Sylhet Today 24 PRINT

হুমকির মুখে ‘সাদা সোনা’ খ্যাত রাবার শিল্প

হতাশায় বাগান মালিকরা

এস আলম সুমন, কুলাউড়া |  ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

স্বাধীনতা পরবর্তী আশির দশকে ‘সাদা সোনা’ নামে পরিচিত রাবার শিল্প আজ ধ্বংসের প্রায় দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। ওই সময় থেকে রাবারের চাহিদা ও যোগানের সমতা, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা, উদ্যোক্তাদের আগ্রহ রাবার চাষ প্রকল্প বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। দেশের প্রায় ৭০ হাজার একর ভূমির উপর গড়ে উঠেছিলো সরকারি বেসরকারি অসংখ্য রাবার বাগান। ১৯৮০ সালের দিকে বিদেশ থেকে রাবার আমদানির বিকল্প হিসেবে রাবার উৎপাদনে ব্যাপক উৎসাহ দেয়া হয়।

এখন প্রায় অর্ধশতাব্দীর মাথায় এসে আবার এই দেশের সরকার ও উদ্যোক্তা রাবারকে আমদানীনির্ভর করায় রাবার বাগান মালিকরা চরম হতাশায় ভুগছেন। আর গত ৫ বছর লাগাতার দরপতনে এই হতাশা রূপ নিয়েছে প্রকট আকারে।

কেউ বাগানের গাছ কেটে ফেলেছেন, কেউবা বাগান বন্ধ রাখছেন। রাবার কাঁচামাল কৃষি পণ্য হওয়া সত্ত্বেও শিল্প পণ্য হিসেবে দেশের বাজারে ভ্যাট দিতে হচ্ছে ১৫ শতাংশ। অথচ রাবার কাঁচামাল বাজার উপযোগী করতে প্রতি কেজিতে খরচ হয় বর্তমান বিক্রি মূল্য থেকে প্রায় ৯০ টাকা বেশি।

রাবার সংগ্রহের উৎকৃষ্ট সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম হওয়ার কারণে এই সময়ে দেশের বাগান মালিকরা রাবার সংগ্রহ করতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। আমদানিকৃত রাবারের তুলনায় দেশীয় রাবারের উপর কর ভার বেশি হওয়ায় অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে দেশীয় উৎপাদিত রাবার। আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতন এবং দেশীয় রাবারের উপর কর ভার বেশি হওয়ায় উদ্যোক্তারা বিদেশি রাবার ক্রয় করছেন। সরকারের অবহেলা এবং উদ্যোক্তাদের দেশীয় বাজারের প্রতি উদাসীনতায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে মোট সরকারি রাবার বাগান ১৮টি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জোনে ৯টি, টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ জোনে ৫টি, সিলেট জোনে ৪টি বাগান রয়েছে। এছাড়াও সারা দেশে বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন অসংখ্য রাবার বাগান রয়েছে। দেশে রাবারের চাহিদা ৩০ হাজার টন। তন্মধ্যে বেশিরভাগ (১৬-২০ হাজার টন) দেশে উৎপাদিত হচ্ছে। বর্তমান দেশে যে পরিমাণ রাবার উৎপাদন হয় তা দিয়ে দেশের চাহিদার প্রায় ৭০ ভাগ মেটানো সম্ভব হলেও বিদেশ থেকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রাবার আমদানি করা হচ্ছে। রাবার আমদানি নামমাত্র শুল্ক হওয়ার কারণে দেশের বাজার দরের চেয়ে কম দামে ভিয়েতনাম থেকে রাবার আমদানি করা হচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে দেশের সব বেসরকারি রাবার বাগানগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।

