শ্রীমঙ্গল সংবাদদাতা | ১০ মার্চ, ২০১৫
সিলেট বিভাগে চা শিল্পে একটি বিশেষ নাম সাতগাঁও চা বাগান। এটি একটি ‘এ’ শ্রেনীভূক্ত চা বাগান। এই চা বাগানে ইজারাকৃত ভূমির পরিমাণ ৩০৭৮০৮৫ একর। এর মধ্যে চা উৎপাদন হয় ১,৬৩৭.৫১ একর জমিতে। প্রতি বৎসর চায়ের আবাদ বৃদ্ধি করা হয় মোট জমির আড়াই শতাংশ। গত চা বর্ষে বাংলাদেশের চা লক্ষ্যমাত্রা পূর্ণ না হওয়া সত্বেও সাতগাঁও চা বাগানে চা উৎপাদন হয়েছে ৭,৩০,৬৭৫ কেজি চা। এবৎসর শুধুমাত্র কাঁচাপাতাই উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে ৭ লাখ কেজি। গত ২ বৎসরে চা উৎপাদন এলাকা মোট জমির আড়াই শতাংশ করে বৃদ্ধি করায় বাৎসরিক কাঁচাপাতা উৎপাদন বৃদ্ধি ও এবারকার ৭ লক্ষ কেজি সম্ভাব্য বৃদ্ধি পাওয়া পাতা তৈরী চাপাতা রূপান্তর করতে যে বৈদ্যুতিক সুবিধা প্রয়োজন তা সরকারের ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য কোন গ্যাস সংযোগ প্রদান করা হবে না এই নির্দেশের ফলে বাধাগ্রস্থ হয়ে দাড়িয়েছে। চা উৎপাদনে মূল বৈশিষ্ট হলো নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। বন্ধ হয়ে হয়ে চলা বা জ্যাম দিয়ে দিয়ে চলা বিদ্যুৎ সরবরাহে চায়ের উৎপাদন খারাপ হয় এবং গুনগত মান নষ্ট হয়ে যায়।
সাতগাঁও চা বাগান তাদের বাগানের উৎপাদিত কাঁচাপাতা নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুতের মাধ্যমে তৈরী করার জন্য তাদের পূর্বে বসানো গ্যাস সংযোগের মাধ্যমে জেনারেটর দিয়ে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট চালিয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চা উৎপাদন করতেন। যদিও পাশাপাশি ডিজেল তেল ইঞ্জিন ও পল্লী বিদ্যুতের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা চালু আছে। কিন্ত এই দু-ই ব্যবস্থাই নিরবিচ্ছিন্ন প্রয়োজন মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারেন না তাই তা দিয়ে মানসম্পন্ন চা উৎপাদন করা সম্ভব হয় না।
সাতগাঁও চা বাগান সম্প্রসারিত চা বাগান এলাকা এবং পূর্বের চা বাগান এলাকা হতে উৎপাদিত অতিরিক্ত কাঁচাচাপাতা কে মানসম্পন্ন প্রক্রিয়াজাত করতে যে অতিরিক্ত এবং প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ প্রয়োজন তার জন্য নতুন আরও একটি ৫শ কেভিএ গ্যাস জেনারেটর বসানোর জন্য ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৬ তারিখে জালালাবাদ গ্যাস টি এন্ড ডি সিস্টেম লিমিটেড বরাবরে দরখাস্থ করেন।
জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড গ্যাস ভবন মেন্দীবাগ সিলেট এর শ্রীমঙ্গলস্থ আঞ্চলিক বিতরণ কার্যালয় এর ব্যবস্থাপক মোঃ আঃ মন্নান ২০১৩ ইংরেজির নভেম্বর মাসের ৭ তারিখে একপত্রে (সূত্র ৩১.০৬.০০০৬/৬৭৯) সাতগাঁও চা বাগানকে জানান আপনাদের চা কারখানা এর নতুন ৫শ কেভিএ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি জেনারেটরে গ্যাস সংযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে যথাযথ অনুমোদন পত্র ইস্যু করা হয়েছে। নিন্মলিখিত মালগুলো আমাদের ভান্ডারে না থাকায় আপনারা মালগুলো নিজ উদ্যোগে সংগ্রহ করে নিবেন। ঐপত্রে মালামালের বিবরণ দিতে গিয়ে জানান স্টেইনার ১টি ৩০,০০০/-, রেগুলেটর ১টি ৫০,৫৪৬/-, স্ক্রুড বল ভাল্ব ১টি ৫,২৫০/-, ফিসার ২৮৯ এইচ রিলিফ ভাল্ব ১টি ৩৯,০০০/-, নিডল ভাল্ব ১টি ৩,৪৭০/-, আর এফ বল ভাল্ব ১টি ১৬,৩৬০/-।
