Sylhet Today 24 PRINT

টেংরাটিলায় এক যুগেও বন্ধ হয়নি গ্যাসের বুদবুদ

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ |  ২৪ জুন, ২০১৬

সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে অগ্নিকাণ্ডের যুগপূর্তি আজ। ২০০৫ সালের ২৪ জুন গ্যাস উত্তোলনে নিয়োজিত কানাডিয়ান কোম্পানী নাইকোর অদক্ষতায় সম্ভাবনাময় এই গ্যাসফিল্ডে দ্বিতীয় দফা ব্লু আউটের ঘটনা ঘটে। এতে গ্যাসফিল্ডের উপরের অংশের প্রায় ৩ বিসিক গ্যাস পুড়ে যায় এবং ৫২ বিসিক গ্যাসের রিজার্ভ নষ্ট হয় বলে জ্বালানী বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছিলেন। অগ্নিকান্ডে প্রায় ২ কি. মি এলাকার পরিবেশ, প্রকৃতি, জীবন ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। গত ১২ বছর ধরে প্রতিনিয়ত ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে চলছে বলে এলাকাবাসী জানান।

এখনো দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী নানান ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। নাইকো ও সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হলেও এখনো ক্ষতিপূরণ পায়নি এলাকাবাসী। সম্প্রতি নাইকো উল্টো আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করায় ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি নিয়ে সন্দিহান এলাকাবাসী।

এলাকাবাসী ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অগ্নিকান্ডের পরপরই গ্যাসকূপের প্রায় ২ কি. মি. এলাকাজুড়ে বুদবুদের সৃষ্টি হয়। ঘরবাড়ির বিভিন্ন অংশ দিয়ে গ্যাসের আগুন অনবরত বের হচ্ছে। ওই আগুন থেকে ঝূঁকি নিয়ে এলাকার অনেকেই রান্নাবান্না করছে। তাছাড়া অনবরত গ্যাসের বুদবুদের কারণ গ্যাসের চাপে এলাকার সকল নলকুপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকের দেখা দেওয়ার বিশুদ্ধ পানি সংকটে আছে এলাকাবাসী। তারা নানা স্বাস্থ্যগত সমস্যায়ও ভোগছে। জানা গেছে ২০১৪ সালেল অক্টোবরে গ্যাসক্ষেত্র এলাকায় মাত্রাতিরিক্ত বুদবুদ ও গ্যাসের উদ্বিগরণে আতঙ্ক দেখা দেওয়ায় সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও বাপেক্স প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পার্শবর্তী লোকদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেয়। ওই সময় ৯টি পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। আশপাশের অন্যদেরও সতর্ক হয়ে বসবাস করতে বলা হয়। এলাকাবাসী জানিয়েছেন গ্যাসক্ষেত্রের আশপাশের প্রায় ৬শ পরিবার এখন আতঙ্ক ও নানা সমস্যার মধ্যে ঝূকি নিয়ে বসবাস করছে। এলাকাবাসী জানান, ব্লুআউটের পর তাদের শারিরিক নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। চোখ জ্বালাপোড়া করা, মাথা ব্যাথাসহ চর্মরোগেরও প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে ক্ষতিপূরণ না দিয়েই ২০১১ সালে নাইকো খননের সকল যন্ত্রপাতি সরিয়ে নেয়। হাতেগোনা কয়েকজন প্রহরি বাদে এখন গ্যাসফিল্ডে তাদের কোন কর্মকর্তা নেই। গ্যাসফিল্ড ধ্বংস করে তারা চলে গেলেও রেখে গেছে ক্ষতির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত।

জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, পেট্রবাংলার চেয়ারম্যান ইসতিয়াক আহমেদ, বাপেক্স এর পরিচালক মো: আতিকুজ্জামান, ডিজিএম বাপেক্স মো: মিজানুর রহমান, বাপেক্স জিএম সিলেট আমির হোসন, ভূতত্ববীদ ড. ফরহাদুজ্জামানসহ একটি বিশেষজ্ঞ দল গ্যাসফিল্ড এলাকা পরিদর্শন করে। আন্তর্জাতিক আদালতে নাইকোর করা মামলার বিরুদ্ধে লড়তে ওই প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থলে এসে ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেন।

প্রতিমন্ত্রী ওই সময় সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক আদালতে নাইকোর মামলার মোকাবেলা করতে আমার এখানে এসে টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে বিস্ফোরণে কি পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি হয়েছে তা আর্ন্তজাতিক আদালতে তোলে ধরতে প্রমাণের জন্য এসেছি। নাইকোর কারণে আমাদের আবহাওয়ার, পরিবেশ, জীবন-ও প্রকৃতির কি পরিবর্তন হয়েছে সেসব প্রমণাদিও আন্তর্জাতিক আদালতে তোলে ধরব আমরা।

এর আগে গত ৩ ফেব্রুয়ারি টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ড ক্ষেত্র পরিদর্শনে আসে আমেরিকার কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান ‘ফোলি হগ এলএলপি’র ১১ সদস্যের প্রতিনিধিদল। আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে নাইকো’র দায়ের করা মামলা মোকাবেলার জন্য পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স বিদেশি এ কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠানের ১১ সদসের প্রতিনিধি দলকে নিয়োগ দিয়েছে। প্রতিনিধি দল টেংরাটিলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে পরিবেশ, প্রকৃতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয়-ক্ষতি বিষয়ে রিপোর্ট তৈরি করে। ব্লু আউট পরবর্তী এলাকার ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি, রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাবসহ নানা বিষয় নিয়ে রিপোর্ট তৈরি করে বিদেশী ওই বিশেষজ্ঞ দল। নাইকোর অদক্ষতার কারণেই গ্যাসফিল্ডে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে তারা জানিয়েছিলেন।

টেংরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও গ্যাসফিল্ড এলাকার বাসিন্দা ফরিদ উদ্দিন আহমদ বলেন, ১২ বছর ধরে আমরা আতঙ্কে বসবাস করছি। আতঙ্কের মাত্রা দিনদিন বাড়ছে। এখন রাস্তাঘাটে, বাসাবাড়িতে অনবরত আগুন জ্বলে। বুদবুদের মাত্রাও বেড়েছে। এতে এলাকার প্রাণ ও প্রকৃতির ক্ষতি বাড়ছে। ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে চললেও নাইকোর প্রতিশ্রুত ৮৪ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ এখনো পায়নি এলাকাবাসী।

গ্যাসফিল্ড পার্শবর্তী বসতবাড়ির বাসিন্দা টেংরাটিলা গ্রামের আবুল কাশেম বলেন, গ্যাস উদগীরণের  শব্দে এখনো রাতে ঘুমানো যায় না। শিশুরা ভয় পাচ্ছে। আমাদের অনেকেরই শ্বাস কষ্ট ও চর্মরোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর্সেনিকের কারণে বিশুদ্ধ পানি সংকটে আছি। এখন আবার যত্রতত্র গ্যাস বের হওয়ায় অনেকে ঝূকিপূর্ণভাবে রান্নাবান্না করছে।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডের আশপাশে এখনও বুদবুদ এবং গ্যাস উদগীরণ হচ্ছে। অগ্নিকান্ড এলাকার প্রকৃতি, পরিবেশ ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা সরকারের কাছে পাঠিয়েছি।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.