হবিগঞ্জ প্রতিনিধি | ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার সেই তরুণীকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ‘গৃহকর্মী’র কাজের কথা বলে দালালদের খপ্পরে পড়ে সৌদি আরবে পাচার হয়ে যৌনবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়েছিল তাকে। মঙ্গলবার (২১ ফেব্রুয়ারি) ভোরে ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান সেই তরুণী।
তরুণীর দেশে ফেরার পর মঙ্গলবার সকালে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সদস্যরা তাকে ঢাকার কার্যালয়ে নিয়ে প্রাথমিকভাবে জবানবন্দি গ্রহণ করেন। বিকেলে তাকে ঢাকা থেকে হবিগঞ্জ এনে বিচারিক হাকিম বেগম লায়লা মেহের বানুর আদালতে হাজির করা হয়। বিচারক তার খাসকামরায় মেয়েটির জবানবন্দি গ্রহণ করে তাকে পরিবারের জিম্মায় দেন। হবিগঞ্জের বিচারিক হাকিম আদালতে সৌদি আরবে তাঁর ওপর পাশবিক নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
সিলেট ও হবিগঞ্জ জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, মেয়েটি দালালদের খপ্পরে পড়ে সৌদি আরবে পাচার হয়েছিলেন। সেখানে মেয়েটি অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন। মেয়ের পরিবারের কাছ থেকে তার ওপর নিষ্ঠুরতার ঘটনা জানতে পেরে তিনি মেয়েটিকে উদ্ধারে পদক্ষেপ নেন।
ঢাকার নয়াপল্টন এলাকার গ্রিন বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ট্র্যাভেল এজেন্সি থেকে সিআইডির কর্মকর্তা শাহ আলম গত ১৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরে দালাল চক্রের তিন সদস্যকে আটক করেন। এ সময় পাচারের অপেক্ষায় থাকা হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার ১৩ বছরের এক কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়। জব্দ করা হয় ২৫টি পাসপোর্ট, রেজিস্টার খাতা ও মোবাইল নম্বর। ওই দিন সন্ধ্যায় তিনজনকে হবিগঞ্জ আদালতে হাজির করা হয়। জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম নিশাত সুলতানা তাঁদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
‘আম্মা, আম্মা গো, আমারে বাঁচাও তাড়াতাড়ি। আমারে বেইজ্জতি থাইকা বাঁচাও। বাবা আমারে বাঁচাও’ বলে বাবা-মাকে জানিয়ে তাকে উদ্ধার করার আকুতি মুঠোফোনের ঘণ্টাব্যাপী কথাবার্তার রেকর্ড নিয়ে বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনরা ছুটে যান সিলেট ও হবিগঞ্জ জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী কাছে।
এ ঘটনায় আটক গ্রিন বেঙ্গল ট্র্যাভেল এজেন্সির মহাব্যবস্থাপক মো. শাহজানুর রহমান, পরিচালক এরশাদ উল্লাহ ও আবু তাহের বর্তমানে তারা হবিগঞ্জ জেলা কারাগারে আছেন। আটককৃতদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ১৬ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরবের দাম্মাম থেকে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার ওই তরুণীকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর মেয়েটিকে সৌদি আরবের একটি আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাকে বাংলাদেশে পাঠানোর আদেশ দেন। আদালতের আদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস তাকে মঙ্গলবার দেশে পাঠায়।
সিআইডি পুলিশ ধর্ষণের অভিযোগ নিশ্চিত হওয়ার জন্য মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মেয়েটিকে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে পাঠায়। একুশে ফেব্রুয়ারি ছুটির দিন থাকায় কাল বুধবার ২২ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালে মেয়েটির ধর্ষণের আলামত পরীক্ষা করা হবে।
সিআইডি সিলেট অঞ্চলের উপপরিদর্শক (এসআই) সুমন মালাকার সাংবাদিকদের জানান, গ্রেপ্তার হওয়া তিন আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাতদিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। কাল বুধবার তাদের রিমান্ড শুনানি হবে।
দরিদ্র বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে ওই তরুণী ঢাকার গ্রিন বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ট্র্যাভেল এজেন্সির মাধ্যমে গত ৬ ডিসেম্বর গৃহপরিচারিকার চাকরি নিয়ে সৌদি আরবের দাম্মামে যান। কিন্তু তাঁকে গৃহপরিচারিকার কোনো কাজ না দিয়ে সেখানকার দালালরা সে সহ পাচার হওয়া অন্যাদেরকেও তিন-চারদিনের জন্য একেকজন সৌদি নাগরিকের কাছে ভাড়া দিত। সেখানে তাদের ওপর শারীরিক ও পাশবিক নির্যাতন হতো। সেখানে তাদের উপার্জিত অর্থও দালালরা নিয়ে যায়। কেউ কোনো প্রতিবাদ জানালে তাকে কিল-ঘুষি-লাথি মারা হয়।