দেবাশীষ দেবু | ২০ এপ্রিল, ২০১৬
সিলেটে প্রতিদিন বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় গড়ে ১২২০ মেগাওয়াট। পাঁচ-ছয় বছর পূর্বেও উৎপাদন ছিলো বর্তমান সময়ের চেয়ে প্রায় অর্ধেক। অপরদিকে সিলট বিভাগে বর্তমানে প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে গড়ে ৩০০ মেগাওয়াট।
ফলে চাহিদার চেয়েও প্রায় নয়শ’ মেগাওয়াট বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে সিলেটে। তবু বর্তমান সময়ে সিলেটের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার নাম বিদ্যুৎ। গত ৭/৮ দিন ধরে প্রতিদিন গড়ে ৫/৬ ঘণ্টাও মিলছে না বিদ্যুৎ। গত শনিবার থেকে তো অবস্থা আরো খারাপ।
শনিবার ভোরে ঝড়ে সঞ্চালন লাইন ছিঁড়ে বিদ্যুৎহীন সিলেটের অনেক এলাকা। কিছু কিছু উপজেলায় এখনো সঞ্চালন লাইন মেরামত করা যায়নি। ফলে এক সপ্তাহ ধরেই প্রায় বিদ্যুৎহীন এসব এলাকা। নগরীর অনেক এলাকায়ও দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।
গত কয়েক বছরে সিলেটে বিদ্যুৎ উৎপাদন দিগুণ হয়েছে। চাহিদার চেয়ে প্রায় চারগুণ বেশি উৎপাদন হচ্ছে। তবু কেনো বিদ্যুতের এই ভেল্কিবাজি।
সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী রতন কুমার বিশ্বাসের মতে, সিলেট তথা দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে অনেক এগিয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থায় উন্নতি হয়নি। বরং ট্রান্সমিটার, সঞ্চালন লাইনগুলো পুরনো হয়ে বিতরণ ব্যবস্থা আরো পিছিয়েছে। বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থার পশ্চাদমুখীতার কারণেই সিলেটে সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ সমস্যা দেখা দিয়েছে।
রতন কুমার বিশ্বাস বলেন, সিলেটে এক সপ্তাহ ধরে ‘অপ্রত্যাশিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ হচ্ছে। প্রতিদিনই বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি, ঝড় হচ্ছে। বড় বড় খুঁটি উপড়ে পড়ছে। এছাড়া বজ্রপাতে বিদ্যুতের ইন্সুলেটর ফেটে যায়। বাইরে থেকে এই সমস্যা দেখা যায় না। কিন্তু বৃষ্টি হলেই পানি ঢুকে তার ছিঁড়ে যায়। এমন দুর্যোগে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা অসম্ভব। বিতরণ ব্যবস্থায় সংস্থার হলে সঙ্কটের কিছুটা সমাধান হবে।
তিনি বলেন, অন্যান্য দেশে বিদ্যুতের তার মাটির নিচ দিয়ে টানা হয়। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাদের সমস্যা হয় না। কিন্তু আমাদের তো ঝড় হলেই তার ছিঁড়ে যায়, খুঁটি উপড়ে পড়ে।
সিলেট বিদ্যুৎ বিভাগের আরো দু’জন প্রকৌশলী জানিয়েছেন, সঙ্কট নয়, বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটি, পুরনো ও জীর্ণ সঞ্চালন লাইন এবং পুরনো ট্রান্সমিটার ঘনঘন বিকল হয়ে পড়ায় বিদ্যুৎহীনতার দূর্ভোগে পড়তে হয় সিলেটবাসীকে।
জানা যায়, সিলেটে বিতরণ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে ১৩৯০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করে বিদ্যুৎ বিভাগ। ‘বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প, সিলেট বিভাগ’ নামে তিন বছর মেয়াদী এই প্রকল্প গ্রহণ সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। সিলেট অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। ২০১১ সালে এই প্রকল্পটি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হলেও তা এখনো অনুমোদন হয় নি। প্রকল্পটি এখনও একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী বলেন, গত বছর এই প্রকল্পটি বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় অনুমোদন করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে ১৯টি সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিলো। আমরা সংশোধন করে এবছর আবার মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছি। এখন প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।
