই হবে-নৌকা আর ধানে। তবে এই এলাকায় দলীয় প্রতীকের বিষয়টি ছাপিয়ে আঞ্চলিকার টান ভোটারে মাঝে কাজ করছে। এ বাজারের আরো অনেকের সাথে কথা বলে এ ধারনা পাওয়া গেছে।

এদিকে বর্ণি ইউনিয়নের গোদাম-বাজারে ভোট নিয়ে কথা হয় ফারুক আহমদ ও সুমন আহমদের সাথে। তাঁরা দুজনই ব্যবসায়ী। তাঁরা জানালেন, ভোটারেতো মুখ খোলের না। নীরব রইছে। মানুষের কথায় মনে অর আমরার ইউনিয়নে ব্যক্তি ও এলাকার টানে ভোট অইবো। তবে এ বাজারের আরেক ব্যবসায়ী ভিন্নমত প্রকাশ করে বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত দলীয়ভাবে ভোট অইবো।’

এরপর এই ইউনিয়নের ফকিরের বাজারে কথা হয় ছুটিতে দেশে আসা দুবাই প্রবাসী মঞ্জু আহমদের সাথে। তিনি বলেন, ‘আমরার ইউনিয়নে মনে অর শেষ পর্যন্ত গ্রামভিত্তিক ভোট অইবো। এ বাজারের পশ্চিম পাশে সূচনা রেষ্টুরেন্টে প্রবেশ করতেই শোনা গেল ভোট নিয়ে আলোচনা। তবে সূচনা রেস্টুরেন্টে বসা কাস্টমারের কথাতে মনে হলো ভোট উৎসবের সঙ্গে তাঁদের মনে শঙ্কাও আছে।

ঘুরতে ঘুরতে ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বর্ণি ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে দাসের বাজার ইউনিয়নে প্রবেশ করতেই পাওয়া গেল নৌকার প্রার্থী নজব উদ্দিনের প্রচার গাড়ি।

প্রচারের মাইকে চলছে গান ‘কৃষক শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক ফেলে রেখে যে যার কাজ। দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে নৌকা লইয়া সবাই আজ। নৌকা লইয়া সবাই আজ। দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে নজব ভাইয়ের জন্য আজ।’
(আগামীকাল পড়ুন নিজ বাহাদুরপুর, উত্তর শাহবাজপুর ও দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের ভোট নিয়ে ভোটারের ভাবনা)



টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.