Sylhet Today 24 PRINT

হাওরতীরে ‘ভাটির পুত্র’কে চিরবিদায়

দেবব্রত চৌধুরী লিটন, দিরাই থেকে |  ০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে আনোয়ারপুরে নিজ গ্রামের হাওরতীরে সম্পন্ন হলো সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। এই হাওর অঞ্চল থেকে উঠে এসেই সুরঞ্জিত হয়ে উঠেছেন জাতীয় পর্যায়ের নেতা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে হাওর অঞ্চলকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে টেকেরঘাট সাব সেক্টর। সুরঞ্জিত ছিলেন এই সেক্টরের কমান্ডার।

নিজ দলের অনুসারীরা তাকে আখ্যায়িত করতেন 'ভাটির সিংহপুরুষ' নামে। আর হাওরের সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন ঘরের মানুষ হিসেবে। কারও কাছে তিনি ছিলেন সেন দা, আবার কারও কাছে ছিলেন দুখু সেন নামে পরিচিত। সোমবার সন্ধ্যায় তাকে শেষ বিদায় জানালো ভাটির মানুষেরা। বাড়ির আঙ্গিনায় নির্মিত অস্থায়ী চিতায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয় সুরঞ্জিতের।

সোমবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৪টায় শেষবারের মতো নিজ বাড়িতে আসেন সুরঞ্জিত। এরআগে থেকেই লোকারণ্য ছিলো তাঁর বাড়ি। দিরাইসহ আশপাশের অঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষ হাজির ছিলেন বাড়িতে। মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকেই। ফুলে ফুলে ঢেকে যায় সুরঞ্জিতের কফিন।

কেবল নিজ বাড়িতে নয় সোমবার সিলেট, সুনামগঞ্জ, দিরাই, শাল্লা সব জায়গায়ই একই দৃশ্য দেখা গেছে। সবখানেই ফুল আর চোখের জলে বিদায় জানানো হয়েছে ভাটিবাংলার এই নেতাকে। কেবল আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও হাজির হন প্রবীন এই নেতাকে শ্রদ্ধা জানাতে।

চার স্থানে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে নিজ বাড়িতে গার্ড অব ওনার দেওয়া হয় সুরঞ্জিত সেনকে। দিরাই-শাল্লা থেকে ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের এই উপদেষ্টা। একবার সংসদ হন হবিগঞ্জের বানিয়াচং থেকে। জাতীয় সংসদের আইন বিচার ও সংসদ বিষয় স্থায়ী কমিটির দায়িত্বে থাকা এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ রোববার ভোরে মারা যান।

বিভিন্ন স্থানে শ্রদ্ধা
সকাল ১১ হেলিকপ্টারযোগে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনা হয় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মরদেহ। এসময় তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে জনতার ঢল নামে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ প্রধান প্রায় সবগুলো রাজনৈতিক দলের নেতারা সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা জানান।

এসময় শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, হুইপ শাহাব উদ্দিন, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহউদ্দিন সিরাজ, আহমদ হোসেন, সাংসদ পংকজ দেবনাথ, মজিদ খান, মুহিবুর রহমান মানিক, সাবেক রাষ্ট্রদূত একে আবুল মোমেন, জেলা পরিষদের প্রশাসক লুৎফুর রহমান, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য বদরউদ্দিন আহমদ কামরান, অধ্যাপক রফিকুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী, মহানগরের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন প্রমুখ।

পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের একমাত্র পুত্র সৌমেন সেনগুপ্ত।

এসময় চীফ হুইপ আ স ম ফিরোজ বলেন, পার্লামেন্টে বক্তব্য দেওয়া শিখতে হলে সুরঞ্জিতের কাছে যেতে হবে। তিনি ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পার্লামেন্টারিয়ান।

একে আবুল মোমেন বলেন, তিনি রাজনীতির আইডল। আপাদমস্তক এক রাজনীতিবিদ। তাঁর কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।

পঙ্কজ দেবনাথ বলেন, একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিবিদকে হারানোর পর সিলেটসহ দেশে যে সংকট তৈরি হল, তা সহসা পূরণ হবে না।

মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, তার মৃত্যুতে দেশ রাজনীতির এক দিকপালকে হারাল। দেশের যে কোনো সংকটে দূরদর্শী ভূমিকা রাখার যে গুণাবলী, যা তাঁর মধ্যে ছিল।

আহমদ হোসেন বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত চির অমর, চিরভাস্বর। একমাত্র জামায়াত ছাড়া সবাই তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে, শ্রদ্ধা জানিয়েছে। এতেই বোঝা যায় তিনি কেবল আওয়ামী লীগের নয়, সকলের নেতা।

সিলেটের শ্রদ্ধা জানানোর পর দুপুর ১২টার কিছু পর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় সুরঞ্জিতের নিজ জেলা সুনামগঞ্জে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সংলগ্ন শহীদ স্মৃতি স্তম্ভে স্থাপিত অস্থায়ী মঞ্চে রাখা হয় তাঁর মরদেহ। সেখানে শ্রদ্ধা জানানো ছাড়াও সুনামগঞ্জের প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে দেয়া হয় সম্মানসূচক গার্ড অব অনার।

সুনামগঞ্জ শহরে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সুরঞ্জিতের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর নির্বাচনী এলাকা শাল্লা উপজেলায়। সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর নিজ বাড়ি দিরাই উপজেলার আনোয়ারপুরে। কিছুক্ষণ বাড়িতে রাখার পর মরদেহ নিয়ে যাওয়ার হয় স্থানীয় মন্দিরে। সেখানে ধর্মীয় আচার শেষে আনা হয় বাড়ির পাশের বালুর মাঠে। এই মাঠে আবার গার্ডর অব অনার প্রদান করা হয় সুরঞ্জিতকে। এখানে সুরঞ্জিতের ‘চিরকালের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বি’ সাবেক সাংসদ ও বিএনপি নেতা নাসির চৌধুরীসহ সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

‘দিরাই-শাল্লার সকল মানুষই আমার আত্মীয়’
দিরাইয়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আগে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে সুরঞ্জিত-পুত্র সৌমেন সেনগুপ্ত বলেন, দিরাই-শাল্লার সকল মানুষই আমার আত্মীয়।

তিনি বলেন, আজ আমার বাবার লাশ ঢাকা থেকে নিয়ে আসার সময় আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল আমার সাথে কেউ দিরাইয়ে যাবে কিনা। আমি তাদের বলেছি, তার দরকার নাই; এই অঞ্চলের সবাই আমার আত্মীয়।
দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায় জানান, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত দিরাইয়ে তার নিজ বাড়িতে এসেছিলের গত জেলা পরিষদ নির্বাচনের দুই দিন আগে। এসময় তিনি আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় যোগ দিয়েছিলেন তিনি। দলীয় কর্মীদের নিয়ে সভাও করেন তিনি।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.