হামিদুর রহমান, মাধবপুর | ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার চৌমুহনী ইউনিয়নের গোপিনাথপুর গ্রামে চাষ হচ্ছে থাইল্যান্ডের সুইট ব্ল্যাক, এশিয়ান-২ ও হলুদ জাতের তরমুজ।
বিদেশী এই তরমুজগুলোর বাংলাদেশী নামও আছে। বাংলাদেশে সুইট ব্ল্যাক তরমুজ জেসমিন নামে, এশিয়ান-২ তরমুজ বাংলালিংক নামে ও হলুদ তরমুজ নামে পরিচিত। ইতিমধ্যে হবিগঞ্জের কয়েকটি উপজেলায় জেসমিন ও বাংলালিংক তরমুজের পরীক্ষামূলক চাষ হয়েছে।
তবে মাধবপুরে বাণিজ্যিকভাবে এই প্রথম চাষ হচ্ছে বিদেশী তরমুজ এবং বিশেষ করে হলুদ জাতের তরমুজটি এই জেলায় প্রথম চাষ হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশী তরমুজের চেয়ে বিদেশী তরমুজের দাম বেশি পাওয়া যায় বলে গোপিনাথপুরের কৃষক বদু মিয়া প্রায় ৩ একর জমিতে থাইল্যান্ডি তরমুজ চাষ করেন। উন্নত জাতের তরমুজ ও বারমাশি শিম চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সবাইকে।
বদু মিয়ার চাষ করা তরমুজ, শিম, মরিচ, জমি থেকেই কিনে নিয়ে যাচ্ছে পাইকাররা। দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে তার ফলানো তরমুজ ও সবজি। খেতে সুস্বাদু উন্নত জাতের তরমুজের ক্রেতা অনেক বেশী।
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী চৌমুহনী ইউনিয়নের গোপিনাথপুর গ্রামের হযরত শাহ সুফি হাজী আব্দুল হামিদ মুন্সির ছেলে আব্দুল বাছির বদু মিয়া। উদাসীন প্রকৃতির হওয়ায় বেশী দূর পড়ালেখা হয়নি বদু মিয়ার। ৭ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন তিনি। যখন সংসারের দায়িত্ব তাঁর উপর পড়ে তখন বদু মিয়া নেমে পড়েন কৃষিকাজে।
প্রথমে পারিবারিক এক একর পতিত জমিতে শুরু করেন ধান চাষ। এক সময় ধান চাষের পাশাপাশি শুরু করেন সবজি চাষ। কঠোর পরিশ্রম সাফল্য এনে দেয় বদু মিয়াকে। গত বছর আলু চাষ করে উপজেলার সর্বোচ্চ আলু চাষি হিসাবে পুরষ্কার পান।
এখন কৃষি কাজ করেই চলে তার সংসার। স্ত্রী, ২ ছেলে ও ১ মেয়ে নিয়ে তার সংসার। বড় ছেলে আব্দুল মোতালিব এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী, মেয়ে অনুফা আক্তার ডলি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী, ছেলে মোশারফ পঞ্চম শ্রেণীতে পড়াশুনা করছে।
কৃষকদের সূত্রে জানা যায়, এই তরমুজ চাষ করতে প্রতি শতকে ১ হাজার টাকা খরচ হয়। তরমুজ চাষি বদু মিয়া জানান, তিনি ৩ বছর যাবত থাইল্যান্ডের সুইট ব্ল্যাক, এশিয়ান-২ তরমুজ চাষ করছেন তবে এই বছর প্রথম হলুদ তরমুজসহ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে তরমুজ চাষ করছেন।
কৃষক বদু মিয়া বলেন, অনেক বছর যাবত আমি দেশীয় তরমুজ চাষ করেছি কিন্তু বিগত ৩ বছর যাবত আমি পরীক্ষামূলক ভাবে এই বিদেশী তরমুজ চাষ করছি। আমি দেখলাম যে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করে যে ফলন পেয়েছি তা বিক্রি করে অনেক লাভবান হয়েছি। তাই এ বছর আমি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এই বিদেশী তরমুজ চাষ করেছি। তাছাড়া দেশি তরমুজের তুলনায় এই তরমুজের ফলন সংগ্রহ করতে অনেক কম সময় লাগে এবং বেশি দামে বিক্রি করা যায়। এই বিদেশী তরমুজ চাষ করতে কোনো সিজনের প্রয়োজন হয় না সারা বছর চাষ করা যায়।
বদু মিয়া আরো বলেন, আগস্টের শুরুতেই এই তরমুজের বীজ বপন করেছি এবং অক্টোবরের শেষের দিকে ফসল তুলে ফেলবো। ৩ একর জমিতে এই তরমুজ চাষ করতে তাদের খরচ হয়েছে ২ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা। তরমুজের প্রথম চালান বিক্রি করে সব খরচ বাদ দিয়ে তারা ২ লক্ষ টাকা লাভ পেয়েছেন। কিছু দিন আগে দ্বিতীয় চালান বিক্রি করেও প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা পেয়েছেন। বিদেশী এই তরমুজগুলো বিক্রি হয় সর্বোচ্চ ৯০ টাকা কেজি। প্রতিটি তরমুজের ওজন সর্বোচ্চ ৩ কেজি হয়।
কৃষকদের সূত্রে আরো জানা যায়, এই তরমুজগুলো তিনি ঢাকার কারওয়ানবাজার, যাত্রাবাড়ী, বাদামতলী, সিলেট বন্দর ও স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করেন।
সরজমিনে বদু মিয়ার খামারে গিয়ে দেখা যায় তিনি খামারে নতুন করে ১৬০ শতক জমিতে উন্নত জাতের তরমুজের বীজ রোপণ করতেছেন। খামারে কিছু জমি দুই রংয়ের তরমুজে ভরে গেছে। কোনটির উপরে সাদা আবার কোনটি কাল রংয়ের।
কৃষক বদু মিয়া বলেন, এবার তিনি কনিয়া জাতের ও সুইট বেক টু এই দুই জাতের তরমুজ চাষ করেছেন। ঢাকা থেকে বীজ এনে চাষ করেন। কনিয়া জাতের তরমুজটি উপরে কাল রংয়ের হলেও ভিতর একদম হলুদ। খেতে খুব মিষ্টি। সাদা রংয়ের তরমুজগুলো কেটে দেখা যায় ভিতরে লাল বর্ণ। পাশেই ২০ শতক জায়গায় শিম চাষ করেছেন। শিম গাছগুলো ফুলে ভরপুর সাথে শিমও ধরেছে। তবে এখনও পরিপক্ব হয়নি শিমগুলো। শিমের জমি পার হতেই মরিচের জমি।
চৌমুহনী ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা অর্ধেন্দু দেব অসীত বলেন, হাইব্রিড এই তরমুজ সারা বছর চাষ করা যায় এবং ৮০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে ফসল তোলা যায়। যেখানে দেশী তরমুজের ফলন সংগ্রহ করতে ১২০ দিন সময় লাগে। এই তরমুজে এক চাষে ২ বার ফলন সংগ্রহ করা যায়। এই থাইল্যান্ডি তরমুজের দাম দেশী তরমুজের চেয়ে অনেক বেশি তাই কম সময়ে বেশি লাভ করতে পারেন চাষিরা।
মাধবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আতিকুল হক জানান, বদু মিয়া এ উপজেলার কৃষকদের মডেল। তাকে অনুসরণ করে অনেকেই সবজি চাষে এগিয়ে এসেছে।