জানা যায়, মুক্তবাজারের ফলে বিদেশি রাবারে বাজার সয়লাব। রাবার আমদানিতে নামমাত্র শুল্ক বসানো এবং দেশীয় রাবার বিক্রিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং রাবারের উৎপাদন খরচ বেশি, বিক্রির দাম কম এমন নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত দেশের রাবার শিল্প। এমতাবস্থায় দেশের সরকারি ১৮টি রাবার বাগান বড় অঙ্কের লোকসান দিয়ে টিকে থাকতে পারলেও ব্যক্তি বাগান মালিকরা হতাশায় নিরুপায় হয়ে বাগান বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন রাবার বাগান মালিকরা। কেউ কেউ বাগানের গাছ কেটে বিকল্প চিন্তা করছেন। ফলে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ব্যক্তিমালিকানাধীন রাবার বাগান। আর এতে লোকসানের মুখে পড়ছে দেশের অর্থনীতির চাকা।

বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো-এর তথ্যমতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরের (জুলাই-নভেম্বর) এর লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ১১.২০ শতাংশ, অর্জিত হয়েছে ৭.২৬ শতাংশ। এ সময়ের অর্জিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৩৫.১৭ শতাংশ কম। যা বিগত বছরের রপ্তানির তুলনায় ১৯.২৪ শতাংশ কম। এ বিষয়ে বাংলাদেশ রাবার উন্নয়ন কর্পোরেশনের মহা-ব্যবস্থাপক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের স্টক অনেক, রাবারও ভালো কিন্তু বিক্রি নেই। মুক্তবাজার হওয়ার ফলে বাংলাদেশে রাবারের মূল্য নিচে নেমেছে। পাশাপাশি ভ্যাট বসানোয় এর প্রভাব পড়েছে রাবার বিক্রির উপর।

বেসরকারি রাবার মালিকরা জানান, ২০১০-১২ সালে রাবারের দাম ছিলো কেজি প্রতি ২৮০-৩২০ টাকা, ২০১৩-২০১৪ সালে দরপতনে ১২০-১৩০ টাকা হয়। বর্তমানে প্রতি কেজি রাবারের দাম ৭০-৯০ টাকা। অথচ দেশের বাগানগুলোয় রাবার উৎপাদনের পর তা প্রক্রিয়াজাত করে বাজারে বিক্রির উপযোগী করতে খরচ হয় প্রায় ১৬০ টাকা। এতে মুনাফা তো দূরের কথা বাগান শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন দেয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এই লোকসান চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

রাবার বাগানের গাছ কেটে ফেলা বেসরকারি মুরইছড়া চা বাগান ও ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগানের মালিক মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ার আব্দুল মতলিব, আব্দুল লতিফ, মো. আবু হানিফ ও বড়লেখার দক্ষিণভাগের ঈমান উদ্দিন জানান, দীর্ঘ ৫ বছর ভর্তুকি দিয়ে বাগান চালু রেখেছিলাম, মনে হয়েছিলো দাম হয়তো পুনরায় বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ক্রমান্বয়ে দরপতনে আমরা মারাত্মকভাবে আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এক পর্যায়ে বিভিন্ন ঋণ শোধ করতে গিয়ে আমাদের গাছ কাটতে হয়েছে।

এছাড়াও বাগান বন্ধ রেখেছেন এমন বাগান মালিক বজলুল করিম চৌধুরী আমিন, মো. আব্দুস সহিদ, রোশন আহমদ, কামাল আহমদ ও জাহাঙ্গির কবির আলাল জানান, রাবারের কাঁচামালের বিক্রয়মূল্য থেকে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় বাগান চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিয়ে মুনাফা তো দূরের কথা কর্মচারীর বেতন দেয়া সম্ভব হয় না। তাই বাগান বন্ধ রাখতে হচ্ছে। আগে যেখানে প্রতি কেজি রাবার বিক্রি হতো ৩০০ টাকায় আজ ২ বছর যাবত বিক্রি করতে হচ্ছে ৭০ টাকায়।

এ বিষয়ে সিলেট জোনের অধীনস্থ ভাটেরা সরকারি রাবার বাগানের ব্যবস্থাপক মকবুল হোসেন জানান, সিলেট জোনের ৪টি সরকারি বাগানই পুরাতন। এসব রাবার বাগানে উৎপাদন ভালো কিন্তু বিক্রয়মূল্য কম হওয়াতে লোকসানের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.