জাহিদুল ইসলাম সবুজ | ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৬
মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনি চিকিৎসার অনুমোদন নিয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (আইসিইউ) চালু করেছে সিলেটের ছয়টি বেসরকারি হাসপাতাল। আইসিইউ ইউনিট চালু থাকলেও ওইসব হাসপাতালে নেই কোনো সার্বক্ষণিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
জানা গেছে, আইসিইউ চালুর জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে হাসপাতালগুলো। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অনুমোদন পাওয়ার আগেই ওইসব হাসপাতালে চালু করা হয়েছে আইসিইউ।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ থাকায় অনেক রোগী সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে বেঁচে উঠছেন। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এখনো পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ ইউনিট চালু না হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তারা জানান, বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ না থাকলে সংকটাপন্ন রোগীদের ঢাকায় নিয়ে যেতে হতো। কিন্তু এসব হাসপাতালে এ ইউনিট চালুর কারণে তারা সিলেটেই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হতে পারছেন।
জানা যায়, নগরীর নুরজাহান হাসপাতাল, রয়েল হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, আইডিয়াল কার্ডিয়াক হাসপাতাল, ইবনে সিনা হাসপাতাল, মাউন্ট এডোরা হাসপাতাল ও ওয়েসিস হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট রয়েছে। তবে সিলেট বিভাগীয় পরিচালকের কার্যালয় (স্বাস্থ্য) সূত্রে জানা যায়, ওই হাসপাতালগুলোর কেবল মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনি চিকিৎসা প্রদানের অনুমোদন রয়েছে।
আইসিইউ চালু করতে হলে সার্বক্ষণিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এসব হাসপাতালে নেই সার্বক্ষণিক কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। সরকারি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাই এসব হাসপাতালে খণ্ডকালীন সেবা প্রদান করেন। এছাড়া রোগীর প্রয়োজনে ডেকে পাঠানো হয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের। তবে আইসিইউতে থাকা রোগীদের জন্য নির্ভর করতে হয় এই খণ্ডকালীন চিকিৎসকদের ওপর।
বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক পরিচালনার জন্য দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিস (রেগুলেশন্স) ১৯৮২-তে উল্লেখ রয়েছে— ‘শুধু ক্লিনিক বা হাসপাতালের অনুমোদন নিয়ে কেউ আইসিইউ, এনআইসিইউ, সিসিইউ, মানসিক রোগ ও মাদকাসক্তি এবং ডেন্টাল রোগের চিকিৎসা দিতে পারবেন না’।
অভিযোগ রয়েছে, বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটগুলোকে সুযোগ করে দিতেই ১০ বছর আগে নির্মাণ কাজ শেষ হলেও এখনো চালু হচ্ছে না সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ ইউনিট। তিনবার তিনজন মন্ত্রী এ ইউনিটের উদ্বোধন করলেও আজ পর্যন্ত তা চালু হয়নি। অকেজো পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতি। এছাড়া অনেক সময় অপ্রয়োজনেও রোগীদের আইসিইউতে ভর্তি রাখার অভিযোগ পাওয়া যায় ওই বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে।
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগে দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসক ডা. সোহেল আহমদ বলেন, যখন কোনো রোগীর স্বাভাবিক সিস্টেমগুলো একদমই কাজ করে না, যখন তাকে ইন্সট্রুমেন্টাল সাপোর্ট দেয়ার প্রয়োজন হয়, তখনই কেবল তাকে আইসিইউতে নিতে হয়। যেমন— যদি কারো রক্তচাপ অনেক কমে যায়, তখন তাকে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ে রেখে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য ওষুধ দিতে হয় কিংবা শরীরের দুই বা ততোধিক অঙ্গ কাজ না করলে যদি তার প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে তখন তাকে আইসিইউতে নিতে হয়। আর সেটা হতে হবে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে ও তত্ত্বাবধানে।
আইসিইউ সেবা দেয়া সিলেটের ছয় বেসরকারি হাসপাতালে চার্জের ক্ষেত্রেও রয়েছে ব্যাপক তারতম্য। একজন রোগীকে একদিন আইসিইউতে রাখতে হাসপাতাল-ভেদে খরচ পড়ে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হবে ওষুধ ও চিকিৎসকের বিল। সঙ্গে আছে ভ্যাট, ট্যাক্স ও সার্ভিস চার্জ। এছাড়া রোগীর লাইফ সাপোর্টের প্রয়োজন হলে এ খরচ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।
নগরীর বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ চালু প্রসঙ্গে সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, আইসিইউ, সিসিইউ বা এইচডিইউ চালু করতে হলে নিয়মানুযায়ী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আবেদন করতে হয় এবং অনুমোদন প্রাপ্তিসাপেক্ষেই এ সেবা চালু করতে হয়। কিন্তু এই নিয়ম অনেকেই মানেন না, তারা আবেদনপত্র জমা দিয়েই সংশ্লিষ্ট সেবা চালু করে দেন। সিলেটের বেসরকারি কয়েকটি হাসপাতাল আবেদন করলেও তারা এখনো অনুমোদন পায়নি বলে জানান তিনি।
তিনি আরো জানান, আইসিইউ বা সিসিইউ চালানোর জন্য সার্বক্ষণিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, প্রশিক্ষিত নার্স ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকতে হয়— যা বেশিরভাগ ক্লিনিকের পক্ষে মানা হয় না।
এ ব্যাপারে সিলেট বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. গৌরমনি সিনহা বলেন, অনেকেরই আইসিইউ চালুর অনুমোদন নেই। কেউ কেউ আবেদন করেছেন বলে শুনেছি। তবে কাদের অনুমোদন আছে, কাদের নেই এ তথ্য আমার কাছে নেই। আমি খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করছি। এরপর অনুমোদনহীনদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
অনুমোদন ছাড়াই আইসিইউ সেবা প্রদান প্রসঙ্গে নগরীর দরগাহ গেইট এলাকার নুরজাহান হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. নাসিম আহমদ বলেন, বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ না থাকলে অনেক রোগী মারা যেত। দীর্ঘ ১০ বছরেও ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট চালু করা যায়নি। আমরা সে অভাব পূরণ করেছি।
তিনি বলেন, আইসিইউ চালুর ব্যাপারে আবেদন করা আছে। মৌখিক অনুমোদনও আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আমাদের আইসিইউ ব্যবস্থাপনা দেখে সন্তুষ্টও হয়েছেন।