সিলেটটুডে ডেস্ক | ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬
সিলেট নগরীর কাজীরবাজার এলাকায় সুরমা নদীতীর দখল করে স্থাপন করা সেই বিলাসী শৌচাগার ২৪ ঘন্টার মধ্যে ভাঙা হবে বলে পরিবেশবাদীদের আশ্বস্থ করেছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. জয়নাল আবেদীন।
‘সুস্থ নদী, সুস্থ নগর’-এ প্রতিপাদ্যে রোববার বিশ্ব নদী দিবস উদযাপনকালে সিলেটের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচী পালন করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও সুরমা রিভার ওয়াটার কিপার।
প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন শেষে সিলেটের জেলা প্রশাসক-এর কাছে নাগরিক প্রতিনিধি দল সুরমা নদীতীর দখল করে নির্মাণ করা বিলাসী শৌচাগার ভাঙার দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি প্রদান করে । স্মারকলিপি গ্রহন করে জেলা প্রশাসক মো জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘নদী দখল করে নির্মান করা রুচিহীন এ শৌচাগার নিয়ে আমি নিজেও বিব্রত। বিশ্ব নদী দিবসের প্রতিপাদ্য বিবেচনায় এটি কোনোভাবেই মানা যায় না। আমি ২৪ ঘন্টার মধ্যে এটি ভাঙার ব্যবস্থা করছি।’
স্মারকলিপি প্রদানের পুর্বে বেলা সাড়ে ১১টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ‘কাজীরবাজারে সুরমা নদীতীর দখল করে বিলাসী শৌচাগার ভাঙতে প্রশাসনের নিরবতায় প্রতিবাদী অবস্থান ও স্মারকলিপি পেশ’ শীর্ষক ব্যানার নিয়ে প্রায় আধাঘন্টা প্রতিবাদী অবস্থান চলে । এতে প্রবীণ আইনজীবী ও মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান চৌধুরী'র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় টিআইবির সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি ইরফানুজ্জামান চৌধুরী, সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আজিজ আহমদ সেলিম, সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি ইকরামুল কবির, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সিলেট বিভাগীয় প্রধান সৈয়দা শিরিন আক্তার, মরমি কবি হাসন রাজা গবেষক সামারীন দেওয়ান, দৈনিক সবুজ সিলেটের বার্তা সম্পাদক ও বাপা সিলেটের সংগঠক ছামির মাহমুদ, যুগান্তর স্বজন সমাবেশের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক প্রণব কান্তি দে, অ্যাডভোকেট সাব্বির আহমদ প্রমুখ অংশগ্রহন করেন ।
প্রতিবাদী অবস্থান চলাকালে বাপা সিলেটের সাধারণ সম্পাদক ও সুরমা রিভার ওয়টারকিপার আবদুল করিম কিম আয়োজক সংগঠনের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করে বলেন, এবারের নদী দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারন হয়েছে 'সুস্থ নদী, সুস্থ নগর'। অর্থাৎ আমাদের নগরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদী যদি সুস্থ থাকে তবে আমাদের নগরও সুস্থ থাকবে । নদী যদি অসুস্থ হয় তবে নগরকেও অসুস্থ করে দেবে।
সুরমা নদীর তীরে আমার ঠিকানা রে...বলে যে সুরমা নিয়ে গর্ব করে সিলেটের মানুষ সেই সুরমা নদীর জায়গা দখল করে শৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে । তাও আবার নগর ভবন (অস্থায়ী) ও কোতোয়ালী থানার খুব কাছে এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামান্য দূরে।
সিলেট নগরের একটি বিশেষ পেশার কিছু রুচিহীন মানুষ এমন একটা কান্ড না হয় করেই ফেলেছে । সংবাদ মাধ্যম তা ফলাও করে দেশের মানুষের কাছে তুলেও ধরেছে । জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন সংবাদটি জানতে পেয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসকের কাছে জরুরী চিঠি পাঠায় । কিন্তু এখন পর্যন্ত নির্মানের প্রায় তিন মাস হয়ে গেলেও রুচিহীন দখলদারদের বিরুদ্ধ্যে কোন ব্যাবস্থা নেয়া হয় নাই । বিলাসী এ শৌচাগারে শৌচকর্ম নিয়মিত চলছে।
টিআইবির সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি ইরফানুজ্জামান চৌধুরী বলেন, এমন রুচিহীন অপকর্মকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া প্রসাশনের রুচিহীনতার পরিচয় । আড়াই মাস ধরে নগরের কর্তাব্যাক্তিরা এই শৌচাগার অপসারণ করতে পারেন নাই । এই অপসারণ করতে না পারার দায় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদেরকে নিতে হবে। নগরের সভ্য, সুশীল, সংস্কৃতিবান, রুচিবান নাগরিকদের নদীকে অসুস্থ করার এই অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধ্যে কথা বলতে হবে । প্রশাসনকে এই দায়সারা দায়িত্বের জন্য জবাবদিহিতার মুখোমুখি করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে প্রবীণ আইনজীবী ও মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান চৌধুরী সুরমা নদী দখল করে কাজীরবাজারে নির্মান করা 'বিলাসী শৌচাগা'র ভাঙ্গতে প্রশাসনের নিরবতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি অবিলম্বে নদী দখলদারদের উচ্ছেদ করা ও নির্মাতাদের অর্থে 'বিলাসী শৌচাগা'র ভাঙার দাবি জানান।
প্রতিবাদী অবস্থান শেষে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিতে আনুষ্ঠানিক ভাবে হস্তান্তর করা হয় । স্মারকলিপিতে বিলাসী শৌচাগার সম্পর্কে বিস্তারিৎ তুলে ধরে বলা হয়, অবৈধ এই শৌচাগার নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে । নগরের প্রানকেন্দ্রে নদী দখলের এই রুচিহীন চিত্র দেখে সিলেটের সর্বস্তরের নদীপ্রেমিকরা ক্ষুব্ধ। তাঁরা আশা করেছিলেন সিলেটের প্রশাসন অবিলম্বে ব্যাবস্থা গ্রহন করে নদীকে তার ভূমি ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু বিষয়টি জানাজানি হওয়ার মাস তিনেক পরও আশানুরূপ কোনো পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, এ অবস্থায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের পরিচালক (সমন্বয়) ইকরামুল হক সিলেটের জেলা প্রশাসক বরাবর ‘জরুরি চিঠি’ দেন। জেলা প্রশাসক 'জেলা নদী রক্ষা কমিটি'র আহ্বায়ক হওয়ায় তাঁর কাছে ২২ জুন ওই চিঠি দিয়ে সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের এ ভূমিকায় নাগরিকরা আস্বস্ত হয়েছিলেন, কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় প্রায় তিন মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও রুচিহীন দখলদারদের বিরুদ্ধ্যে অদ্যাবধি কোনো ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়নি। বিলাসী এ শৌচাগার বহাল তবিয়তে আছে। সেখানে নিয়মিত শৌচকর্মও চলছে। যা সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সুরমা নদীকে প্রতিনিয়ত দুষিত করছে । একই সাথে এই অপকর্মকে দণ্ডিত না করায় নদী দখলের সংস্কৃতি উৎসাহিত হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক স্মারকলিপি গ্রহনকালে 'বিলাসী শৌচাগার' এখনও অপসারণ না হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনিও এবারের নদী দিবসের প্রতিপাদ্যের সঙ্গে শৌচাগার একটি বিব্রতকর স্থাপনা অভিহিত করে ২৪ ঘন্টার মধ্যে তা ভাঙার ব্যবস্থা করবেন বলে নাগরিক প্রতিনিধিদের আস্বস্ত করেন।