নিজস্ব প্রতিবেদক ও শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি | ০৮ জুন, ২০১৬
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের নাহার পুঞ্জিবাসী খাসিয়াদের উচ্ছেদের নোটিশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন। নোটিশে আগামী ১২ জুনের মধ্যে খাসিয়াদের ভূমি ত্যাগ করতে বলা হয়েছে।এরপর থেকে সেখানকার শতাধিক খাসিয়া পরিবারে উচ্ছেদ আতংক বিরাজ করছে।
গত ৩০ মে মৌলভীবাজার জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) প্রকাশ কান্তি চৌধুরী নাহার পুঞ্জির খাসিয়াদের ভোগদখলীয় জায়গাকে খাসজমি হিসেবে চিহ্নিত করে উচ্ছেদ নোটিশ জারি করেন। উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভারতীয় সীমান্তবর্তী আদিবাসী গ্রাম নাহার-১ পান পুঞ্জির বাসিন্দাদের অন্যত্র চলে যেতে বলা হয়েছে। বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার নোটিশ পাওয়া মানুষদের মধ্যে নারী, শিশু ও বৃদ্ধই বেশি।
জানা যায়, শ্রীমঙ্গল উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার অদূরে ভারতীয় সীমান্তবর্তী নাহার-১ খাসিয়া পান পুঞ্জি। এখানকার বাসিন্দাদের প্রধান জীবিকা পান জুম। কয়েক প্রজম্ম ধরে নাহার পুঞ্জিতে খাসিয়ারা পান জুম করে জীবন ধারণ করছেন। নাহার চা বাগানের ভেতরেই পান পুঞ্জির অবস্থান। দীর্ঘদিন ধরেই বাগান কর্তৃপক্ষের সাথে জমি নিয়ে খাসিয়া আধিবাসিদের বিরোধ চলছিল।
খাসিয়া সম্প্রদায়ের নেতারা জানান, ১৯৬৪ সালে এই জমি লিজ নিয়ে নাহার চা বাগান গড়ে উঠে। তবে এর বহু আগে থেকেই এখানে খাসিয়ারা বসবাস করে আসছেন। জনৈক শামসুন্নাহার এই জমি লিজ নিয়ে চা বাগান গড়ে তোলার পর ১৯৮৪ সাল থেকে খাসিয়া সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা প্রায় ৩০০ একর জমি তাঁর কাছ থেকে সাব লিজ নিয়ে এখানে বসবাস করতেন।
২০০৭ সালে এই চা বাগানের দায়িত্ব নেয় সিটি গ্রুপ। এরপর থেকে বাগান কর্তৃপক্ষের সাথে ভূমি নিয়ে খাসিয়া সম্প্রদায়ের বিরোধ দেখা দেয়।
নাহারপুঞ্জির খাসিয়া সম্প্রদায়ের মন্ত্রী ডিবার মেন পটাস সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সিটি গ্রুপ বাগানের দায়িত্ব নেওয়ার পর আমাদের ভূমি সাব লিজ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এ নিয়ে তাদের সাথে বিরোধ দেখা দেয়। বাগান কর্তৃপক্ষ একাধিকবার আমাদের উচ্ছেদেরও চেষ্টা চালায়। এ নিয়ে সংঘর্ষে প্রাণহাণিরও ঘটনা ঘটে।
তিনি বলেন, এই ভূমি নিয়ে আদালতে দুটি মামলা চলছে। বাগান কর্তৃপক্ষ আমাদের উচ্ছেদের জন্য ও আমরা ভ’মির অধিকার চেয়ে মামলা করেছি। এই মামলা চালাকালীন সময়ে উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া বেআইনি।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা ভূমি অফিস থেকে জানা যায়, খাসিয়াদের দখলে থাকা ৩৫০ একর জমির মধ্যে ১০০ একর জমির দখল ছাড়তে বলা হয়েছে। এই ১০০ একর চা বাগানের জমি।
নাহার পুঞ্জির খাসিয়া গ্রাম প্রধান দিবারমিন পোতাম বলেন, আমরা কিছুতেই ভ’মির দখল ছাড়বো না। উচ্ছেদ করতে আসলে আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলবো। তিনি বলেন, বাংলাদেশ কেবল বাঙালিদের নয়, আমাদেরও মাতৃভূমি৷ তাই এখানে থাকার অধিকার আমাদেরও আছে৷’
এ ব্যাপারে নাহার চা বাগানের ব্যবস্থাপক পিযুষকান্তি ভট্টাচার্য বলেন, চা বাগান সম্প্রসারণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে খাসিয়াদের আওতায় থাকা জমিগুলোতে পানের বদলে চা চাষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কাউকেই উচ্ছেদ করা হবে না। বরং খাসিয়াদের চা বাগানে শ্রমিক হিসেবে পুনর্বাসন করা হবে।
এ ব্যাপারে মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) প্রকাশকান্তি চৌধুরী সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, শ্রীমঙ্গল উপজেলা অফিস থেকে উচ্ছেদের একটি নথি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিলো। সেই নথির সূত্র ধরেই উচ্ছেদের নোটিশ রেদওয়া হয়। তবে উচ্ছেদের নোটিশ প্রদানের পর খাসিয়া সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে আবেদন করে এই ইস্যুতে আদালতে মামলা থাকার কথা জানিয়েছেন। মামলার বিষয়টি আগে আমি জানতাম না।
ছবি : খোকন সিংহ