নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৬ মার্চ, ২০১৫
অবশেষে উচ্ছেদই হচ্ছে সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে স্থাপিত নজরুল একাডেমী। ১০ দিনের মধ্যে ভূমির দখল বুঝিয়ে দিতে নজরুল একাডেমীকে নোটিশ প্রদান করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) জেলা প্রশাসক স্বাক্ষরিত এক নোটিশে নজরুল একাডেমীকে ১০ দিনের মধ্যে দখল বুঝিয়ে দিতে বলা হয়। নজরুল একাডেমী কর্তৃপক্ষ এই নোটিশ প্রাপ্তির কথা স্বীকার করেছেন।
নজরুল একাডেমী, সিলেটের সাধারণ সম্পাদক সিটি কাউন্সিলর রেজওয়ান আহমদ বলেন, জেলা প্রশাসক স্বাক্ষরিত নোটিশটি আমাদের হস্তগত হয়েছে। পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে আমরা বসেছি।
অভিযোগ রয়েছে, একটি জামায়াতি ভূমিখেকো চক্র এই দেবোত্তর সম্পত্তি দখলে নিতে একটি পক্ষকে মালিক সাজিয়ে আদালতকে ভুল তথ্য দিয়ে নজরুল একাডেমীর দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠে। একাডেমীর দায়িত্বশীলদের অনেকেও ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়ে এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলামের স্বাক্ষরে নজরুল একাডেমীকে প্রেরিত নোটিশে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের একটি স্মারকের উল্লেখ করে লেখা রয়েছে, 'উপর্যুক্ত বিষয় ও সূত্রের প্রেক্ষিতে জানানো যাচ্ছে যে, মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের রিভিউ পিটিশন নং ১৩৯/২০০৮ এর ৪/১২/২০০৮ তারিখের রায় বাস্তবায়নার্থে উক্ত রিকুইজিশনকৃত বাড়িটি আইনগত মালিক/ উত্তরাধিকারীদের বরাবর অবমুক্তকৃত বাড়িটির বাস্তব দখল বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এমতাবস্থায় মহামান্য আদালতের রায় অনুযায়ী আগামী ১০ দিনের মধ্যে বর্তমান বরাদ্দ প্রাপক হিসেবে বাড়িটির বাস্তব দখল আইনগত মালিক/ উত্তরাধিকারীদের বরাবর বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো।'
জানা যায়, সিলেট নগরীরর প্রাণকেন্দ্র জিন্দাবাজারে ৬ শতক ভূমির উপর অবস্থিত সিলেট নজরুল একাডেমী। অধুনাকালে যা হয়ে উঠেছে সিলেটের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের অন্যতম কেন্দ্রস্থল।
৯১নং জে.এল. স্থিত এস.এ ৯৩৮ নং খতিয়ানের ৫২১৮ নং দাগের ৩ কক্ষবিশিষ্ট আর সি ২১বি/৪৮-৪৯ নং বাড়িটি একটি দেবোত্তর সম্পত্তি। বর্তমান নজরুল একাডেমীর .০৫৮৭ একর ভূমি শ্রী শ্রী গিরীধারী জিউ দেবতার পক্ষে নগরীর মির্জাঙ্গালস্থ কুঞ্জবিহারী দাসের পুত্র শ্রী কিরণ বিহারী দাস ও শ্রী কমলা কান্ত দাসের নামে রেকর্ডভূক্ত ছিলো।
১৯৪৩ সালে সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের আবাসন সংকট নিরসনের জন্য বাড়িটি জরুরী সম্পত্তি অধিগ্রহণ আইনের ৩ ধারা মোতাবেক রেকুইজিশন করা হয়। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এই বাড়িতে সরাকরী বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা কর্মচারীরা বসবাস করতেন। পরবর্তীতে বাড়িটি জড়াজীর্ণ হয়ে পড়লে বসবাসের অনুপযোগী ও পরিত্যক্ত বলে ঘোষণা করা হয়।
১৯৯৩ সালে জেলা প্রশাসন এই বাড়িটি দুটি কক্ষ নজরুল একাডেমী সিলেটকে মাসিক ১২৫ টাকা চুক্তিতে ভাড়া প্রদান করে। দু’দফায় এ ভাড়া বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৪৫০ টাকা হয়েছে। পরবর্তীতে ২০০২ সালে বাড়িটি অপর একটি কক্ষ মোস্তফা মানব কল্যাণ কুতুব মহল নামক একটি সামাজিক সংগঠনকে ভাড়া প্রদান করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সরকার বাড়িটি অধিগ্রহণের পঞ্চাশ বছর পর হঠাৎ করেই উদয় হয় এই জমির এক উত্তরাধিকারীর। ২০০৩ সালে জনৈক কপিল দাস দেবোত্তর সম্পত্তিটির সেবাইত কিরণ বিহারী দাস ও সেবাইত কমলা কান্ত দাসের উত্তরাধিকারী দাবী করে ভূমি মন্ত্রণালয়ে বাড়িটি অবমুক্তির জন্য আবেদন করেন। আর এই আবেদনের পূর্বেই কপিল দাস জামায়তি একটি চক্রটির সাথে সেরে নেন গোপন আতাঁত।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জামায়াতের এ্ চক্রই নজরুল একাডেমিকে দখলের জন্য দাঁড় করায় এক উত্তরাধিকারী।
মন্ত্রণালয় থেকে ছাড়িয়ে আনা আর দখল বুঝে পাওয়ার জন্য উত্তরাধীকারী দাবিদার কপিল দাস বাহ্যত আবেদন করলেও মূলতঃ আড়ালে থেকে জামায়াতি চক্রটি এর ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করছে বলে জানা গেছে।
দীর্ঘ কয়েকবছর ধরে এনিয়ে ভূমি মন্ত্রনালয় ও আদালতে মামলা চলে। মামলা-আপীলের কপিল দাসদের পক্ষে রায় দেন আদালত। ২০০৮ সালের জানুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করে জেলা প্রশাসন।
রিভিউ আবেদনেও হেরে যায় সরকার পক্ষ। আদালত উত্তরাধীকারীকে দখল বুঝিয়ে দিতে নির্দেশ দেন। এই নির্দেশের প্রেক্ষিতেই নজরুল একাডেমীর দখল ছাড়ার নোটিশ প্রদান করেন জেলা প্রশাসক।
সর্ষের মধ্যেই ভূত
অভিযোগ রয়েছে, সিলেট নজরুল একাডেমী ভূমিখেকোদের হাতে তুলে দেয়ার প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছেন একাডেমীর কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা। নিজেরা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়ে সমঝোতা করে নিয়েছেন ভূমিখেকোদের সাথে।
নজরুল একাডেমীর প্যাডে একটি সমঝোতাপত্র জেলা প্রশাসকের নিকট জমা দেয়া হয়। যাতে উল্লেখ রয়েছে ‘নজরুল একাডেমী ও জমির মালিকের মধ্যে এই মর্মে সমঝোতা হয়েছে যে, উল্লেখিত ভূমিতে একটি বহুতল ভবন নির্মান হলেও এর এক থেকে ৪র্থ তলার মধ্যে নজরুল একাডেমীকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা দেয়া হবে।’
সিলেটের বিদায়ী ভূমি হুকুম দখল কর্মকর্তা এ রকম একটি সমঝোতাপত্র তার হাতে এসে পৌঁছার কথা স্বীকার করেন। তবে নজরুল একাডেমীর কর্মকর্তারা এরকম সমঝোতার কথা অস্বীকার করেছেন।