নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৬ নভেম্বর, ২০১৬
সরকারের পক্ষ থেকে দেশের ৯৯ শতাংশ জনগণকে স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় আনার দাবি করা হলেও টাঙ্গুয়ার হাওরের ৬০ শতাংশ মানুষই এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
গত শুক্রবার সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর-তীরবর্তী তাহিরপুর উপজেলায় গিয়ে দেখা গেছে, বাঁশ ও ছালার বেড়া দিয়ে তৈরি শৌচাগার ব্যবহার করছে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ। ওই সব খোলা শৌচাগারের মলমূত্র আবার মিশছে হাওরের পানিতে। ফলে দূষিত হচ্ছে হাওরের পরিবেশ। এতে মারাত্মক স্বাস্থ্য-ঝুঁকিতে রয়েছে হাওরপাড়ের বাসিন্দারা।
সর্বশেষ জাতীয় আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী সুনামগঞ্জে মোট ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৩০৯টি পরিবার রয়েছে। যাদের মধ্যে প্রায় ২ লাখ পরিবার স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ব্যবহার করে না বলে জানিয়েছে সুনামগঞ্জ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।
স্যানিটেশন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, স্যানিটেশনের সুবিধাপ্রাপ্তদের বেশিরভাগই শহরের বাসিন্দা। তবে হাওর-তীরবর্তী স্থানে বসবাসরত পরিবারগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশই স্যানিটেশনের আওতার বাইরে।
মূলত বছরের প্রায় আট মাস পুরো এলাকা পানির নিচে থাকায় ওই অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষকে এখনো স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি বলে দাবি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে স্যানিটেশন নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর। এছাড়া হাওর অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ হতদরিদ্র হওয়ায় অধিক টাকা ব্যয় করে উন্নত শৌচাগার নির্মাণের সক্ষমতাও নেই।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছর সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা প্রশাসনের নেয়া বোমা মেশিনের ড্রাম দিয়ে তৈরি এক ধরনের ভাসমান শৌচাগার নির্মাণের পাইলট প্রকল্প সফলতা পেয়েছে।
জানা যায়, ২০১০ সালের মধ্যে দেশের শতভাগ মানুষকে স্যানিটেশনের আওতায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নেয় সরকার। তবে ২০১০ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এর পর ২০১৫ সালে ৯৯ শতাংশ মানুষকে স্যানিটেশনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়।
উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা আইডিয়ার নির্বাহী পরিচালক নজমুল হক বলেন, সরকারি হিসাবে ৯৯ শতাংশ জনগণকে স্যানিটেশনের আওতায় আনা হয়েছে বলা হলেও উন্নত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গ্রহণ করে মাত্র ৬১ শতাংশ মানুষ।
তিনি বলেন, হাওড় অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষই স্যানিটেশন সুবিধাবঞ্চিত। হাওড়ে স্যানিটেশন নিয়ে অনেক কাজ করা হলেও সমন্বয়হীনতার অভাবে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে না।
সুনামগঞ্জ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবুল কাশেম জানান, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল হাওড়াঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। তবে কিছু অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক প্রকল্পের সফলতা আসছে না। সম্প্রতি স্কুলে স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় ৪০৭টি স্যানিটারি ব্লক নির্মাণ করা হয়েছে।
ভাসমান শৌচাগার: বছরের আট মাস পানির নিচে থাকায় হাওড় অঞ্চলে প্রথাগত স্যানিটেশন কার্যক্রম পরিচালনা করে সফলতা পাওয়া কঠিন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বিকল্প শৌচাগার ব্যবস্থার উদ্ভাবন করেন বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ তালুত। তিনি হাওড়বাসীর জন্য নির্মাণ করেন ভাসমান শৌচাগার।
প্রাথমিক পর্যায়ে ফতেহপুর ইউনিয়নের ১০০টি পরিবারের মধ্যে ৪৮টি ভাসমান শৌচাগার বিনামূল্যে প্রদান করেছে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা প্রশাসন।
বতর্মানে উচ্চ শিক্ষার্থে দেশের বাইরে আছেন মোহাম্মদ তালুত।
দেশে থাকাকালিন সময়ে তালুত বলেন, ‘যোগদানের পর প্রথম যে বিষয়টি খেয়াল করি তা হচ্ছে, এলাকার মানুষজন আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও নানা সমস্যায় জর্জরিত। তাদের অন্যতম সমস্যা হিসেবে স্যানিটেশনকে চিহ্নিত করি।’
তিনি বলেন, ওই সময় অবৈধ বোমা মেশিনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে পাম্প ও তেলের খালি ড্রামসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র জব্দ করা হতো। সাধারণত এসব জিনিস নষ্ট করা হয় বা নিলামে বিক্রি করা হয়, কিন্তু আমি ড্রামগুলো দিয়ে ভাসমান শৌচাগার নির্মাণের পরিকল্পনা করি। কারণ ড্রামগুলো খুবই মজবুত ও জলে ভেসে থেকেও পাঁচ-ছয় বছরে নষ্ট হয় না। ভাসমান শৌচাগার নির্মাণে তিন বা পাঁচটি ড্রাম ব্যবহার করা হয়। ড্রামের ভেতরে বর্জ্য জমে ভরাট হয়ে গেলে তা পরিষ্কারেও রয়েছে উদ্ভাবনী উপায়। প্রতিটি শৌচাগারই ভাসমান থাকায় তা পানির মধ্য দিয়ে ভাসিয়ে আনা যায় গ্রামের একটি নির্দিষ্ট অংশে, যেখানে পাম্পের সাহায্যে সব বর্জ্য নিয়ে জমা করা হয় স্থায়ী একটি সেফটি ট্যাংকে।
মোহাম্মদ তালুত বলেন, এসব শৌচাগার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যবহূত সব কয়টি উপকরণই উদ্ধার করা হয়েছে বোমা মেশিনবিরোধী অভিযান থেকে। ফলে প্রতিটি শৌচাগার নির্মাণে মাত্র কয়েকশ টাকা করে ব্যয় হয়েছে।
ঘাগটিয়া গ্রামের বাসিন্দা মকবুল বলেন, ভাসমান শৌচাগার স্বাস্থ্যসম্মত হওয়ায় হাওড়বাসীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে গ্রামের শতভাগ বাসিন্দাকে এ প্রকল্পের আওতায় আনা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার বলে মনে করেন তিনি।