নবীগঞ্জ প্রতিনিধি | ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৬
নবীগঞ্জের আলোচিত কিশোর অনুপ দাশের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃত ৫ আসামীদের মধ্যে মামলার প্রধান আসামী গোপাল দাশের ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন বিজ্ঞ আদালত।
বুধবার (৭ ডিসেম্বর) আসামীদের হবিগঞ্জ চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিসাত সুলতানার কোর্টে হাজির করার হলে বাদী পক্ষের আইনজীবী বারের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট জমশেদ মিয়া, সুলতান মাহমুদসহ ১০-১৫ জন আইনজীবী কিশোর অনুপের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মোটিভ উদঘাটনের জন্য গ্রেপ্তারকৃত ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট গোপাল দাশের ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর আর বাকী ৩ জনকে জেল গেইটে ৪ দিন জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ প্রদান করেন।
উল্লেখ্য, নবীগঞ্জ উপজেলার বড় ভাকৈর (পশ্চিম) ইউনিয়নের মৃত অন্তু দাশের কিশোর ছেলে অনুপ দাশ (১৪) ৩০ নভেম্বর রাতে হলিমপুর বাজারস্থ নিজ দোকান থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়। বাড়ির লোকজন বিভিন্নস্থানে তাকে খোঁজাখুঁজি করার সময় হলিমপুর গ্রামের ভূষণ দাশের দোকানের উত্তর-পূর্ব পাশের খালে কিশোর অনুপ দাশের সাথে থাকা ব্যবহৃত চাদর ও জুতা পান।
এ ব্যাপারে ১লা ডিসেম্বর নিখোঁজ কিশোরের মা উষা রানী দাশ নবীগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরী নং-৪৪ দায়ের করেন। উক্ত সাধারণ ডায়েরীর সূত্র ধরে অফিসার ইনচার্জ মো. আব্দুল বাতেন খানের তত্ত্বাবধানে এসআই মোবারক হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ তদন্ত শুরু করেন।
এক পর্যায়ে শনিবার (৩ ডিসেম্বর) বিকালে হলিমপুর গ্রামের সুখময় দাশের ছেলে গোপাল দাশ (৫০), হরমোহন দাশের ছেলে অধীর দাশ (৫৫), প্রল্লাদ দাশের ছেলে পিন্টু দাশ (৪২), ধীরেন্দ্র দাশের ছেলে প্রন্তা দাশ ও মানিক দাশের ছেলে মাদাই দাশ (৩৫) কে সন্দেহজনকভাবে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।
এ ব্যাপারে শনিবার নবীগঞ্জ থানায় ৩৬৪/৩৪ ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন অনুপ দাশের মা উষা রানী দাশ। উষা দাশ তার মামলায় উল্লেখ করেন, পিন্টু দাশ, প্রন্তা দাশ তাদের সাথে অজ্ঞাতনামা কয়েকজন নিয়ে প্রায়দিন টাকা না দিলে আমাকে ও আমার সন্তানদের আমার স্বামীর মত গুম করে হত্যা করার হুমকি দিত। নৃশংস হত্যাকান্ড নিহত অনুপ দাশের মা উষা রানী দাশ তাদের পরিবারের লোকজনের মধ্যে এখনও চলছে কান্নার রুল।
রবিবার আটককৃতদের কোর্ট থেকে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের তদন্তে সন্দেহের তীর যায় হলিমপুর গ্রামের ধনাই দাশের ছেলে দিপংকর দাশের দিকে। ফলে রোববার (৪ ডিসেম্বর) বিকালে ওসি আব্দুল বাতেন খানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে পুলিশ দিপংকর দাশকে (২৫) গ্রেপ্তার করে। পরে গ্রেপ্তারকৃত দিপংকর দাশের দেয়া তথ্যমতে পুলিশ জ্যোতিময় দাশের বাড়ির স্যানেটারী রিং টয়লেট থেকে নিখোঁজ কিশোর অনুপ দাশের দুর্গন্ধযুক্ত লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসা হয়।
ঘটনার খবর পেয়ে হবিগঞ্জ পুলিশ সুপার জয়দেব কুমার ভদ্র ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি স্থানীয় লোকদের সাথে কথা বলে ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস প্রদান করেন।
এদিকে গ্রেপ্তারকৃত দিপংকর দাশ থানায় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন। তাঁর দেয়া স্বীকারোক্তি তথ্য মতে ইতিপূর্বে গ্রেপ্তারকৃত গোপাল দাশ, দিপংকর দাশসহ ৩ জন মিলে ৩০ নভেম্বর রাতে কিশোর অনুপ দাশকে বাড়ি ফেরার পথে আটক করে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে। এক পর্যায়ে তারা পাশের বাড়ির জ্যোতিময় দাশের বাড়ির স্যানেটারী রিং টয়লেটের স্লাপ উঠিয়ে ভিতরে ফেলে দিয়ে পুনরায় স্লাপ লাগিয়ে দেয়। এ সময় দিপংকর দাশের ডান হাতের আঙ্গুল কেটে যায়। ঘটনার পর থেকেই দিপংকর দাশের চলাফেরা ও কথাবার্তা সন্দেহজনক ছিল বলে জানান স্থানীয়রা।
অনুপ দাশের পিতা অন্তু দাশ বিগত ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসে নি। ঘটনার দু’ দিন পর বাড়ির পশ্চিমে নদীর পাড়ে মৃত অবস্থায় অন্তু দাশকে পাওয়া যায়। দীর্ঘ দেড় বছর পর একই ভাবে নিখোঁজের ৪ দিন পর কিশোর ছেলে অনুপ দাশের মৃতদেহ উদ্ধার হলো।
আর্থিক লেনদেনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। ইতিপূর্বে আটককৃত প্রন্তা দাশ ও মাদাই দাশ পাওনা টাকা দাবি করে মৃত অনুপ দাশের প্রায় ৫ কেদার জমি দখলে নেন। এছাড়া ধৃত গোপাল দাশ দাবি করেন অনুপের পিতা মৃত অন্তু দাশের নিকট তিনি দেড় লক্ষ টাকা পায়। তার দাবীকৃত টাকা নিয়ে অনেক বাদানুবাদের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এ সব লেনদেনকে কেন্দ্র করেই ঘাতকদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে কিশোর অনুপ দাশকে।