নবীগঞ্জ প্রতিনিধি | ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭
এক হিন্দু যুবক ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননকার ছবি আপলোড করেছেন, এমন অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ। ওই যুবকের ফাঁসির দাবি করে সোমবার দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল করে স্থানীয় জনতা। এসময় কয়েকটি হিন্দু বাড়িঘর ভাংচুর ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়।
ঘটনা সামাল দিতে সোমবার দুপুরে স্থানীয় জনতাকে নিয়ে বৈঠক করেছেন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। এলাকায় বিজিবিসহ অতিরিক্ত র্যাব ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পেশায় মুদি দোকানি ওই যুবককে রোববার রাতেই আটক করে সোমবার জেলা হাজতে প্রেরণ করেছে পুলিশ। সে ফেসবুকে অবমাননাকর ছবি আপলোড করার কথা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এরআগে গতবছরের অক্টোবরে একই ধরণের ঘটনা ঘটে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার নাসিরনগরে। সেখানে রসরাজ নামের এক জেলের বিরুদ্ধে ফেসবুকে কাবা শরীফের ছবি বিকৃত করে আপলোড করার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার জের ধরে ব্রাক্ষণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু বাড়িঘর-মন্দিরে হামলা-ভাংচুর- লুটপাটের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ ওঠার পরপরই আটক করা হয়েছিলো রসরাজ দাসকে। তিনি বর্তমানে জামিনে আছেন।
নাসিরনগরের মতো নবীগঞ্জের ইনতাগঞ্জের রজত রায় নামে এক মুদি দোকানীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে কাবা শরীফের ছবি বিকৃত করে আপলোড করার অভিযোগ ওঠে।
রোববার দুপুরে এ অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় মুসলিম জনতার মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। ইনাতগঞ্জসহ অনেকস্থানে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা। এ অবস্থায় রোববার রাতেই অভিযুক্তকে আটক করে পুলিশ।
রজত রায়ের ফাঁসি দাবি করে সোমবার সকাল ১১ টার দিকে বিভিন্ন গ্রাম থেকে খন্ড খন্ড বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। ইতানগঞ্জ বাজারে এসে মিলিত হয় এসব মিছিল। এরপর ইউনিয়নের মধ্যসমেত গ্রামের রজত রায়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে মিছিল শুরু করলে পথিমধ্যে কয়েকটি হিন্দু বাড়ি ভাংচুর করা হয় ও কয়েকটি হিন্দু বাড়িতে ইট পাটকেল ছোড়া হয়। এতে স্থানীয় বাসিন্দা অভিজিৎ রায়, সঞ্জয় রায়, শুভাষ রায়, গোবিন্দ রায়ের বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পরে পুলিশ ও স্থানীয়দের সহায়তায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। শেষে বিক্ষোব্দ জনতা ফের মিছিল নিয়ে বাজারের দিকে আসার সময় আবার উত্তেজনা দেখা দেয়। এসময় স্থানীয় কয়েকজন মিছিলকে উদ্দেশ্য করে ইটপাটকেন নিক্ষেপ করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসময় পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
দুপুর ২টার দিকে বিক্ষোব্দ জনতাদের নিয়ে স্থানীয় হাই স্কুল মাঠে প্রশাসনের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি শান্ত করার লক্ষে সভা করেন। এতে বক্তব্য রাখেন, সিলেট রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নজরুল ইসলাম, হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক সাবিনা আলম, পুলিশ সুপার জয় দেব কুমার ভদ্র, বিজিবির কমান্ডার কর্ণেল সাজ্জাদুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সফিউল আলম, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এডভোকেট আলমগীর চৌধুরী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাজিনা সারোয়ার, সহকারী কমিশনার ভূমি জীতেন্দ্র কুমার নাথ, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক সাইফুল জাহান চৌধুরী, নবীগঞ্জ থানার ওসি এস.এম আতাউর রহমান, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, বজলুর রশীদ, মুহিবুর রহমান হারুন প্রমুখ।
এসময় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, আইনের উর্ধে কেউ নয়। ঘটনার পরপরই দোষী রজত রায়কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে তারা বিক্ষোভকারীদের আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহবান জানিয়ে বলেন, আপনারা আইন নিজের হাতে নিয়ে কেউ অপরাধী হবেন না। এসময় বিক্ষোভকারীরা প্রচলিত আইনে দোষী রজতের শাস্তি না দিয়ে তাকে বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করে তার বিচারের দাবী জানান।
এদিকে, ফেসবুকে অবমাননাকর পর জনতা বিক্ষোভ মিছিল করার খবর পেয়ে রজত রায়কে রোববার বিকেলে গ্রেফতার করে পুলিশ। রাতেই নবীগঞ্জ থানার এসআই মোবারক হোসেন বাদী হয়ে তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা দায়ের করেন। সোমবার সকালে রজতকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরন করা হয়।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ইনাতগঞ্জ বাজার ও আশ পাশ এলাকায় দুই প্লাটুন বিজিবি, দুই প্লাটুন র্যাব, দশ প্লাটুন অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এলাকার হিন্দু বাড়ি ঘরের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে নবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস.এম আতাউর রহমান বলেন, বর্তমানে আইনশৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। যেকোন অপ্রতিকর ঘটনা এড়াতে আইনশৃংখলা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।
এ ব্যাপারে সিলেট রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নজরুল ইসলাম বলেন, অভিযুক্তকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছি। তাকে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং আইনশৃংখলা বাহিনী তৎপর রয়েছে।