Sylhet Today 24 PRINT

সস্ত্রীক লাপাত্তা নবীগঞ্জের সেই জুনেদ এখন কোথায়?

মতিউর রহমান মুন্না, কামারগাঁও বনকাদিপুর(নবীগঞ্জ) থেকে ফিরে:  |  ২৮ জুলাই, ২০১৬

বাবার ঘোষণা “আমার ছেলে আইএস জঙ্গি হলে আমি আত্মহত্যা করবো”। জঙ্গি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে গ্রেপ্তার হয়ে কিছুদিন জেল খেটে পরে জামিনে বের হওয়া  মাওলানা জুনেদের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।  স্ত্রীকে নিয়েই সে নিখোঁজ। এক বছর হয়েছে তারা বাড়ি ফিরেনি। কেউ জানে না তারা কোথায়! অনেকেরই ধারনা স্বামী-স্ত্রী আফগানিস্তান না সিরিয়া আইএসএ যোগ দিয়েছে।



জানা যায়, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার দীঘলবাঁক ইউনিয়নের বনকাদিপুর গ্রামের আব্দুর রহিমের ছেলে মাওলানা জুনেদ হাবিব (জুনেদ আহমদ) তার স্ত্রীসহ দীর্ঘ  ১ বছর ধরে নিখোঁজ।  মাওলানা জুনেদ আহমেদ নব বিবাহিত স্ত্রীসহ নিখোঁজ নিয়ে নানা রহস্যের ধানা বেঁধেছে। জুনেদের বয়স বয়স ২৫ বছর। বিয়েও করেছিল মাদ্রাসা ছাত্রী কোরআনে হাফিজ মরিয়ম বিবিকে, তাও গোপনে। তবে বিয়ের পর থেকেই তার স্ত্রী থাকতো পিতার বাড়িতেই। প্রায় ১ বছর আগে হঠাৎ করে নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয় জুনেদ। সাথে নিয়ে যান তার নব বিবাহিত স্ত্রী হাফিজা মরিয়ম কে। আর বাড়ি ফেরেনি তারা। জুনেদের বাবার পরিবার এবং শ্বশুরে পরিবার তাদের হন্যে হয়ে খুঁজছে। হদিস পায়নি তারা কোথায় আছে, কি করছে। গত শুক্রবার ২২ জুলাই জুনেদের বাবা আব্দুর রহিম নবীগঞ্জ থানায় নিখোঁজ জিডি করেছেন। পুলিশ জিডির আলোকে অনেক খোঁজ খবর নিচ্ছে। তারাও কোন হদিস পাচ্ছে না।


পিছন ফিরে: গতকাল সরজমিন মাওলানা জুনেদ আহমেদের বাড়ি বনকাদিপুর গ্রাম। সেখানে গিয়ে পাওয়া গেল তার অজানা অনেক তথ্য। জুনেদের বাবা আব্দুর রহিম ও মা অজুফা বিবি জানান- জুনেদ স্থানীয় নুরগাঁও রুহুল উলুম কওমি মাদ্রাসা থেকে টাইটেল পাস করেছে। সে সব সময় একা চলাফেরা করতো। গ্রামের কারো সাথে সে মিশতো না। কম কথা বলতো। সবাই তাকে হুজুর ডাকতো। একা একা মসজিদে বসে থাকতো। মাঝে মধ্যে কোন হুজুর আসলে তাদের সাথে মসজিদে বসে কথা বলতো। মোবাইলে সবার সাথে যোগাযোগ করতো। ২০০১ সালে অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় সে গ্রেপ্তার হয়। এমন তথ্য দেন নিখোঁজের স্বজনরা।

সূত্র মতে জানা যায়-  দিনারপুর পাহাড়ে একদল মাদ্রাসা ছাত্রকে প্রশিক্ষণ দেয়। এ সময় দেশিও অস্ত্রশস্ত্রসহ সেনা বাহিনী তাকে পাহাড় থেকে গ্রেফতার করে। পরে সে দীর্ঘদিন জেল হাজতে ছিল। পরে মুক্তি পেয়ে সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। চাকুরী নেয় সিলেট নিরাময় পলি ক্লিনিকে। সে দীর্ঘ দুই বছর সেখানে চাকুরী করে। সেখানে বেতন ভাতা নিয়ে বনিবনা না হওয়াতে বাড়ি চলে আসে। গোপনে বিয়ে করে মাদ্রাসা ছাত্রী হাফিজা মরিয়ম বিবিকে। এর পরেই গত প্রায় ১৩ মাস আগে র‌্যাব-৯ এর একদল সদস্য বাড়ি থেকে তাকে আটক করে নিয়ে যায়। দুই দিন র‌্যাব ক্যাম্পে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে র‌্যাব সদস্যরা তাকে আবারো বাড়িতে ফিরে দিয়ে যায় বলে জানান জুনেদের মা অজুফা বিবি।