এছাড়া ঐতারিখে ৬৮০ নং সূত্রে ব্যবস্থাপক মোঃ আঃ মন্নান জানান মেসার্স সাতগাঁও চা কারখানার-এ ০১ (এক) টি নতুন (৫০০ কেভিএ) গ্যাস জেনারেটরে সংযোগ বর্ধিত করণ কাজের চাহিদাপত্র প্রদান করা হলো। সেই চাহিদাপত্র অনুযায়ী চা কারখানার নতুন (৫০০ কেভিএ) গ্যাস জেনারেটরে সংযোগ বর্ধিত করণের লক্ষ্যে মোট ৯,২৭,৮১৮ টাকার একটি প্রাক্কলন প্রস্তত পূর্বক চিঠির সঙ্গে ৪,১৬,৭৫৯ টাকার চাহিদাপত্র ইস্যু করা হল। চাহিদাপত্রে সারসংক্ষেপ নি¤œরূপ ঃ- ১। আর এম এস মডিফিশেন উপকরণ মূল্য ১,০২,০৬৭ টাকা ২। আভ্যন্তরীন এম এস পাইপলাইনের উপকরণ মূল্য ৭৭,২৭৯ টাকা ৩। সার্ভিস চার্জ ২৯,২৯৫ টাকা ৪। নিরাপত্তা জামানত নগদ (১/৩ অংশ) ২,০৮,০১৮ টাকা। মোট ৪,১৬,৭৫৯ টাকা এবং ব্যাংক গ্যারান্টি ৪,১৬,০৩৪ টাকা।
বর্ননা অনুযায়ী ৪,১৬,৭৫৯ টাকা ডিডি/পে-অর্ডার এর মাধ্যমে অত্র আবিকার অনুমোদিত ব্যাংকের নির্ধারিত শাখায় ১ মাসের মধ্যে জমা দিতে হবে। বর্ণিত টাকা জমা হওয়ার পর প্রাক্কলনে বর্ণিত কাজসমূহ অত্র কোম্পানীর তালিকাভূক্ত ১.৩/১.৪ শ্রেনীর ঠিকাদার নিয়োগ পূর্বক অত্র কার্যালয়ের তত্বাবধানে সম্পন্ন করতে হবে। গ্যাস সংযোগের পূর্বে ব্যবহৃত মালামালের কমবেশি/মূল্যহার পরিবর্তন হলে অতিরিক্ত/অব্যয়িত টাকা জমা/ফেরৎ প্রদানযোগ্য। প্রতি মাসের গ্যাস বিলের সহিত নিয়মানুযায়ী মিটার ভাড়া ১,৭৪২ টাকা ধায্য হবে।
জালালাবাদ গ্যাস টি এন্ড ডি সিস্টেম লিঃ, আঞ্চলিক বিতরণ কার্যালয়, শ্রীমঙ্গল উক্ত পত্রের সাথে মেসার্স সাতগাঁও চা কারখানা-এ ০১ টি নতুন ৫শ কেভিএ গ্যাস জেনারেটরে সংযোগ বর্ধিত করণ কাজের প্রাক্কলন ও প্রদান করেন। প্রাক্কলন হিসেবে ক. আর এম সি মডিফিকেশন ব্যয় ২,১৮,১৯০, খ. আর এম এস এর নতুন অংশ নির্মাণ ব্যয় ৫০,০০০/- টাকা গ. আভ্যন্তরীন এম এস পাইপলাইনের উপকরণ মূল্য ৭৭,৩৭৯/- টাকা ঘ. আম্ভ্যন্তরীন এম এস পাইপলাইনের স্থাপন ব্যয় ৪৫,০২৫/- টাকা। মোট টাকা ৩,৯০,৫৯৪/- টাকা। ঙ. সার্ভিস চার্জ ৭.৫% ২৯,২৯৫ টাকা। জেনারেটরের জন্য মাসিক অনুমোদিত লোড ৮৯,৮৫৬ ঘনমিটার, চ. নিরাপত্তা জামানত ১। জেনারেটরের জন্য ১১,২৬,৭৯৫/- ছ. সর্বমোট ব্যয় ৯,২৭,৮১৮/- টাকা।
এই চিঠি পাওয়ার পর সাতগাঁও চা বাগান কর্তৃপক্ষ ৩০ নভেম্বর ২০১৩ তারিখে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এর চেক নং ০১৯২৩৯২ এ ৪,১৬,৭৫৯ টাকা জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী বরাবরে জমা দেন এবং জালালাবাদ গ্যাস টি এন্ড ডি সিস্টেম লিঃ এর তালিকাভূক্ত ১.৩/১.৪ পাইপ লাইন ঠিকাদারী ফার্ম মেসার্স স্টার এন্টারপ্রাইজ বিথিকা-বি/২২, নোয়াপাড়া লামাবাজার, সিলেট কে কাজের জন্য চুক্তিবদ্ধ করেন।
