দোদুল খান | ০৪ আগস্ট, ২০১৬
উচ্চ মাধ্যমিক পড়াশোনার সময় গানবাজনার প্রতি ঝোঁক থাকলেও হঠাৎ করেই পাল্টে যান জুয়েল আহমদ, হয়ে ওঠেন নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরিরের সক্রিয় কর্মী, যে কারণে তাকে ৮ মাস জেলও খাটতে হয়েছে। এমনটি জানান জুয়েলের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠিরা।
হিযবুত তাহরিরের সক্রিয় কর্মী মোহাম্মদ জুয়েল আহমদকে বুধবার সিলেট নগরীর আদালত এলাকা থেকে আরো তিন সন্দেহভাজন সহ আটক করে র্যাব। পরে সংশ্লিষ্টতা না পেয়ে বৃহস্পতিবার বাকি তিনজনকে ছেড়ে দিলেও জুয়েল আহমদের সাথে হিযবুত তাহরির ও জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত হয় র্যাব।
গ্রেফতারকৃত মোহাম্মদ জুয়েল আহমদ (২৭), সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার শ্রীধরা গ্রামের মৃত আব্দুল খালেক ও আলেয়া বেগমের ছেলে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ থেকে বিবিএ সমাপ্ত করে বর্তমানে এমবিএ-তে অধ্যয়নরত ও নগরীর শাহজালাল উপশহরের সি ব্লকের ৫/এ বাসার বাসিন্দা।
বিয়ানীবাজার উপজেলার শ্রীধরা গ্রামের স্থানীয়দের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, জুয়েল গ্রামের একটি উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। তার ৫ ভাইয়ের মধ্যে ৩ ভাই আমেরিকা প্রবাসী। আরেক ভাই আব্দুল কুদ্দুস টিটু আমেরিকান নাগরিক হলেও বর্তমানে বিয়ানীবাজার উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয়রা আরো জানান, দীর্ঘদিন থেকেই জুয়েলের গতিবিধি তাদের কাছে সন্দেহজনক, বিশেষ করে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরিরের সক্রিয় সদস্য হিসেবে গ্রেফতার হয়ে জেল থেকে জামিনের মুক্তির পর গ্রামে জুয়েলের যোগাযোগ বেড়ে যায়। গত ঈদের নামাযও সে গ্রামের ঈদগাহে পরে এবং উপজেলার ৭-৮টি তরুণ ছেলেদের নিয়ে তার বাড়িতে গোপন বৈঠক করার সময় গ্রামবাসী একাধিকবার বাধাও প্রদান করেন, তবে তার পরিবারের সদস্যরা সরকারদলীয় হওয়ায় গ্রামবাসী জুয়েলের বিরুদ্ধে বড় ধরণের প্রতিবাদ করতে পারেননি।
জুয়েলের সহপাঠীরা সিলেটটুডে টুয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, জুয়েল বিয়ানীবাজার উপজেলার শ্রীধরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মনির আহমদ একাডেমি থেকে ২০০৫ সালে এএসসি সমাপ্ত করে জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট স্কুল ও কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ভর্তি হয়। ২০০৭ সালে এইচএসসি পাশ করে ভর্তি হয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে। অনিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে ২০১৪ সালে বিবিএ সমাপ্ত করে এমবিএতে ভর্তি হলেও এখন অনিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
তার কলেজ জীবনের সহপাঠীরা জানান, কলেজে হোস্টেলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে ও বিভিন্ন ধরণের গান গাওয়ার দিকে ঝোঁক থাকায় কলেজের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক পরিচিতি ছিল জুয়েলের। এইচএসসি পরীক্ষা দেয়ার পর ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং করতে যাওয়ার পর থেকেই জুয়েলের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। পরে শাবিপ্রবিতে ভর্তি হবার পর তার এ সকল পরিবর্তন চোখে পড়ে সহপাঠিদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ে জুয়েলের সহপাঠিরা জানান, সে কিছু সংখ্যক সমমনাদের নিয়ে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রক্টরের অনুমতি নিয়ে তারা সাংগঠনিক সপ্তাহ পালন করে কর্মী সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে হিযবুত তাহরিরের সাথে জুয়েলের সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রকাশ হলে বন্ধ হয়ে যায় সংগঠনটির কার্যক্রম। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে প্রকাশ্যে জুয়েলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চলতে থাকে।
সিলেট আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের মার্চের ৯ তারিখ শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর সিলেট নগরীর শেখঘাট মসজিদের বাইরে হিযবুত তাহরিরের লিফলেট বিতরণকালে জুয়েল আহমদ ও শাবিপ্রবির সিভিল এন্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী আতিক শাররাজকে আটক করে পুলিশ। এরপর কোতোয়ালী পুলিশ তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে এবং এ ঘটনায় ৮ মাস জেল খেটে পরে জামিনে মুক্তি পান জুয়েল।
র্যাব-৯ এর মিডিয়া কর্মকর্তা এএসপি জিয়াউল হক সিলেটটুডে টুয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, জুয়েল নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহরিরের সক্রিয় সদস্য। তার বিরুদ্ধে সিলেট কোতোয়ালী থানায় একাধিক মামলা চলমান রয়েছে। বুধবার তাকে আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বৃহস্পতিবার তাকে কোতোয়ালী থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
তবে সিলেট কোতোয়ালী থানার সহকারী কমিশনার নুরুল হুদা আশরাফি জানান, “হিযবুত তাহরির কর্মী জুয়েল আহমদকে র্যাব আটক করে বৃহস্পতিবার (৪ আগস্ট) বিকেল ৬টায় আনুষ্ঠানিকভাবে কোতোয়ালী থানায় হস্তান্তর করেছে। তার বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এছাড়ায় কতোয়ালী থানায় ২০১২ সালের একটি মামলাসহ বিমানবন্দর থানায় একই আইনে আরও একটি মামলা রয়েছে”।