উজ্জ্বল ধর, ওসমানীনগর | ২৬ মে, ২০১৬
আজ ২৬শে মে। সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার বুরুঙ্গাবাসীর জন্য কলংকিত একটি দিন। ১৯৭১ সালের ওইদিনে বুরুঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে পাকবাহিনীর গুলিতে হন শহীদ এলাকার ৭২জন সাধারণ মানুষ। বুরুঙ্গা গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া যোদ্ধাহত শ্রী নিবাস চক্রবর্তী। যিনি বর্তমানে বুরুঙ্গা শহীদ স্মৃতি পরিষদ’র সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯৭১ সালের ২৬শে মে সংঘটিত গণহত্যায় তিনি বাবা-ভাইকে হারিয়ে প্রায় নির্বাক হয়ে পড়েছিলেন। গুলিবিদ্ধ হয়েও তিনি কিভাবে প্রাণ নিয়ে ফিরেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে ৪৫ব ছর পরও তিনি ভুলতে পারেননি। এখনো শিহোরিত হন সেদিনের বিভিষিকাময় ইতিহাস স্মরণে।
সেই বিভীষিকাময় ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ২৫ মে পাকবাহিনী বুরুঙ্গায় এসে তথাকথিত শান্তি কমিটি গঠনের নামে পরদিন সকালে সভা আহবান করে। সবাইকে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়, শান্তি কার্ড দেওয়া হবে। এ কার্ড সাথে থাকলে সবাই নির্বিঘ্নে বসবাস করতে পারবেন। পাকিস্তানি সেনা ও দালালদের কথায় বিশ্বাস রেখে ২৬শে মে সকাল ৮টায় বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ে আহুত সভায় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সহস্রাধিক লোক জড়ো হয়েছিলেন। সভায় যেতে অনিচ্ছা থাকলেও শেষ পর্যন্ত আমি অনেকটা বাধ্য হয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম। আমি সভাস্থলে যাওয়ার পূর্বেই বিদ্যালয়ের পৃথক দুটি কক্ষে হিন্দু-মুসলিম দু সম্প্রদায়ের লোককে আলাদা করে রাখা হয়েছিলো।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, সভাস্থলে আসার সময় আমার সঙ্গে থাকা ভাদেশ্বর নিবাসী এ বিদ্যালয়েরই সহকারী প্রধান শিক্ষক সাইফুর রহমান আমাকে পথিমধ্যে কলেমা শিখিয়েছিলেন। যাতে আমি মুসলিম পরিচয় দিয়ে আত্মরক্ষা করতে পারি। কিন্তু বিদ্যালয়ের নিকটবর্তী হতেই পাকিস্তানি দালাল তিনফুটি খালিক ডাক্তার ধমকের সুরে আমাকে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের যে কক্ষে রাখা হয়েছিলো সে কক্ষে ঢুকিয়ে দেয়। সেখানে প্রবেশ করেই আমার শরীর অজানা আতংকে শিউরে উঠে। দেখলাম বুরুঙ্গাসহ এর আশ-পাশ গ্রামের শতাধিক হিন্দু লোক সেখানে অবস্থান করছেন। এদের বেশির ভাগই আমার পূর্ব পরিচিত। সবাই উদ্বিগ্ন। কয়েকজন ব্রেঞ্চের উপর এবং অন্যরা মেঝেতে বসে আছে। কারো মুখে টু-শব্দ নেই। আরো দেখলাম অদূরে দেয়াল ঘেঁষে আমার বৃদ্ধ পিতা দাঁড়িয়ে আছেন। দেখলাম ছোট দুটি ভাইকেও (একজন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র, অন্যজন পাঁচ বছরের) কক্ষে আটক রাখা হয়েছে। বিদ্যালয়ের তৎকালীন সিনিয়র শিক্ষক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক) প্রীতিরঞ্জন চৌধুরীকে অত্যন্ত বিমর্ষ দেখলাম। তিনি পরে জানালা দিয়ে পালিয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন (পালানোর সময় তার উপর এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষন করা হয়)। দেখতে পেলাম নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে আসা সিলেট জজ কোর্টের স্বনামধন্য এডভোকেট রামরঞ্জন ভট্টাচার্য্য ভাঙ্গা একটি চেয়ারে নির্বাক বসে আছেন।
