নিজস্ব প্রতিবেদক | ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭
'ড্যান্ডি' নামক একধরণের নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে সিলেটের ছিন্নমূল শিশুরা। বাসস্টেশন, রেলস্টেশন, নদীর তীরে বসে ড্যান্ডি সেবন করে এসব শিশুরা। জুতা কিংবা ফোমে ব্যবহৃত সলিউশন (আঠা) পলিথিনে ভরে কিছুক্ষণ পরপর মুখের সামনে নিয়ে শ্বাস টেনে নেশা করতে দেখা যায় এসব শিশুদের। মাদক সেবনের টাকার বাগবাটোয়ারা নিয়ে খুনোখুনির ঘটনা ঘটছে।
অপরদিকে জুতার আঠা নিষিদ্ধ কোনো বস্তু না হওয়ায় এ ব্যপারে কোন পদক্ষেপ নিতে পারছে না মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। শিশুদের কাছে যেন এটি বিক্রি করা না হয় সেজন্য ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা চেয়েছেন মাদ্রকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
সরেজমিন দক্ষিন সুরমার রেলওয়ে স্টেশন এলাকার ডগেরপার, কিন ব্রিজের নীচে, কাজীরবাজার সেতু, শাহজালাল সেতু, কুশীঘাট, ছড়ারপার, কাষ্টঘর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন ছিন্নমূল শিশুকে এ নেশা গ্রহণ করতে দেখা যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৩০ থেকে ৪০ টাকায় একধরনের জুতার গাম কেনে শিশুরা। নগরীর প্রায় সব এলাকার দোকানেই এসব জুতার গাম পাওয়া যায়। পলিথিনের ব্যাগে আঠাল ওই পদার্থ নিয়ে কিছুক্ষণ ঝাঁকানো হয়। তারপর পলিথিন থেকে নাক বা মুখ দিয়ে বাতাস টেনে নেয়। এই নেশা ‘ড্যান্ডি’ নামেই পরিচিত।
সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ডগেরপার এলাকায় গিয়ে কথা হয় দুই ছিন্নমূল শিশুর সঙ্গে। একজনের নাম আলফু মিয়া। সে জানায়, সারাদিন পারাইরচকে সিটি করপোরেশনের ময়লা ফেলার এলাকায় আবর্জনা থেকে কাগজ ও প্লাস্টিক কুড়ায়। এরপর ভাঙ্গারির দোকানে বিক্রি করে ২/৩’শ টাকা হয়। বিকালে তারা ডগেরপার এলাকায় বসে ড্যান্ডি নিয়ে। যেদিন টাকা কম হয় সেদিন গাজা সেবন করে বলে জানায় আলফু।
ড্যান্ডি কিভাবে সংগ্রহ করে এমন প্রশ্নের জবাবে সঙ্গে থাকা শানু মিয়া জানায়, আমাদের দেখলে দোকান মালিকদের কেউ কেউ নাক শিটকায়। আবার কেউ কেউ বেশী দাম দিয়ে বিক্রি করে। আবার অনেক দোকানের কর্মচারীদের সঙ্গে তাদের রয়েছে সখ্যতা। তারাই বিক্রি করে।
সে জানায়, মালিকরা দূর থেকে আইকা পার্টি চলে আসছে বলে সম্বোধন করে। কখনো কখনো জুতা যারা সেলাই করে তাদেরকে টাকা দিলে তারা এনে দেয়। অনেক সময় তারাও ড্যান্ডি নেশায় শরিক হয় বলে জানায় শানু।
কুশীঘাট এলাকায় সুরমা নদীর তীরে কথা হয় ৮ বছরের শিশু মোসলেম মিয়ার সঙ্গে। সে বলে, আমার সঙ্গে থাকে জৈনউদ্দিন, হামজা, সালাই, বিলাল, মতসিন, তারা সবাই আঠা খায় তাই ওদের দেখাদেখি আমিও আঠা খাই।
আঠা কোথা থেকে কেনা হয় এমন প্রশ্নের জবাবে সে জানায়, এটি সবখানেই পাওয়া যায়। নগরীর মহাজনপট্টি, বন্দরবাজার, দক্ষিন সুরমার লাউয়াইসহ যেখানে সেখানে পাওয়া যায়।
সিলেটে পথ শিশুদের নিয়ে কাজ করে 'ইচ্ছাপূরণ' নামের একটি সংগঠন। এ সংগঠনের সভাপতি রেশমা জান্নাতুল রুমা বলেন, পথ শিশুদের নিয়ে কাজ শুরুর পর থেকেই দেখেছি তারা বিভিন্ন নেশায় আশক্ত। তিনি জানান, তাদের অধিকাংশই ড্যান্ডি নেশায় আশক্ত। আমাদের একটি বিদ্যালয় আছে। ওই বিদ্যালয়ে ৪২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদেরকে ধরে এনে ক্লাস করাতে হয়। ক্লাসে আনার পর দেখা যায় কারো মুখে গুল। আবার কারো হাতে গাম লাগানো রয়েছে। প্রথম প্রথম বুঝিনি আঠা লাগানোর কাহিনী। পরে বুঝতে পারি ড্যান্ডি নেশায় তারা জড়িয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, ক্লাস চলার সময় তারা অনেকেই ঝিমুতে থাকে। অনেক সময় তাদেরকে আমাদের পক্ষ থেকে চা এবং কফি পান করিয়েও তাদের ঝিমুনি তাড়াতে পারি না।
রুমা বলেন, সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় ড্যান্ডি নেশায় আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, স্বল্প খরচের মাদক ‘গাম’। বয়স ও সামর্থ্য ভেদে নেশার উপকরণেও পার্থক্য আছে। আট থেকে ১০ বছর বয়সের শিশুরা সাধারণত গাঁজা, সিগারেট ও গাম সেবন করে। ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সীরা ফেনসিডিল ও হেরোইন সেবন করে। মধ্যবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের কিশোর-যুবকদের নেশার অন্যতম উপকরণ ইয়াবা। তবে অধিকাংশ পথশিশুরা ড্যান্ডি নেশায় আসক্ত।
এ ব্যাপারে সিলেট মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. জাফরুল্লাহ কাজল বলেন, জুতার আঠা নিষিদ্ধ কোনো বস্তু নয়, এ কারণে এ বিষয়ে কিছু করতেও পারছি না। এটি একটি নতুন নেশা। আমি শুনেছি সিলেটের অনেক পথ শিশু ওই নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। গাম যেহেতু আমাদের একটি প্রয়োজনীয় দ্রব্য। এটি বিক্রি বন্ধ করা যাবে না। তবে আমাদের এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। এটি যারা বিক্রি করেন তারা একটু সচেতন হলেই এ নেশা থেকে শিশুদের নিরাপদ রাখা সম্ভব।
গত বছরের ১৩ নভেম্বর শহরতলীর মিরেরচক এলাকার একটি হাওর থেকে উদ্ধার করা হয় মিরাপাড়া এলাকার আব্দুল করিমের ছেলে দোকান কর্মচারী শাহানুর মিয়ার লাশ। আগের দিন বিকালে শাহানুরের এক বন্ধু তার মোবাইলে কল করে তাকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে যায়। পরদিন তার লাশ হাওরে পাওয়া যায়। সে ড্যন্ডি সেবন করত বলে এলাকার লোকজন জানিয়েছেন। আর এটি নিয়ে তাকে খুন করা হয়ে থাকতে পারে বলে ঘটনার সময় পুলিশ জানিয়েছিল।