সিলেটটুডে ডেস্ক | ২০ জানুয়ারী, ২০১৭
পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান জেআইসি স্যুট লিমিটেড। প্রায় চার বছর আগে সিলেটের আউশকান্দি এলাকায় কারখানা গড়ে তোলে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু শুরুতেই দেখা দেয় দক্ষ শ্রমিকের অভাব। সংকট মেটাতে পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে শ্রমিক নিয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। আবার উচ্চ কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর প্রয়োজন মেটাতে ঢাকা থেকে নিয়ে যাওয়া হয় শ্রমিক।
জেআইসি স্যুট লিমিটেডের পাশেই রয়েছে স্টার সিরামিকের একটি কারখানা। এ কারখানাকেও শুরুতে শ্রমিক সংকটে পড়তে হয়েছে। শ্রমিকের প্রশিক্ষণ ও আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করেই সংকট মেটাতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জেআইসি ও স্টার সিরামিকের মতো অনেক কারখানা গড়ে উঠছে বর্তমানে। শিল্পায়ন ছড়িয়ে পড়ছে দেশের অনেক জেলায়। এক্ষেত্রে কমবেশি সব জায়গায়ই জমি, গ্যাস ও বিদ্যুত্ সমস্যার পাশাপাশি শ্রমিক সংকটেও পড়ছে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে শ্রমিক নিয়োগের বিষয়েও ভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
তবে শ্রমিক সংকটের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি সিলেট অঞ্চলে। জানতে চাইলে সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সালাহ উদ্দিন আলী আহমেদ বলেন, গত কয়েক বছরে সিলেট অঞ্চলে বিনিয়োগপ্রবণতা অনেক বেড়েছে। এর মূল কারণ গ্যাসের সহজলভ্যতা। তবে শ্রমিকের জোগান নিশ্চিত করতে উদ্যোক্তাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষ শ্রমিকের জোগান নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। কেউ প্রশিক্ষণ দিয়ে শ্রমিক তৈরি করে নিচ্ছেন আবার কেউ আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করে ঢাকা থেকে কর্মী নিয়ে আসছেন।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কারখানা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের শুরুতেই ওই এলাকার আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিতে হয়। আর সে অনুযায়ী পরিকল্পিতভাবে কারখানা স্থাপন করতে হয়। বাংলাদেশে যেসব উদ্যোক্তা শ্রমিক সংকট মোকাবেলা করছেন, তারা বিষয়টি সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত ছিলেন। তার পরও অনেককে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে। আবার উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। তুলনামূলক বেশি সক্ষমতা রয়েছে, এমন প্রতিষ্ঠানকে শ্রমিক সংকট মোকাবেলায় খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না।
সিলেটে স্থাপিত স্কয়ার গ্রুপের কারখানা স্কয়ার ডেনিমস লিমিটেড। কারখানাটিতে কর্মী সংখ্যা এক হাজারের কিছু কম। কারখানাটি স্থাপনের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। তখনই শ্রমিকদের জন্য আবাসন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি নিশ্চিত হয় কর্তৃপক্ষ। ফলে পরিকল্পনা অনুযায়ী কারখানার পাশাপাশি শ্রমিকের আবাসনের ব্যবস্থাও করে প্রতিষ্ঠানটি।
এ বিষয়ে স্কয়ার ডেনিমস লিমিডেটের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান ইফতেখার শোয়াইব বলেন, আমরা কারখানা স্থাপনের আগেই সম্ভাব্যতা যাচাই করেছি। আর সে অনুযায়ী আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও আগে থেকে ছিল। তাই বড় ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়নি আমাদের। তার পরও সমস্যা থাকে। দক্ষতার সঙ্গে সেগুলো মোকাবেলা করছি আমরা।
শুধু সিলেট নয়, বরিশাল ও চট্টগ্রামেও শ্রমিক সংকটের বিষয়টি মোকাবেলা করতে হয়েছে মালিকদের। নোয়াখালীতে সানম্যান গ্রুপের কারখানা স্থাপনের পর নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থায় শ্রমিকদের কারখানায় নিয়ে যেতে হতো। তবে এখন সেসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। কারখানাটিতে এখন প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক কাজ করেন।