পরের ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক। ডজন খানেক পাকসেনা যুদ্ধবস্থায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে দণ্ডায়মান, সূর্যের আলোয় তাদের বেনোয়েটেগুলো চিকচিক করছে। কোন লোক যাতে পালাতে না পারে সেজন্য বিদ্যালয় কক্ষের পেছনের প্রতিটি জানালায় সশস্ত্র পাহারা বসানো। বালাগঞ্জ রাজাকার বাহিনীর কমা-ার করনসী নিবাসী আব্দুল আহাদ চৌধুরী (ছাদ মিয়া) কারো নিকট টাকা বা মূল্যবান কোন জিনিস থাকতে তা দিয়ে দিতে চাঁপ প্রয়োগ করে। এ কথা শোনে যার কাছে যা ছিলো তা তারা পাকসেনা ও রাজাকারদের হাতে তুলে দিলো। সবাই আকুতি জানালো ‘দয়া করে আমাদের ছেড়ে দিন। আমরা রাষ্টদ্রোহী বা মুক্তিসেনা নই’। কিন্তু পাক হায়েনাদের কঠিন হৃদয় অসহায় লোকগুলোর আকুতি স্পর্শ করতে পারলো না। বরং তারা আরো হিংস্র হয়ে উঠলো।
ইতোমধ্যে বাইরে শোরগোল শোনা গেলো। লক্ষ্য করলাম, ‘পাকিস্তান- জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দিতে দিতে ভীত সন্ত্রস্ত্র মুসলিম সম্প্রদায়ের শতাধিক লোক বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে যে যার মতো বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। এদিকে আটকে থাকা মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্য থেকে দশ-বারো জনেকে দিয়ে স্থানীয় বাজার থেকে সংগৃহীত নাইলনের দড়ি দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবাইকে পিছমোড়া করে শক্তভাবে বেঁধে ফেলা হয়। তখন নিজ বুরুঙ্গা নিবাসী বাদশা মিয়া (পরে নির্বাচিত ইউনিয়ন চেয়ারম্যান) ‘শান্তি কমিটির নামে নীরিহ মানুষকে এভাবে নির্যাতন করা ইসলামের বরখেলাপ’ বলে মন্তব্য করলে তাকেও মুক্তিবাহিনীর লোক সম্বোধনে হত্যার হুমকি দেয় পাকসেনারা।
এ সময় আমি পালিয়ে যাবার চেষ্টা করলে হায়েনাদের একজন টের পেয়ে আমার দিকে তীব্র বেগে ছুটে এসে বুট দিয়ে আঘাত করে। আমার অষ্টম শ্রেণীতে পড়ুয়া ছোট ভাইটি মৃত্যু অবধারিত জেনে মায়ের কথা বলছিলো বার বার। সে আমাকে বললো, ‘দাদা মাকে বোধহয় আর দেখতে পাবো না’। তার এ কথায় আমি অত্যন্ত অসহায় হয়ে পড়ি। তার সেই করুণ আর্তি আজো আমাকে বেদনাহত করে। আমার বৃদ্ধা মা আজো বেঁচে আছেন। কিন্ত তাঁর নিকট ভাইয়ের আকুতি ভরা কথাগুলো ব্যক্ত করিনি কখনো।
এদিকে হাত বাঁধা ৭৩জন হিন্দু লোককে জল্লাদরা সারি সারি করে বসিয়ে দিল বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। কোন উপায় না দেখে আমিও লাইনের একেবারে পিছনে এসে বসে পড়লাম। হঠাৎ করেই সম্বিৎ ফিরে এলো। ভাবলাম, এ পৃথিবী থেকে তো শেষ বিদায় নিতে হচ্ছে। অসহায়ভাবে প্রকৃতির দিকে চোখ যেতেই অলক্ষ্যে যেন আওড়ে গেলাম রবীন্দ্রনাথের দুটো লাইন-
‘নমঃ নমঃ, সুন্দরী মম জননী জন্মভূমি,
গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর নয়ন জুড়ালে।’
মুহূর্তের মধ্যেই ব্রাশ ফায়ারে বৃষ্টির মতো গুলি এসে পড়তে লাগলো হাতবাঁধা অসহায় মানুষগুলোর উপর। চারদিকে তখন রক্ত গঙ্গা বইছে, কিন্তু এখানেই শেষ নয়। মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা লোকগুলোর উপর কেরোসিন ঢেলে অগ্নিসংযোগ করে দিলো নরপশুরা। আগুনের উত্তাপে মৃতপ্রায় কেউ একটু নড়ে উঠলেই তার উপর আবারো গুলি বর্ষণ করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হচ্ছিলো। আমার বাম হাতে মেশিনগানের গুলি লাগার সঙ্গে সঙ্গেই আমি মৃতের ভান করে মাটিতে শুয়ে পড়লাম। ধ্বংসযজ্ঞ শেষে নরপশুরা যখন চলে যাচ্ছিল, তখন কে একজন যন্ত্রণার কাতরতায় উঠে দাঁড়িয়েছিল। তা দেখে নরপশুরা আবারো ফিরে এসে গুলি চালায়। তখন আমার পিঠেও গুলি এসে লাগে। ভাগ্যিস, পাকিদের চায়নিজ বুলেট আমার শুধুমাত্র মেরুদন্ডের উপরের চামড়া ভেদ করেই বেরিয়ে গিয়েছিল, তাই বেঁচে গেলাম।
বেশ কিছুক্ষণ পর স্থানীয় লোকজনের গলার আওয়াজ পেয়ে মনে সাহস পেলাম। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াই। তখন পাকবাহিনী চলে গিয়েছে। অনেক লোক এসে লাশ দেখছে। আমিও দেখলাম লাশের মিছিল, যার মধ্যে আমার বাবা-ভাইরাও রয়েছেন। মনে মনে ভাবি, হায় ইশ্বর- একটু আগে আমিওতো লাশই ছিলাম!
