নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৯ জুলাই, ২০১৬
“আর তখনই আমার দিকে এগিয়ে আসে ৫৭ ধারার নিষেধাজ্ঞা। আমার দিকে এগিয়ে আসে জঙ্গিদের কালাশনিকভ। ওরা বলে, ওরা বলে ‘খামোশ’। দেশে শান্তি বর্ষিত হোক। ‘জঙ্গিবাদীদের ধরিয়ে দিন’। আমাকে চুপ করতে হয়, আমাকে চুপ করিয়ে দেয়া হয়। তবু, তবু বন্ধুগণ...
‘আমার স্বপ্নের কথা বলতে চাই, আমার অন্তরের কথা বলতে চাই।’
জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ উচ্চারণে, গানে ও নাটকের মধ্য দিয়ে শুক্রবার বিকেলে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মুক্তমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবাদী ও স্পষ্টভাষী সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘নগরনাট’ এর জঙ্গিবাদ বিরোধি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘সারা পৃথিবীব্যাপী জঙ্গিবাদ রুখে দিতে, বুকে বুকে সাহস পুতে দেই, আয়’।
নগরনাটের ভাষ্যে, “দেশের পরিস্থিতি কতোটা খারাপ এখনো নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারছেন না। সোজা কথায় বলি, একটি ঘটনা আরো বহু বিচ্ছিন্ন জঙ্গিকে উৎসাহিত করবে। যাদের ঈমানী জোশ বেশি তারা এখন দলে দলে যোগদান করবে। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ মোটামুটি একটা ব্রেক থ্রু পার হলো। তারা জেনে গেলো, বাংলাদেশেও এই কাহিনী করা যেতে পারে। সামনে আরো দেখতে হবে বৈকি! ভবিষ্যত ভাবলেই পেট মোচড়াচ্ছে! চাই না দেশটা ইরাক, সিরিয়া, পাকিস্থান কিংবা আফগানিস্থানের মত হোক”।
গানে প্রতিবাদের শুরুতে নগরনাট স্মরণ করে জঙ্গিদের হাতে নিহত অনন্ত বিজয় দাশ সহ সকল নিহত ব্লগার, মুক্তমনা ও অন্যান্যদের। নগরনাটের ঘনিষ্ঠ স্বজন অনন্ত বিজয় দাশের স্মরণে শুরুতেই নগরনাট পরিবেশন করে গান ‘ছোট ছোট কলিদের ফোঁটাবো বলে’। তারপর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পরিবর্তিত বক্তব্যে পরিবেশন করে সঞ্জীব চৌধুরীর কালজয়ী গান ‘আমার স্বপ্নের কথা বলতে চাই”।
গানে বক্তব্যে নগরনাট স্মরণ করে পথে-বাসায়-মসজিদে-মন্দিরে-ঈদগাহ প্রান্তরে নিহতদের, স্মরণ গুলশান হামলায় নিহত অন্তস্বত্ত্ব ইতালিয় তরুণীকে, তার অনাগত মৃত শিশুটিকে। স্মরণ করে সাহসী তরুণ ফারাজ হোসেনকে, যে তার দুই বন্ধুকে বাঁচাতে জঙ্গিদের হাতেই দিয়েছিলো আত্মাহুতি। একই সাথে প্রতিবাদ জানায় মুক্তমত প্রকাশে বাধা হয়ে দাড়ানো আইনের বিতর্কিক ৫৭ ধারাকে। প্রতিবাদ জানানো হয় জঙ্গিবাদের উত্থানের বিরুদ্ধে।
গান পরিবেশন করেন নগরনাটের উজ্জ্বল চক্রবর্তী, অরূপ বাউল, আরিফা খাতুন কচি, তানভীর হোসেন ও অপরূপ দাস অয়ন। তবলায় সঙ্গত করেন সৌরভ এবং দোতারায় ছিলেন আকরাম আলী।
এরপর নগরনাট পরিবেশন করে নাটক “আদম টেস্ট”। মাসুদ রেজা রচয়িত ও অরূপ বাউল নির্দেশিত নাটকটিতে উঠে আসে ধর্মের নামে জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা, জঙ্গিবাদের উত্থানে ধর্মভিত্তিক দল ও ব্যক্তিদের সহযোগিতা, তরুণদের ব্রেনওয়াশ, ধর্মের নামে নাস্তিকতার ধোঁয়া তুলে মানুষ হত্যা, ইসলাম কায়েমের নামে গণহত্যার বিভিন্ন দিক।
উজ্জ্বল চক্রবর্তীর সঞ্চালনায় নগরনাটের প্রতিবাদী এ আয়োজনে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখে উদীচী সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী সিলেটের সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট মনির হেলাল ও সম্মিলিত নাট্য পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন। তারা তাদের বক্তব্যে উদীচীর সমাবেশে হামলার মাধ্যমে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের নতুন যুগের উত্থান, জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে সরকারের নিস্ক্রিয়তার বিভিন্ন দিক উল্লেখ করে সরকারকে দ্রুত ব্যাপক পরিসরে উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান। সেইসাথে পরিবারে সন্তানদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখার জন্য বাবা মায়েদের প্রতি অনুরোধ জানান তারা।
বক্তারা বলেন, দেশে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি বলে দাবিদাররা তাদের সন্তানদের পাঠান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিদের গড়ে তোলা নানা প্রতিষ্ঠানে, যেখানে তারা পরোক্ষভাবে জঙ্গিবাদের শিক্ষা দিচ্ছে। এ বিষয়ে সতর্ক থাকতেও অনুরোধ জানান তাঁরা।