দেবকল্যাণ ধর বাপন | ২০ অক্টোবর, ২০১৬
সিলেটে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবসা। নগরজুড়েই রয়েছে অবৈধ আর অনুমোদনহীন অ্যাম্বুলেন্সের দৌরাত্ম্য। ন্যুনতম সুবিধা না রেখে অবৈধভাবে মাইক্রোবাসকেই অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে ব্যবহার করছে অনেক প্রতিষ্ঠান। এতে করে প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
ভুক্তভোগীদের দাবি, অপ্রতুলতার কারণে প্রয়োজনের সময় পাওয়া যায় না সরকারি অ্যাম্বুলেন্স, আর বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে নেই প্রয়োজনীয় সেবা সুবিধা। ফলে অনেক সময় রোগী রাস্তায়ই মারা যান।
বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স-সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, সিলেটে বৈধ অ্যাম্বুলেন্স আছে মাত্র ১২টি। অথচ অবৈধভাবে অনুমোদন ছাড়াই আরো প্রায় ৬০ টি অ্যাম্বুলেন্স নগরীতে ব্যবসা করছে। এদের বেশিরভাগই মাইক্রোবাসকে অ্যাম্বুলেন্সে পরিণত করা হয়েছে। এতে নেই ন্যুনতম সেবা সুবিধা।
এদিকে, সিলেটের বেশিরভাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে নেই এ্যাম্বুলেন্স সুবিধা। তাই বাধ্য হয়েই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এসব লক্করঝক্কর অ্যাম্বুলেন্সের দ্বারস্থ হতে হয় রোগীর স্বজনদের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, একটি অ্যাম্বুলেন্সে রোগীদের জন্য বেশ কিছু বিশেষ ব্যবস্থা থাকতে হয়, যা সাধারণ গাড়িতে থাকে না। এরমধ্যে রয়েছে রোগীর শোয়ার ব্যবস্থা, অক্সিজেন সিলিন্ডার, অক্সিজেন মাস্ক, ফাস্ট এইড বক্স, স্যালাইন প্রদানের জন্য স্ট্যান্ড, স্ট্রেচার ও সাইরেন থাকতে হয়। এছাড়াও সেবিকা এবং চিকিৎসক বসার জন্য আলাদা জায়গা থাকতে হয়।
প্রয়োজন-ভেদে অ্যাম্বুলেন্সে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, ডায়াগনোসিস সুবিধাসহ ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের সকল সুবিধা রাখা যেতে পারে।
তবে সিলেটের বেশিরভাগ অ্যাম্বুলেন্সেই এই ন্যুনতম সুবিধাও নেই বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাই।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ডা. বনদীপ লাল দাস বলেন, সবরকম সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত না করা সত্ত্বেও রাস্তায় প্রচুর অ্যাম্বুলেন্স চলে, তাছাড়া অনুমোদনবিহীন অ্যাম্বুলেন্সের অভাবও নেই। তবে এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগের তেমন কিছু করার থাকে না। তবে বিভিন্ন সময় অ্যাম্বুলেন্সের অনুমোদন দানকারি প্রতিষ্ঠান বিআরটিএকে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবস্থা নিতে জানানো হয়।
সিলেট জেলা সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, অ্যাম্বুলেন্সের অনুমোদন দেয় বিআরটিএ। ফলে অনুমোদনপ্রাপ্ত অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারে কেবলমাত্র তারাই। তবে জনদুর্ভোগ কমাতে, অনুমোদনহীন অ্যাম্বুলেন্সের বিরুদ্ধে সবকটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই আরো বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নগরীতে রয়েছে অন্তত ৩০টি অ্যাম্বুলেন্সসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭০ টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। যাদের বেশিরভাগের এ্যাম্বুলেন্সের কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই।
অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ী ও চালকদের দাবি, প্রশাসনের সাথে মাসিক চুক্তির বিনিময়ে অবৈধ এই বিপুল সংখ্যক অ্যাম্বুলেন্স নগরীতে চলাচল করে।
বিআরটিএ সূত্রে জানা যায়, একটি মাইক্রোবাসের কাগজপত্র প্রস্তুত করতে যে পরিমাণ টাকা প্রয়োজন হয় তার প্রায় দ্বিগুণ টাকা খরচ হয় একটি অ্যাম্বুলেন্স অনুমোদনে। খরচ বাঁচাতে অনেক প্রতিষ্ঠান সাধারণ মাইক্রোবাসের ভেতরের সজ্জা পালটিয়ে ও সাইরেন লাগিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে রূপান্তর করে। একটি অনুমোদনপ্রাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স সড়ক কর মওকুফসহ বিভিন্ন সুবিধা পেয়ে থাকে বলেও বিআরটিএ সংশ্লিষ্টরা জানান।
সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ সড়কের একটি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চালক বলেন, সিলেটে যেসব অ্যাম্বুলেন্স চলে, তাদের বেশিরভাগেরই রেজিস্ট্রেশন নেই। অনেক গাড়ির আবার ব্লু-বুক, সড়ক অনুমোদন নেই, গাড়ির ফিটনেস হালনাগাদও করা হয়নি দীর্ঘদিন। এছাড়াও অনেক অ্যাম্বুলেন্স চালকদের নেই গাড়ি চালানোর লাইসেন্স।
একই এলাকার আল মদিনা অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের সত্ত্বাধিকারী সম্রাট আকবর সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সিলেটে আমাদের প্রতিষ্ঠান, পারাপার আর শাহজালাল অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের ১২ টি অ্যাম্বুলেন্সের অনুমোদন আছে। আর কারো কোনো অনুমোদন নেই। অথচ এই ১২ টি ছাড়াও সিলেটে আরো ৬০টির মতো অ্যাম্বুলেন্স অবৈধভাবে চলাচল করছে।
অনেকে ব্যক্তিগত নামে গাড়ির অনুমোদন নিয়েও অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা করছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ সিলেট সার্কেলের সহকারি পরিচালক প্রকৌশলী মো. এনায়েত হোসেন মন্টু বলেন, অনুমোদনের সময় সকল শর্ত পূরণ করলেও অনেক সময় দেখা যায় পরে তারা শর্তগুলো মানছে না। অ্যাম্বুলেন্সে যেসব জিনিসপত্র থাকা দরকার তা রাখছে না। তাছাড়া প্রচুর অননুমোদিত অ্যাম্বুলেন্সও রয়েছে যাদের বিরুদ্ধে দ্রুতই ব্যবস্থা গ্রহণ হবে।
এ ব্যাপারে সিলেট ট্রাফিক পুলিশের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সার্জেন্ট বলেন, নগরীতে যতগুলো অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে, এদের অধিকাংশই মাইক্রোবাসের লাইসেন্স নিয়ে চলছে।
তিনি বলেন, কিছুদিন আগে শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকের অ্যাম্বুলেন্সের বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইনে মামলা দায়ের করায় রাজনৈতিক চাপে পড়েছিলাম। তারপর থেকেই এ বিষয়ে সতর্ক হয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছি।
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মুশফিকুর রহমান সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সিলেটের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের অবস্থা অনেকটা ‘লোম বাছতে কম্বল উজাড়’ করার মতো। সিলেটে যতটা অ্যাম্বুলেন্স আছে তার বড় একটি অংশ অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস হিসেবে অনুমোদনহীন।
তিনি বলেন, সিলেট শহর ছোট, সে তুলনায় নগরীর ট্রাফিক সমস্যা অনেক বেশি। অপ্রতুল ট্রাফিক পুলিশ নিয়ে অন্য সকল সেবা নিশ্চিত করার পর অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন গাড়ির কাগজপত্র শতভাগ ঠিক আছে কিনা, তা দেখা সবসময় সম্ভব হয় না।