জাহাঙ্গীর আলম খায়ের, বিশ্বনাথ | ১৪ জুলাই, ২০১৬
নাম গাজীর মোকাম হলেও এটি এক গম্ভুজ বিশিষ্ট ব্যাতিক্রমধর্মী ঐতিহাসিক প্রাচীণ একটি মসজিদ। এখানে গাজী সাহেব কিংবা অন্য কারো মাজার নেই, নেই মসজিদ নির্মাণকারী কারো কবরও। তবে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের মুসলিম, হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান সম্প্রদায়সহ যুক্তারজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের কাছেও এটি ‘গাজীর মোকা’ হিসেবে পরিচিত। 'বালা-মোসিবত', 'দুরারোগ্য ব্যাধি' সহ যেকোন উদ্দেশ্য কিংবা মনের বাসনা পূর্ন করতে ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ এখানে মানত করে থাকেন এবং মসজিদের পুকুরে ডুব দিয়ে থাকেন। যা প্রাচীণ আমল থেকে এখনও বিদ্যমান। প্রায় ৫শ’ বছর আগে তৈরী ব্যতিক্রমী এ মসজিদটি সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের আমতৈল জমশেরপুর গ্রামে অবস্থিত।
সর্বমহলে ওই মসজিদটির কদর থাকলেও সরকারি অনুদান এখানে নিতান্তই অপ্রতুল। নানা সমস্যায় জর্জরিত এ ঐতিহাসিক মসজিদে পুকুর ছাড়া ওজুর জন্য নেই কোন আলাদা ব্যবস্থা। ফলে আমতৈল বাজার থেকে প্রায় শোয়া এক কিলোমিটার ভিতরে মসজিদে যাতায়াতের রাস্তার অবস্থাও একেবারেই নাজুক। তাছাড়া পবিত্র এই মসজিদের পানিও আগন্তুকদের কাছে পবিত্র মনে হলেও এখানে বিশুদ্ধ পানি সরবারের অভাব রয়েছে। সম্প্রতি আমতৈল বাজার থেকে ৫০০ মিটার রাস্তা পাকাকরণের কাজ চলছে, তবে বাকি রাস্তা যেমন ছিল তেমনই আছে।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় এমপি ইয়াহ্ইয়া চৌধুরী এহিয়া সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, অনেক দুর-দুরান্ত থেকে লোকজন এখানে আসেন। মসজিদের গুরুত্ব আর আমতৈল এলাকার প্রায় ২০হাজার মানুষের দাবির প্রেক্ষিতে করে সম্প্রতি অর্ধ-কিলোমিটর রাস্তা পাকাকরণ করে দিচ্ছি। বর্তমানে কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন ক্রমান্নয়ে গাজীর মোকামের বাকি রাস্তাও পাকাকরণ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার খান, আমতৈল জমসের পুর গ্রামের স্থানীয় মেম্বার আবুল খায়ের, মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো: শায়েখ মিয়া, সাবেক সভাপতি মো: হারকিল উদ্দিন, মসজিদের ইমাম মুফতি মাওলানা ফারুক আহমদ সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই এক নিয়তে এসে পুকুরে ডুব দেওয়ার পাশাপাশি অনেকেই মসজিদে ২/৩দিন অবস্থানসহ পুকুরের পানিও পান করেন এবং রোগমুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরেন।
তারা বলেন, পুন:নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করতে হলে আরও প্রায় অর্ধকোটি টাকা প্রয়োজন রয়েছে। সরকারের পাশাপাশি দেশী-বিদেশী ভক্তরা এগিয়ে আসলে ওই গাঁজির মোকামটিকে উপজেলার শ্রেষ্ট একটি মসজিদে রুপান্তরিত করা সম্ভব হবে। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য এখানে একটি গভীর নলকূপের প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তারা।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০কিলোমিটার দুরত্বে অবস্থিত এ মসজিদটির ভূ-সম্পত্তি প্রায় ৫শ’৪০শতক। মুসলামন ও সনাতন ধর্মাবলম্বী এবং প্রবাসী মানতকারীদের দেওয়া আয় দিয়ে ২০১১সালে চুন-সুড়কির ওই মসজিদটির পুন:নির্মানকাজ শুরু করা হয়। চলতি ২০১৬সাল পর্যন্ত প্রায় ৫বছর ধরে নির্মানকাজ চলে আসা ওই মসজিদে ৫০জনের বদলে বর্তমানে ১হাজার ৬শ’জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। দু’তলা ওই মসজিদে ৬তলা বিশিষ্ট সু-উচ্চ মিনারার পাশাপাশি সাড়ে ১৭ফুট উচ্চতার নতুন একটি গম্ভুজ রয়েছে। যার আয়তন প্রায় ৯৪ফুট, এরমধ্যে দৈর্ঘ্য ৭ফুট এবং প্রস্থ ২৯ফুট। মসজিদটির ঠিক সামনেই রয়েছে ওজু-গোসলের জন্য বিশাল একটি পুকুর। যেখানে আদিকাল থেকে অদ্যাবদি রোগমুক্তি কিংবা উদ্দেশ্য হাসিলে সকল সম্প্রদায়ের মানুষ গোসল করে থাকেন।
গাজীর মোকামের ইতিহাস: মসজিদটি কতসালে নির্মাণ করা হয়েছিল তা স্পষ্টভাবে স্থানীয়দের যেমন জানানেই তেমনি কে গাজী সাহেব তা-ও কারো জানানেই। তবে জনশ্রুতি আছে, প্রায় ৫শ’ বছর আগে বাঘের পিঁঠে চড়ে গাঁজি সাহেব বিশ্বনাথের আমতৈল গ্রামের গভীর জঙ্গলে প্রায়ই বিশ্রাম নিতেন। জঙ্গলের পাশেই বর্তমান জমসেরপুর গ্রামের হাজী ফনা মির্জা নামের দরিদ্র এক মুসল্লি বসবাস করতেন। পরপর তিনদিন স্বপ্নে দেখেন গাঁজি সাহেব তাকে ডেকে বলছেন পাশের ওই জঙ্গলের মোকামটির হেফাজত করো। ফনা মির্জা তখন ঝুঁপের ভিতর গিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে গোলাকার একটি অংশ দেখতে পান। পরবর্তীতে অলৌকিকভাবে আসা নির্মাণ সামগ্রী দিয়েই সেখানে এক গম্ভুজ বিশিষ্ট ছোট একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। যেখানে সর্বোচ্চ ৫০জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায়করতে পারেন। বাঘ-ভাল্লুকের জঙ্গলে মসজিদ নির্মানের ফলে ফনা মির্জা ওই এলাকায় ফনা গাজী হিসেবে সু-পরিচিতি লাভ করেন।