Sylhet Today 24 PRINT

‘আমার মেয়ের এ অবস্থা যে করছে, তার বিচার চাই’

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ২২ ডিসেম্বর, ২০১৬

ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডের ১৭ নং বেডে শুয়ে কিছু বলতে চাচ্ছিলেন সুমা বেগম, কিন্তু মুখ দিয়ে বের হচ্ছিলো কিছু অর্থহীন শব্দ আর শুণ্য দৃষ্টিতে একরাশ অভিমান ও অব্যক্ত বেদনা।

যৌতুকের জন্য স্বামীর হাতে তিনি হারিয়েছেন তার জিহবা, নির্মম নির্যাতনের সময় কেটে দেয়া হয়েছে তার বাঁ পায়ের শিরা, বুকেও রয়েছে ধারালো অস্ত্রের গভীর আঘাত।

আজ বৃহস্পতিবার (২১ ডিসেম্বর) এ নির্মম নির্যাতনের এক সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পরও এখনো গ্রেপ্তার হয়নি নির্যাতনকারী স্বামী বেলাল আহমদ। মামলায় অন্তর্ভুক্ত বেলালের অপর দুই ভাইও এখন পর্যন্ত পলাতক।

এদিকে সুমার পরিবারের সদস্যরা ভুগছেন নিরাপত্তাহীনতায়। পরিবারের অন্য কোন সদস্যের উপর যে কোন মুহূর্তে হামলা হতে পারে বলে রয়েছেন দুশ্চিন্তায়।

ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মেয়ের শয্যাপাশে বসে মা আইমুনা সিলেটটুডে টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা আমাদের উপর হামলার আশঙ্কা করছি। বিশেষ করে আমার একমাত্র ছেলে সিএনজি অটোরিকশা চালায়, এখানে সেখানে যায়, তার উপর যে কোন স্থানেই তো হামলা হতে পারে”। একই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সুমার ভাই হাফিজুর রহমানও।

পরিবারের দাবি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে যেনো বেলালকে গ্রেপ্তার করে ন্যায়বিচার করা হয়।

আইমুনা বলেন, “আমি আর কিছু চাইনা, আমার মেয়ের এ অবস্থা যে করছে, আমি তার বিচার বিচার চাই”।

সুমার উপর হামলার ঘটনায় বুধবার রাত পর্যন্ত গ্রেপ্তার রয়েছেন বেলালের মা জয়বুন্নেছা, মামাতো ভাই ফয়েজ মিয়া ও ভাগনে রেদওয়ান আহমেদ। গত শনিবার (১৭ ডিসেম্বর) সকালে ও রাতে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গত বৃহস্পতিবার (১৫ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় যৌতুকের জন্য সুমা বেগমের জিহ্বা ও পায়ের শিরা কেটে দিয়েছে তার স্বামী বেলাল ও তার দুই সহযোগী।

সুমা বেগম (২৬), সিলেট সদর উপজেলার পূর্ব দর্শা গ্রামের মৃত আব্দুল আলীর মেয়ে। গুরুতর আহত অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাতেই তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের চতুর্থ তলার ৬নং মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে চলছে তার চিকিৎসা।

তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সুমা সবার ছোট। ছোটবেলায় তার বাবা আব্দুল আলীর মৃত্যুর পর তার মা আইমুনা মানুষের বাড়িতে বাড়িতে কাজ করেই বড় করেন তাদের ভাইবোনদের। বর্তমানে এ পরিবারটি চলছে ভাই হাফিজুর রহমানের সিএনজি চালানোর উপার্জন দিয়ে।

সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার খানুয়া গ্রামের মৃত ইসমত আলীর ছেলে ও নগরীর সোবহানীঘাটের একটি মোটরগাড়ি ওয়ার্কশপের অংশীদারি মালিক বেলাল আহমদের সাথে সুমার বিয়ে হয় ২০০৮ সালে। স্বামীর সংসার তার ভাগ্যে জোটে পাঁচ বছর পর ২০১৩ সালে। সিলেট শহরে ভাড়া করা একটি বাসায় তাকে নিয়ে সংসার শুরু করলেও মাত্র চার মাসের সে সংসার থেকে সুমাকে ফিরে যেতে মায়ের কাছে। এদিকে সুমা বেগমের অনুমতি ছাড়াই মায়ের পরামর্শে ২০১১ সালে আরেকটি বিয়ে করেন বেলাল।

