Sylhet Today 24 PRINT

একের পর এক প্রকল্প, তবু উদ্ধার হয় না নগরীর ছড়া-খাল

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

সিলেট নগরীর সোবহানীঘাটে ছড়া দখল করে গড়ে ওঠেছে বহুতল ভবন। (ফাইল ছবি)

সিলেট নগরীর অন্যতম সমস্যা নগরীর ভেতর দিয়ে প্রবাহনমান ছড়া-খাল দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়া। এরফলে বাধাগ্রস্ত হয় নগরীর পানি নিষ্কাষণ, দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। এ থেকে উত্তদরণে ২০০৯ সালে নগরীর ছড়াগুলো উদ্ধারে ১১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করে সিলেট সিটি করপোরেশন।

এরপর ২০১৩ সালে একই লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয় ২০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প। কেনা হয় আধুনিক যন্ত্রপাতি।

সর্বেশষ গত ২২ ডিসেম্বর একনেকের সভায় সিলেট নগরীর ছড়া উদ্ধারে ২৩৬ কোটি ৪০ লাখ টাকার আরেকটি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী জানুয়ারিতে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)।

ছড়া-খাল রক্ষায় এবার মেঘা প্রকল্প নেওয়া হলেও আগের দুই প্রকল্পের যথাযথ বাস্তবায়ন নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। ছড়া উদ্ধারে দুটি প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পরও নগরবাসী তেমন সুবিধা পায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হলেও ছড়া-খালগুলো এখনো রয়ে গেছে প্রভাবশালীদের দখলে।

তবে নতুন প্রকল্পে ছড়া-খাল উদ্ধার করে রক্ষার উদ্যোগ নেওয়ার আশা নগরবাসীর। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের স্বচ্ছতা নিশ্চিতেরও তাগিদ দিয়েছেন তারা।

এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ছড়া খাল উদ্ধারে আগে একাধিক প্রকল্প নেওয়া হলেও নগরবাসী তার খুব একটা সুফল মিলেনি। প্রকল্পের বাস্তাবায়ন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব প্রকল্পের ব্যাপারে সিটি করপোরেশনও তার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেনি। প্রকল্পের অধীনে কি কি কাজ হয়েছে, কতটুকু হয়েছে তা জনগনকে জানানো হয়নি।

এবার যেহেতু একটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, তাই আশা করছি জনগন এবার সুবিধাভোগী হবে এবং সিটি করপোরেশন স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন, সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম মনে করেন, আগের প্রকল্পগুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছড়া থেকে আবর্জনা উদ্ধার ছাড়া তেমন কোনো কাজ হয়নি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছড়া উদ্ধার করে দেয়াল নির্মান করা হলেও এই দখলদের সবাই-ই ছিলো দরিদ্র শ্রেণীর লোক। একজন প্রভাবশালীর দখল থেকেও ছড়া পুণরুদ্ধার করা যায়নি।

প্রভাবশালীদের কাছ থেকে উদ্ধার করা না গেলে ও ছড়ায় আবর্জনা না ফেলতে নগরবাসীকে সচেতন করতে না পারলে একের পর এক প্রকল্প নিয়েও কোনো লাভ হবে না বলে মনে করনে তিনি।

তবে সিসিক সূত্রে জানায়, নগরীর ভেতর দিয়ে প্রবাহমান ৭৩ কিলোমিটারের ছড়ার মধ্যে আগের দুটি প্রকল্পে প্রায় ১২ কিলোমিটার উদ্ধার করে রিটেইনিং ওয়াল নির্মান করা হয়েছে। তবে বাকী ছড়া এখনো থেকে গেছে বেদখল।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীব বলেন, এবারের আগে কখনো এরকম সমন্বিত কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি। ফলে দেখা দেখা গেছে একদিকে ছড়া উদ্ধার করা হয়েছে কিন্তু কিছুদিন পরই আবার দখল হয়ে গেছে। কিংবা ছড়া উদ্ধার করতে গেলে প্রভাবশালী দখলদাররা উচ্চ আদালতে মামলা করে দিয়েছে। ফলে থেমে গেছে কার্যক্রম।

এবার ছড়া উদ্ধারের পর ছড়ার দুই পাশে রিটেনিং ওয়াল ও ওয়াকওয়ে নির্মান করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, এরফলে পুণরায় আর কেউ দখল করতে পারবে না।

আগের প্রকল্পগুলো যথাযথ কাজ না হওয়ার অভিযোগের সাথে ভিন্নমত পোষণ করে তিনি বলেন, আগের প্রকল্পগুলোতে কাজ হয়েছিলো বলেই নগরবাসীকে গত বর্ষায় তেমন দূর্ভোগ পোহাতে হয়নি।

২২ ডিসেম্বর একনেকে পাশ হওয়া প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, আগামী জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর ধরা হয়েছে। প্রকল্পের অধিনে নগরীর ছড়া-খাল উদ্ধার, রিটেইনিং ওয়াল ও ওয়াকওয়ে নির্মান এবং সৌন্দর্যবর্ধন করা হবে।

এই প্রকল্পে সরকার ২০০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় করবে। প্রকল্পের আওতায় সিলেটের ১৩টি ছড়ার ২৬.৯৬ কিলোমিটার আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করা হবে। এছাড়া ৫ কিলোমিটার ইউটাইপ ড্রেন, সাড়ে তিন কিলোমিটার ওয়াকওয়ে, ১০ কিলোমিটার ছড়া ও খাল খনন করা হবে। এছাড়াও এই প্রকল্পের আওতায় ৯টি আধুনিক যন্ত্র ক্রয় করা হবে যার মধ্যে রয়েছে এমপিএসআইব্আিই এস্কাভেটর, উভচর এই এস্কাভেটর দিয়ে নদী খননও করা যাবে। প্রকল্পের আওতাভুক্ত ছড়া ও খালগুলো হচ্ছে মালনীছড়া, গোয়ালীছড়া, গাভীয়ার খাল, মুগনীছড়া, কালীবাড়ী ছড়া, হলদিছড়া, যুগনীছড়া, ধোপাছড়া, বুবিছড়া, বাবুছড়া, রত্নার খাল, জৈন্তার খাল ও বসুর খাল।
 
সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) নুর আজিজুর রহমান জানান, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ার পর নবরূপ পাবে সিলেটের ছড়া ও খাল। তিনি জানান, এই প্রকল্পের আওতায় হলদিছড়ার আংশিক অংশে ড্রেন ও রিটেইনিং ওয়ালের পাশাপাশি ফুটওভারব্রিজ করে সেখানে হাতিরঝিলের মতো একটি আবহ ফুটিয়ে তোলার কাজও করবে সিলেট সিটি কর্পোরেশন।

এই সংক্রান্ত নকশাও প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানান নুর আজিজুর রহমান।

জানা যায়, সিলেট নগরীর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গেছে ছোট বড় প্রায় ২৫ টি প্রাকৃতিক খাল। যা ছড়া নামে পরিচিত। পাহার বা টিলার পাদদেশ থেকে উৎপত্তি হয়ে ছড়াগুলো গিয়ে মিশেছে সুরমা নদীতে। এই ছড়াগুলো থেকেই পাওয়া যেতো নগরবাসীর ব্যবহার যোগ্য পানি। পানি নিষ্কাশনেরও আঁধার ছিলো এই ছড়াগুলো। এক সময় এসব ছড়া দিয়ে বড় বড় নৌকাও চলাচল করত। তবে এখন অনেক স্থানে এসব ছড়ার অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.