তপন কুমার দাস, বড়লেখা | ২৬ এপ্রিল, ২০১৬
মৌলভীবাজারের বড়লেখায় জাল স্বাক্ষরে পল্লী জীবিকায়ন প্রকল্পের উপজেলা ব্যাবস্থাপনা কমিটি গঠনের অভিযোগে সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ব্যাংক একাউন্ট ফ্রিজ করে দিয়েছে। পল্লী জীবিকায়ন প্রকল্পের (পজীপ) প্রায় অর্ধ কোটি টাকা ভূয়া সমিতি ও ব্যক্তির নামে বরাদ্ধ দেয়ার এবং ভূয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অভিষ্ট জনগোষ্ঠীর কৃষি ও অকৃষি খাতে টেকসই আয়বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচনের লক্ষ্যে সরকার ১৯৯৮ সালে রুরাল লাইবলী হুড প্রজেক্ট (আরএলপি) বা পল্লী জীবিকায়ন প্রকল্পটি (পজীপ) চালু করলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুর্নীতির কারনে এর মুল লক্ষ্য ভেস্তে যাচ্ছে।
২০০২ সালের ০৫ মার্চ আখালী মুরা মহিলা বিত্তহীন সমবায় সমিতি লিঃ, পাখিয়ালা বিত্তহীন সমবায় সমিতি লিঃ এর রেজিষ্ট্রেশনের মধ্য দিয়ে বড়লেখায় এর কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে ৮৫ টি সমিতি রয়েছে এ উপজেলায়। তবে অফিসের একটি সুত্র জানায় এসব সমিতির অধিকাংশই কাগজে কলমে। কোন এক ব্যক্তিই সমিতি সৃষ্টি করে লোন গ্রহণ করেন। আর এতে সহযোগিতা করেন অফিসের কিছু কর্মকর্তা কর্মচারী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বড়লেখায় পল্লী জীবিকায়ন প্রকল্পের (পজীপ) প্রায় অর্ধ কোটি টাকার বেশি ভূয়া সমিতির নাম ব্যবহার করে মুলত লুপাটের মহোৎসব চলছে। ভূয়া ছবি, নাম, ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে নাম সর্বস্ব সমিতি ও ব্যক্তির নামে এসব ঋণ প্রদান করা হয়েছে। এর সবই ঘটেছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও মাঠ কর্মীর সহযোগিতায়। ঋণ গ্রহীতাদের অধিকাংশ এসব টাকায় সুদের ব্যবসা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কাগজে কলমে সমিতির নাম দেখিয়ে ঋণ বিতরণ করলেও বাস্তবে এসবের অস্থিত্ব নাম সর্বস্ব। এতে সরকারি বিপুল পরিমান টাকার লভ্যাংশসহ সমূদয় টাকাই জলে যাচ্ছে।
বিভিন্ন সমিতির কাছে প্রায় অর্ধ কোটি টাকার বেশি পাওনা রয়েছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন মাধ্যমে পুরুষ ও মহিলার ছবি সংগ্রহ করে ভূয়া নাম, ঠিকানা দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করা হয়। এরপর সে ছবি ও ভূয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ঋণ গ্রহণে ব্যবহার করা হয়। একটি সমিতি স্থানীয় এক সাংবাদকর্মীর ছবি ব্যবহার করে ভূয়া নাম, ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ করে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঋণ গ্রহণ বিষয়ে এ সংবাদকর্মী কিছুই জানতেন না।
নাম সর্বস্ব এসব সমিতির সভাপতি সম্পাদকদের সাথে যোগসাজস করে অফিসের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন থেকে ভূয়া নামে সদস্য সৃষ্টি করে ঋন প্রদান করছেন। যার কারনে মাঠে প্রায় অর্ধ কোটি টাকার বেশি অনাদায়ী রয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তির নামে বিতরণ দেখিয়ে মুষ্টিমেয় কয়েকজন দ্বারা ঋণ গ্রহণ ভূয়া ঋণ বিতরণের সামিল।
ব্যাংক একাউন্ট থেকে উপজেলা ব্যাবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও প্রকল্প কর্মকর্তার স্বাক্ষরে ঋন বিতরণের টাকা, স্টাফ বেতনসহ সব ধরনের ব্যয় উত্তোলনের নিয়ম রয়েছে। প্রকল্প কর্মকর্তা পছন্দের ব্যক্তিকেই সভাপতি নির্বাচিত করে নামে বেনামে ঋণ বিতরণ ও ভুয়া বিল ভাউচারে টাকা উত্তোলন করেন। যার সিংহ ভাগই আত্মসাৎ করা হচ্ছে। বর্তমান কমিটির সভাপতি তাজির উদ্দিন, সহসভাপতি সমছ উদ্দিন, খুদেজা বেগম, রাজিয়া বেগমসহ কমিটির অপর সদস্যদের জাল স্বাক্ষরে সদস্য সচিব পজীবের উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা মনোয়ারা বেগম নাসির উদ্দিনকে সভাপতি নির্বাচিত দেখিয়ে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যাংকে রেজুলশন প্রেরণ করেন। গত ১৯ এপ্রিল সংশ্লিষ্টরা সোনালী ব্যাংক বড়লেখা শাখায় জাল স্বাক্ষরে কমিটি গঠনের অভিযোগ দিলে ২০ এপ্রিল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পজীবের ৩৩০০২৯০৫ নম্বরের চালতি হিসাবটি ফ্রিজ করে দেন।
সোনালী ব্যাংক বড়লেখা শাখার ব্যবস্থাপক মো. আবাদ হোসেন মঙ্গলবার (২৬ এপ্রিল) পজীবের ব্যাংক একাউন্ট ফ্রিজ করার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘ব্যাবস্থাপনা কমিটির সভাপতিসহ অন্যান্যদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে একাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে।’
পজীবের প্রকল্প কর্মকর্তা মনোয়ারা বেগম গতকাল (২৬ এপ্রিল) জানান, ব্যাংক একাউন্ট ফ্রিজ করায় তার কাহিল অবস্থা চলছে।
ঋণ বিতরণ করলে কিছুটা দুর্নীতি হয় বলে তিনি স্বীকার করে বলেন, ‘ঋন গ্রহণকারী ব্যক্তিকে সমিতির সভাপতি সম্পাদক সনাক্ত করার নিয়ম থাকায় তার কিছু করার থাকে না। ব্যবস্থাপনা কমিটির জাল স্বাক্ষরে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করার কথা তিনি অস্বীকার করেন।