সংসার জীবনের শুরুতে যৌতুকের জন্য তেমন কোন চাপ না দিলেও কয়েক বছর পর শুরু হয় যৌতুকের জন্য নির্যাতন। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বিভিন্ন এনজিও থেকে ৩ লাখ টাকা তোলে বেলালকে দেন সুমা, সে টাকার কিস্তি প্রথম চার মাস দেন বেলাল, তবে তার পর থেকে কিস্তির টাকা দিচ্ছেন সুমার মা ও ভাই।

গত বছরখানেক ধরেই আরো দুই লক্ষ টাকার জন্য সুমার উপর চাপ সৃষ্টি করে বেলাল, তবে তা দিতে অস্বীকৃতি জানায় সুমা।
সুমার মা আইমুনা জানান, বেলাল প্রায়ই তার স্ত্রী সুমার সাথে দেখা করতে তাদের বাড়িতে যেত। গত বৃহস্পতিবার (১৫ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে সেভাবেই সুমার সাথে দেখা করতে আসে বেলাল এবং তার সাথে কথা বলতে বাসা থেকে বের হয় সুমা।

তিনি জানান, সুমাকে নিয়ে বাড়ির বাইরে জ্বালানি কাঠ রাখার ঘরে নিয়ে তার হাত ও পা বেঁধে ফেলে বেলাল ও তার সহযোগীরা। পরে ধারালো কোন অস্ত্র দিয়ে তার জিহ্বা ও পায়ের শিরা কেটে ফেলে, শরীরের বিভিন্ন জায়গায়ও আঘাত করে। কিছুক্ষণ পর সুমার খোঁজে তিনি বের হলে, তাকে দেখে বাড়ির পিছনের সীমানা দিয়ে পালিয়ে যায় বেলাল ও তার সহযোগীরা। গুরুতর আহত অবস্থায় পরে সুমাকে নিয়ে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এদিকে স্থানীয় একটি দোকান থেকে বেলাল ও তার সহযোগীদের ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল পরিত্যাক্ত অবস্থায় জব্দ করে পুলিশ। এছাড়াও বাড়ির পিছনের অংশ থেকে আরো কিছু আলামত সংগ্রহ করে পুলিশ।

সুমার শারিরীক অবস্থার ব্যাপারে জানতে চাইলে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারি রেজিস্ট্রার আতিকুল গণি জানান, সুমার শারিরীক অবস্থার এখন অনেকটা উন্নতি হয়েছে, হয়তো আরো এক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হতে পারে।

তিনি বলেন, ”সুমা বেগমের জিহ্বা ও বাঁ পায়ের শিরা কাটা গেছে, এছাড়াও তার বুকে একটি গভীর ক্ষত রয়েছে, যার কারণে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে দীর্ঘ সময় লাগবে। এছাড়াও জিহ্বা কাটার কারণে সে তার স্বাভাবিক বাকশক্তি হারাবে”।
এ ঘটনার পরদিন শুক্রবার (১৬ ডিসেম্বর) বেলাল, তার মা জয়বুন্নেছা, ভাই কামাল মিয়া ও হেলাল মিয়া এবং অজ্ঞাত আরো দুইজনের নামে সিলেটের জালালাবাদ থানায় মামলা দায়ের করেন সুমার ভাই হাফিজুর রহমান।

জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আক্তার হোসেন জানান, মামলার পরদিন (শনিবার ১৬ ডিসেম্বর) সকালে বেলালের গ্রামের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বেলালের মা জয়বুন্নেছাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই রাতে গ্রেপ্তার করা হয় বেলালের মামাতো ভাই ফয়েজ মিয়া ও ভাগনে রেদওয়ান আহমেদকে।

তিনি বলেন, “গ্রেপ্তারের পর তাদেরকে আদালতের মাধ্যমে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে গত মঙ্গলবার আদালত হাফিজ মিয়ার একদিনের রিমান্ড ও কারাফটকে রিদওয়ানের জবানবন্দী গ্রহণের অনুমতি প্রদান করেন”।

এ ঘটনার পর থেকে মূল আসামী বেলাল ও তার দুই ভাই পলাতক রয়েছে বলে জানিয়ে ওসি আক্তার বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে বেলালের ছবি জোগাড় করে তা বিভিন্ন থানায় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছি। আশা করছি দ্রুতই বেলালকে গ্রেপ্তার করা যাবে। এছাড়াও পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টিও তারা দেখছেন বলে জানান”।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.