এ ঘটনার পর সে বাড়িতে বেকার বসে থাকতো। কেন সে বেকার বসে এসব করছে। তার বাবা জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঐদিন রাতেই সে বাড়ি থেকে চলে যায়। আর  সে বাড়ি ফিরে আসেনি।  কিছুদিন পরেই ঢাকার বল্গার হত্যা মামলার সন্দেহভাজন আসামী হিসাবে  তার নাম আসে। এসময় ডিবি পুলিশ তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে পায়নি। তখনই গ্রামবাসীর টনক নড়ে উঠে সবাই জুনেদ কে খুঁজতে থাকে। কোন সন্ধান পায়নি। তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন জানান তার স্ত্রীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সন্দেহের ধাঁনা বাধে তারা কোথায়। সবার ধারনা তারা আইএসে যোগ দিতে দেশ ত্যাগ করেছে। বাড়ির কারো সাথেই কোন যোগাযোগ নেই তার। এমনকি কোন দিন মোবাইল ফোনেও কথা বলেনি, এমনটাই জানালেন স্বজনরা। কিন্তু ১বছর ধরে সন্তান নিখোঁজ থাকলেও গত ২২ জুন নবীগঞ্জ থানায় তার বাবা একটি জিডি করেছেন। ২ বোন ও ৩ ভাইয়ের মধ্যে নিখোঁজ জুনেদ সবার বড়। জঙ্গি তৎপরতায় নিখোঁজ অনেকের জড়িয়ে পরার খবরে উদ্বিগ্ন তার পরিবার। সে কোথায় আছে? কি করছে? এ চিন্তায় আছেন তার মা-বাবা।

জুনেদের পরিবারের লোকজন জানান, ইতিপূর্বে জঙ্গি সন্দেহে জুনেদকে একাধীকবার গ্রেফতার করা হয়।  তবে তখন  ৪/৫ দিনের মধ্যেই আবার বাড়িতে ফিরে আসে। জঙ্গি সন্দেহে গ্রেফতার ও রহস্যজনক চলাফেরার কারণেই গ্রামবাসীর সন্দেহের তীর তার দিকে। বর্তমানেও জুনেদ জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত থাকতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই। অপর দিকে, নিখোঁজ সন্তান জুনেদকে ফিরে পেতে চান তার মা অজুফা বিবি। তার বাবা আব্দুর রাহিম জানালেন, জুনেদ যদি জঙ্গি তৎপরতায় আইএসে জড়িত থাকে। তাহলে  তিনি আত্মহত্যা করবেন। তিনি বলেন আমি আমার ছেলেকে তার স্ত্রীসহ ফেরত চাই। এনিয়ে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন নিখোঁজের পরিবারের লোকজন।  জুনেদের ভাই জাহেদ বলেন, আমি চাই আমার ভাই আবার ফিরে আসবে । সে স্বাভাবিক জীবনে চলাফেরা করবে। আর জঙ্গী হলে তার সঠিক বিচার আমরাও চাই। কোন জঙ্গি কে আমরা ভাই হিসাবে গ্রহণ করবো না।

এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি মেম্বার খালেদ হোসেন দুলন বলেন, মাওলানা জুনেদ একাধিক বার গ্রেফতার হয়েছে। র‌্যাব ও সেনা বাহিনী জঙ্গি সন্দেহে গ্রেফতার হলেও সে ছাড়া পেয়েছে। গ্রামে কারো সাথে সে মিসতো না। বর্তমানে সে নিখোঁজ কোন হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকেই বলছে সে আইএসে যোগ দিতে দেশ ত্যাগ করেছে। এখন আল্লাহই জানেন জুনেদ কোথায় আছে।

এ ব্যাপারে  জিডি তদন্তকারী কর্মকর্তা ইনাতগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই ধর্মজিত সিনহা সিলেটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, জুনেদ জঙ্গি সন্দেহে কয়েক বার গ্রেফতার হয়েছিল এই কথা সত্য। তার স্ত্রী হাফিজা মরিয়ম বিবিসহ একবছর যাবৎ নিখোঁজ।  আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি এর বেশি বলতে পারবো না। বর্তমানে জুনেদ জঙ্গি সংশ্লিষ্টতায় জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

নবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল বাতেন খাঁন  বলেন, আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি। এর আগে জঙ্গি হিসাবে গ্রেফতার হয়েছিল তাই সবাই তাকে সন্দেহ করছে ঐপথে যেতে পারে। ঢাকার ব্লগার হত্যায় সে জড়িত কি না সেটা এখন বলা যাবে না। পুরো বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.