নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শাহ আরেফিন টিলা থেকে পাথর উত্তোলনকালে টিলা ধ্বসে শ্রমিক নিহতের ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন সিলেটের অতিরিক্ত জেলা হাকিম (এডিএম) আবু সাফায়াৎ মুহম্মদ শাহেদুল ইসলাম।
শুক্রবার রাত সাড়ে আটটায় সিলেটের জেলা প্রশাসক জয়নাল আবেদীনের কাছে এ প্রতিবেদন জমা দেন তিনি ।
শাহ আরেফিন টিলা কেটে অবৈধভাবে পাথর তোলায় ৪৭ জন জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। স্থানীয় পুলিশ, প্রশাসন ও গণমাধ্যম কর্মীরাও এতে ‘পরোক্ষভাবে’ জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
গত ২৩ জানুয়ারি শাহ আরেফিন টিলা ধ্বসে পাঁচ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনার পরপরই জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত দল গঠন করে। সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) আবু সাফায়াৎ মুহম্মদ শাহেদুল ইসলাম তদন্ত দলের প্রধান।
শুক্রবার রাতে জেলা প্রশাসকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন এডিএম।
তিনি সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, স্থানীয়রা এ ব্যাপারে মুখ খুলতে চায় না। তাই অনেক বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় নি। এ ব্যাপারে আরো অধিকতর তদন্ত প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক জয়নাল আবেদীনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদন পাওয়ার কথা স্বীকার করলেও প্রতিবেদনে কি আছে তা জানাতে অস্বীকৃতি জানান।
সবকিছু সাংবাদিকদের জানার কি প্রয়োজন, বলেন জেলা প্রশাসক।
জেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, তদন্ত প্রতিবেদনে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনার আগে-পরের বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহা. মাছুম বিল্লাহ ও কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বায়েছ আলমের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকারীদের বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার প্রমাণ মেলে।
তদন্ত প্রতিবেদনে শাহ আরেফীন টিলা কেটে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনে স্থানীয় ৪৭ জন প্রভাবশালীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁরা হচ্ছেন কোম্পানীগঞ্জের চিকাডহর গ্রামের আইয়ুব আলী, আঞ্জু মিয়া, সেরাব আলী, কুদ্দুস মিয়া, ফয়জুর রহমান, গরিব উল্লাহ, আতিউর রহমান, মুহিবুর রহমান, আবদুল করিম, নূর উদ্দীন, হেলাল উদ্দীন, শাহ আরেফিন টিলা জালিয়ারপাড় গ্রামের শুক্কুর আলী, বশর মিয়া, ফারুক মিয়া, মাসুক মিয়া, সোনা মিয়া, সাদ্দাম মিয়া, আশিক মিয়া, মো. মানিক মিয়া, সজ্জাদ মিয়া, নূর মিয়া, বকুল মিয়া, রমজান মিয়া, হরমত উল্লাহ, নাসির মিয়া, আবদুল খালিক, আবদুল কাদির ও ইসমাইল আলী; পাড়ুয়া নোয়াগাঁও গ্রামের আতাউর রহমান; নারাইনপুর গ্রামের আবদুল হান্নান, আবদুর রহমান, আনাই মিয়া, আনফর আলী; পুরান জালিয়ারপাড় গ্রামের সমশের আলী কালা, আশিকুর রহমান, সমাদ মিয়া, লায়েক মিয়া, আবদুল কালিক, নূর ইসলাম; পূর্ব নারায়ণপুর গ্রামের রহিম; ভোলাগঞ্জ গ্রামের সোহেল মিয়া, শাহাব উদ্দীন; নতুন জালিয়ারপাড় গ্রামের ছায়ফুল ইসলাম; বাহাদুরপুর গ্রামের লীলু মিয়া এবং পাড়ুয়া লামাপাড়া গ্রামের একবার মিয়া, এনাম হোসেন ও ইসনাত আলী।
উল্লিখিত ব্যক্তিদের সঙ্গে পরোক্ষভাবে সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে গণমাধ্যমকর্মীদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রমাণের অভাবে তাঁদের নাম তদন্তে উঠে আসেনি।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছেন মাটিচাপা পড়ে শ্রমিক নিহত হওয়া ও লাশ সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে থানা-পুলিশের ভূমিকা রয়েছে।
থানা-পুলিশের সঙ্গে পাথর ব্যবসায়ীদের সুসম্পর্কের কারণেই ভোলাগঞ্জ ও শাহ আরেফিন টিলায় ‘বোমা মেশিন’ দিয়ে পাথর উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না।
তদন্ত দলের প্রধান বলেন, ‘অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকারীদের সঙ্গে ইউএনও এবং ওসির কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সে ব্যাপারে অধিকতর তদন্তের প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে শাহ আরেফিন টিলা এলাকায় অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন হলেও কেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো না, এটিই মূলত ইউএনও এবং ওসির বিরুদ্ধে সন্দেহকে পাকাপোক্ত করে।’
তবে ইউএনও মুহা. মাছুম বিল্লাহ বলেন, লাশ দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় তাঁর কোনো যোগসূত্র ছিল না। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হয়। প্রশাসন সব সময় তাঁদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল।
একইভাবে ওসি বায়েছ আলম তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘লাশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে শ্রমিকেরাই সরিয়ে নিয়েছেন। তবে বিষয়টি জানার পর আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ভূমিকা রেখেছি। এর সঙ্গে আমার কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই।’