সাতগাঁও চা বাগান কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে গ্যাস জেনারেটর স্থাপনের লক্ষ্যে ৫শ কেভিএ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি জেনারেটর এর আমদানী বাবত এলসি খোলার প্রস্ততি নেন এবং ফিকচার ফিটিং ক্রয় জেনারেটর স্থাপনের জন্য নতুন ভবন নির্মাণসহ আনুসাঙ্গিক কাজ শেষ করে যখন গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় তখন ১৫ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখে জালালাবাদ গ্যাস টি এন্ড ডি সিস্টেম লিঃ সাতগাঁও চা বাগান কর্তৃপক্ষকে জানান বাংলাদেশ তৈল গ্যাস খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্টোবাংলা) এর নতুন গ্যাস সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনার লক্ষ্যে গঠিত কমিটির ২৯/১২/২০১৪ইং তারিখে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য কোন গ্যাস সংযোগ প্রদান করা হবে না। তাই সাতগাঁও চা বাগানে ৫শ কেভিএ জেনারেটর স্থাপনের যে আবেদন তাহা আর বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
সাতগাঁও চা বাগান নতুন চা বর্ষে নতুন করে চায়ের কাঁচাপাতা প্রক্রিয়াজাত করে নতুন চা তৈরী শুরু করার পূর্ব মুহুর্তে এরূপ একটি আদেশ চা বাগানের ২০১৫ সালের চায়ের গুনগত মান রক্ষা করে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে দেখা দিয়েছে। একটি শিল্পকে নষ্ট করে অন্য শিল্পে গ্যাস সরবরাহের সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের উন্নয়নের পক্ষে বাধা স্বরূপ বলে অভিজ্ঞমহল মনে করেন। কারণ দেশে বর্তমানে গ্যাসের কোন অভাব নেই।
এছাড়া সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জের বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ড হতে নতুন করে অতিরিক্ত গ্যাস উত্তোলনসহ নতুন নতুন গ্যাসকুপের মাধ্যমে গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে। চা যেখানে বাংলাদেশের একটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী অর্থকরী ফসল এই শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার যেখানে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন সেখানে গ্যাসের ব্যবহার বন্ধ করা একটি মারাত্মক হুমকির স্বরূপ। সাতগাঁও চা বাগান কর্তৃপক্ষ দাবী করেন যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানে ক্যাপটিভ পাওয়ারের জন্য অনুমতি প্রদান করা হয়েছে সে সমস্ত প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ প্রদান করে নতুন কোনো দরখাস্থ গ্রহণ না করার আহবান জানান।
খবর নিয়ে জানা যায় সরকারের ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করার ফলে গ্যাস সংযোগের সম্পূর্ন কাজ শেষ করার পর শুধু সংযোগ প্রদান করা হবে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ১। বৃন্দাপুর চা বাগান ২। রশিদপুর চা বাগান ৩। বালিশিরা চা বাগান ৪। ডেনস্টন চা বাগান ৫। ভাড়াউড়া চা বাগান ৬। নাহার চা বাগান ৭। জুলেখানগর চা বাগান। সবগুলো চা বাগানেই গ্যাস সংযোগ প্রদান না করলে চলতি বছরের অধিক উৎপাদিত কাঁচাপাতা প্রক্রিয়াজাত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে খুবই অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে। এছাড়া শ্রীমঙ্গলে একমাত্র গ্লাস ফ্যাক্টরী অলীলা গ্লাস ফ্যাক্টরী ১০০০ কেভিএ ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর, রোশনী অটো রাইস মিল ৫০০ কেভিএ জেনারেটর, ও গ্রান্ড সুলতান টি রিসোর্ট এন্ড গলফ এ ৫০০ কেভিএ জেনারেটরে অবিলম্বে গ্যাস সংযোগ প্রদান না করলে সরকারের শিল্পনীতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।