এলাকায় থাকা নিরাপদ নয় ভেবে বাড়িতে না গিয়ে পায়ে হেঁটে প্যায়ারাপুর গ্রামের দিকে অগ্রসর হই। পরে ঐ গ্রামের নিকুঞ্জ বাবুর বাড়ির পাশে বাঁশঝাড়ের নীচে মাথা ঘুরে পড়ে যাই। সেখান থেকে নিকুঞ্জ বাবুর স্ত্রী আমাকে ঘরে নিয়ে মাতৃস্নেহে সেবা শুশ্রুষা করেন।
এদিকে স্বামী-সন্তানহারা আমার দিশেহারা মা সন্ধ্যার দিকে জানতে পারেন, আমি বেঁচে আছি এবং প্যায়ারাপুর গ্রামে অবস্থান করছি। এ সংবাদে তিনি পাগলের মতো ছুটে এসে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। রাতভর আমার শুশ্রুষা করেন। পরের দিন পূর্ব সিরাজনগর নিবাসী মনফর উদ্দীন চাচা চিকিৎসার জন্য আমাকে বালাগঞ্জ নিয়ে আসেন। বালাগঞ্জে ভালো কোন ডাক্তার না পাওয়ায় আমার শরীরের ব্যথা বাড়ছিলো। এলাকায় যে দু-একজন ডাক্তার ছিলেন গুলি খাওয়া রোগীদের চিকিৎসা না করতে তাদের উপর অলিখিত একটা নিদের্শ ছিলো। পাকসেনাদের ভয়ে কেউ আমার চিকিৎসায় এগিয়ে আসেনি। এই শরীর নিয়েই আমি কখনো নৌকা আবার কখনো পায়ে হেঁটে ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। ফেঞ্ছুগঞ্জের জলঢুপ নিবাসী মুক্তিযোদ্ধা দীলিপ আচার্য্য অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে লাতু সীমান্ত দিয়ে আমাকে করিমগঞ্জ পাঠিয়ে দেন। সেখানে প্রথম করিমগঞ্জ ও পরে শিলচর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘ ছয়মাস চিকিৎসার পর অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠি।
শিলচর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতলে চিকিৎসাধীন থাকাকালে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম. এ. জি ওসমানী ও মেজর জেনারেল সি. আর. দত্ত আমাকে দেখতে গিয়েছিলেন। তারা আমাকে সুস্থ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। আমি কথা দিয়েছিলাম অবশ্যই যাবো। কিন্তু সুস্থ হওয়ার আগেই দেশ শত্রুমুক্ত হয়ে যায়। হাতিয়ার নিয়ে রণাঙ্গনে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া আমার ভাগ্যে জুটলো না। দেশ স্বাধীনের একদিন পর স্বদেশে ফিরে আসি। বাড়িতে এসেই অনন্তকালের স্বাক্ষী বুড়ি নদীর তীরে বধ্যতূমিতে চলে যাই। অত্যন্ত বেদনাক্লিষ্ট হৃদয়ে দাঁড়িয়ে থাকি অনেকক্ষণ। মনে মনে বলি-
‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওহে ভয় নাই,
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান; ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’