বরিশালে খান সন্স গ্রুপের সোনারগাঁও টেক্সটাইলকেও দক্ষ জনশক্তির সংকট মোকাবেলা করতে হয়েছিল। ঢাকা থেকে নিয়োগ দেয়া কারিগরি কর্মকর্তাদের নিজস্ব আবাসন সুবিধা দিয়ে সংকট সামাল দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, আমাদের দেশে প্রশিক্ষিত শ্রমিকের খুব অভাব আছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণের অনেক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলো যথেষ্ট নয়। বর্তমানে শিল্পায়ন ছড়িয়ে পড়ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। কিন্তু শ্রমিক সংকটের বিষয়টি এখনো আমাদের জন্য গ্রে এরিয়া। তবে উদ্যোক্তারা অনেক উদ্যমী। উদ্যমের কারণে সংকট মোকাবেলা করতে পারছেন তারা। তবে পোশাক খাতের ক্ষেত্রে অনেক সময় শ্রমিকরা বিদ্যমান স্থান থেকে অন্যত্র যেতে চাইছেন না।
গত কয়েক বছরে বিদ্যমান স্থান থেকে নতুন স্থানে কারখানা স্থানান্তর হয়েছে এমন কারখানার মধ্যে আছে— ডরিন, হা-মীম, চট্টগ্রামের নিউটেক, টিউনিক, সফটেক্স, প্রীতি, স্পেস, আউটওয়্যার, আউটরাইট, চন্দনা, আল্টিমেট, ফোর উইং, ন্যাচারাল উলওয়্যার, নোভা ও ওয়েলটেক্স। এর মধ্যে কিছু কারখানা নিজস্ব উত্পাদনক্ষেত্রের সামর্থ্য বাড়িয়েছে। আবার কিছু কারখানা একেবারে নতুন স্থানে স্থানান্তর হয়েছে।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ড. ওয়াজেদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে শিল্পায়ন পরিকল্পিত নয়। পোশাক খাত বেশ বড় শিল্প খাত হলেও এটা কেবলই পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে শুরু করেছে। পরিকল্পনার অভাবেই দেশের বড় এ খাতে কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে বেশি কারখানা গড়ে উঠেছে। আর এসব কারখানায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শ্রমিকরা এসে কাজে যোগ দিয়েছেন। শ্রমিকরা যদি নিজস্ব অঞ্চলে কারখানা পেতেন, তাহলে সেখানেই কাজে যোগ দিতেন। সুষম শিল্পায়ন হলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কারখানা চালু করতে মালিকদের খুব বেশি বেগ পেতে হতো না।
আশির দশকে মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামে কেন্দ্রীভূত ছিল পোশাক শিল্প। কিন্তু পরবর্তীতে ঢাকাসহ চারটি জেলায় বাড়তে থাকে এ শিল্প। বর্তমানে দেশের মোট পোশাক কারখানার ৯৮ শতাংশই গড়ে উঠেছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জকে ঘিরে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) হিসাবে, দেশের ১৩টি জেলায় মোট পোশাক কারখানা রয়েছে ৪ হাজার ৬০টি। এর সিংহভাগই ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে। এ চার জেলায় কারখানা রয়েছে ৩ হাজার ৯৩৩টি। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী এ প্রসঙ্গে বলেন, শুধু পোশাক নয়, যেকোনো শিল্পে আঞ্চলিক ঘনত্ব একপর্যায়ে বৈষম্যমূলক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। শুরুর দিকটায় যোগাযোগ ব্যবস্থা, জ্বালানিসহ বিভিন্ন সুবিধার সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করেন। কিন্তু পরিকল্পিত না হওয়ায় একপর্যায়ে এ ঘনত্ব বেড়ে গিয়ে বৈষম্যও বাড়ায়। আবার নতুন কোনো স্থানে শিল্পকে টেকসই করাটাও সময়সাপেক্ষ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে এলাকাভিত্তিক সুষম শিল্পোন্নয়ন পরিকল্পনা জরুরি, যার জন্য প্রয়োজন সরকারের দীর্ঘমেয়াদি সঠিক নীতি।
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কাউন্সিলের (এনএসডিসি) গবেষণা বলছে, দারিদ্র্যপ্রবণ অঞ্চলের মানুষই শ্রমঘন খাতের শ্রমিক হচ্ছেন বেশি। মূলত এসব এলাকার ভূমিহীনরাই এ খাতে শ্রমিক হিসেবে নিজেদের রূপান্তর করছেন। রংপুর, বরিশাল, রাজশাহী বিভাগেই এমন শ্রমিক বেশি। গবেষণার আওতাভুক্ত কারখানার দেড় হাজার শ্রমিকের ৩২ দশমিক ৯৮ শতাংশেরই মূল অঞ্চল ঢাকা। এছাড়া রংপুর ২১ দশমিক ৫৪, বরিশাল ১৫ দশমিক ৫৪, চট্টগ্রাম ১১ দশমিক ১৫, রাজশাহী ১০ দশমিক ৪৯, খুলনা ৭ দশমিক শূন্য ৫ ও সিলেট ১ দশমিক ২৪ শতাংশ শ্রমিকের মূল অঞ্চল।
শ্রমিক প্রতিনিধিদের মতে, রংপুর ও বরিশালে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি। আবার সিলেট জেলায় দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে কম। সামগ্রিকভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, আবার সিলেটে এ হার সবচেয়ে কম। এ কারণেই সিলেটে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে শ্রমিক সংকট বড় সমস্যায় রূপ নিচ্ছে।
সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, মূলত নগরকেন্দ্রিক মালিকদের স্থাপিত শিল্প-কারখানায় শ্রমিকরা কখনই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার আওতায় পড়েননি। আর এখন বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্প ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে শ্রমিক সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে।
সূত্র : বণিক বার্তা