জানা যায়, সিলেটে বিদ্যুৎ যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে ২০১১ সালে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সিলেটের বিদ্যুৎ সমস্যার কারণগুলো চিহ্নিত করার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশনা অনুযায়ী সিলেটে ঘনঘন বিভ্রাটের পেছনে ১০ টি সমস্যা চিহ্নিত করে অর্থমন্ত্রী বরাবরে ৬ টি সুপারিশ করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা ১০ টি সমস্যার মধ্যে ছিলো- পুরাতন ও জরাজীর্ণ বিতরণ (সঞ্চালন) লাইন, কিছু সংখ্যক সঞ্চালন ট্রান্সফরমার ওভারলোড, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের বর্ধিত এলাকায় নতুন সঞ্চালন লাইন স্থাপন না করা, ১১ কেভি লাইনে স্থাপিত সঞ্চালন ট্রান্সফরমার চুরি, অতি পুরাতন/মেরামতকৃত ট্রান্সফরমার বিকল, সিলেট নগরীর জন্য বিকল্প গ্রিড উপকেন্দ্র না থাকা, নগরীর উপশহর এলাকায় ৩৩ ও ১১ কেভি উপকেন্দ্র ওভারলোড থাকা, ৩৩ কেভি ও ১১ কেভি সঞ্চালন লাইন ওভারলোড থাকা, উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ৩৩ ও ১১ কেভি দুটি উপকেন্দ্র নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ সম্ভব না হওয়া এবং নগরীর আম্বরখানার আঞ্চলিক মেরামত কারখানায় আধুনিক যন্ত্রপাতি স্বল্পতার কারণে বিকল ট্রান্সফরমার প্রত্যাশিত সময়ের মধ্যে মেরামত করতে না পারা।
এই সমস্যাগুলো সমাধানে সেসময় ৬ টি সুপারিশ করেছিলেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী।
সুপারিশগুলো হচ্ছে- বিকল ও ওভারলোডেড ট্রান্সফরমারের বিপরীতে নতুন ট্রান্সফরমার প্রতিস্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ট্রান্সফরমার মজুদ, এ অঞ্চলের আওতাধীন ৩৩ কেভি, ১১ কেভি ও শূন্য দশমিক ৪ কেভি সঞ্চালন লাইনের সংস্কার/ক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ, নগরীর দক্ষিণ সুরমা এলাকায় নতুন গ্রিড উপকেন্দ্র নির্মাণ, উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ৩৩ ও ১১ কেভি দুটি নতুন উপকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের কাজ তরান্বিত এবং আঞ্চলিক (ট্রান্সফরমারসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি) মেরামত কারখানা আধুনিকায়ন ও ট্রান্সফরমার চুরির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
সিলেটে বিদ্যুতের ১০ সমস্যা ও ৬ সুপারিশের প্রতিবেদন পেয়ে নিয়ে সমন্বিত একটি প্রকল্প গ্রহণের নির্দেশ দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলীকে প্রধান করে এ জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়। এই কমিটি তৈরি করে সিলেট বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়নের প্রকল্প। যা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্র নির্মাণ ও সংস্কার, ১১/০.৪ কেভি উপকেন্দ্র নির্মাণ ও সংস্কার, পর্যাপ্ত পরিমাণ ট্রান্সফরমার মজুদ, এ অঞ্চলের আওতাধীন ৩৩ কেভি, ১১ কেভি ও শূন্য দশমিক ৪ কেভি সঞ্চালন লাইনের সংস্কার ও ক্ষমতা বৃদ্ধি। এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত হিসেবে সিলেট বিভাগের ৪ টি জেলা ও সিটি কর্পোরেশন এলাকাকে দেখানো হয়েছে।
এই প্রকল্পটি আরো ২০ বছর আগে নেওয়া উচিত ছিলো জানিয়ে রতন কুমার বিশ্বাস বলেন, সব বড় শহরেই এরকম প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্প অনুযায়ী কাজ করা গেলে লো-ভোল্টেজ ও অহেতুক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে।