Sylhet Today 24 PRINT

কেমন চাই ‘আগামীর সিলেট’

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

সিলেট নগরীর কদমতলী মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে থাকবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বর্ণনামূলক ম্যুরাল, বাংলাদেশের পতাকা ও পরিচিতি প্রদর্শনের সাথে সাথে থাকবে চক্রাকারে পথচারীদের হাঁটার ব্যবস্থা। চত্বরের চক্র ধরে থাকবে মিনি পার্ক। চত্বরের খুব কাছে বলে সহজেই এই চত্বর থেকে হেঁটে চলে যাওয়া যাবে নদীর পাড়ে বিস্তীর্ন প্রান্তরে।

কেবল এই একটি চত্বরই নয়, পুরো নগরকেই এমন পরিকল্পিত ও পরিপাটিভাবে সাজানোর পরিকল্পনা এঁকেছেন প্রকৌশলীরা। ‘আগামীর সিলেট’ শিরোনামে এই স্থাপত্য প্রদর্শনী চলছে সিলেটে চলমান বেঙ্গল সাংস্কৃৃতিক উৎসবে।

সিলেট নগরের মাছিমপুর এলাকার আবুল মাল আবদুল মুহিত ক্রীড়া কমপ্লেক্সে এই স্থাপত্য প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বেঙ্গল ইনস্টিটিউট ফর আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপ অ্যান্ড সেটলমেন্ট। ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী চলবে ৩ মার্চ পর্যন্ত।

সিলেটে নতুন কারাগার নির্মানের কাজ চলছে। আগামী বছরে এই নির্মান কাজ শেষ হবে। কারাগার স্থানান্তরের পর খালি হয়ে যাবে নগরের প্রাণকেন্দ্র অবস্থিত বর্তমান কারাগার।

সিলেটের পুরনো জেল কমপ্লেক্সকে দারুণ সম্ভাবনা উল্লেখ করা হয়েছে আগামীর সিলেট’র ভাবনাচিত্রে। এটি অন্যত্র স্থানান্তরিত হবার পর পুরনো জেল রূপান্তরিত হয়ে পরিণত হবে একটা প্রাণবন্ত পাবলিক প্লেসে, থাকবে হেঁটে বেড়ানোর পরিবেশ। নতুন রুপান্তরে থাকছে পার্ক, দীঘি, বাগান, থিয়েটার কমপ্লেক্স। পুরনো বাড়িগুলোকে রেখে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে গানের ও চিত্রকলার স্কুল। জেলের পুরনো বাড়িগুলোকে পুনর্বাসন করে হতে পারে জাতীয় মানের যাদুঘর- এমন ভাবনার একটি নকশাও প্রদর্শন করা হচ্ছে এই প্রদর্শনীতে।

প্রদর্শনীর সাথে সংশ্লিষ্টরা জানান, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের আগ্রহে সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোর সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য একটা পরিকল্পনা তৈরি করে দিতে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনকে ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রস্তাব দেয় সিলেট সিটি করপোরেশন। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আর্কিটেকচার ইনস্টিটিউট সে সময়ে পরিকল্পনাকে শুধু পয়েন্টগুলোর সৌন্দর্য বৃদ্ধির পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো নগরের জন্য পরিকল্পনা তৈরি করে; যেখানে সিটি করপোরেশন এলাকাকে নান্দনিকভাবে সাজিয়ে তোলার পরিকল্পনা তৈরি করা হয়।


প্রদর্শনীতে সিলেটের নদী, ছড়া, বিভিন্ন মোড় ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকার বর্তমান চিত্র তুলে ধরে আগামীতে কি করে আরো নানন্দিকভাবে এগুলোকে গড়ে তোলা যায়, তার একটি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছেন বেঙ্গল ইনস্টিটিউট ফর আর্কিটেকচারের প্রকৌশলী দল।

প্রদর্শনীর শুরুতেই একটি ফেস্টুনে লেখা রয়েছে এর উদ্দেশ্য- 'সিলেট শহরের অনন্য ও নিরুপম অবস্থা ধরে রাখা এবং আরো সমৃদ্ধ করার জন্য প্রয়োজন নতুন নাগরিক কল্পনা ও ভাবনাচিত্র।...২৬.৫ বর্গকিলোমিটার আর ৪ লক্ষ ৮১ হাজার ৪৩০ জনসংখ্যার এই নগর বৃদ্ধি পেয়েছে যত্রতত্র, পূর্ব পরিকল্পনারহিত। আর এই ছোট শহরের বড় শহর হয়ে ওঠার চক্করে হারিয়ে যাচ্ছে ‘সিলেটী আমেজ’। তাই আমাদের চেষ্টা কিভাবে এর স্বকীয়তা বজায় রেখেই একটি নান্দনিক, ঐতিহ্যমন্ডিত ও পরিবেশবান্ধব শহর গড়ে তোলা যায় তার একটি ভাবনাচিত্র উপহার দেওয়া।'

আগামীর সিলেট’র এই পরিকল্পনা সম্পর্কে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীব বলেন, তাদের পরিকল্পনাটি ভালো। এটি বাস্তবায়ন করতে পারলে পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা সম্ভব। তবে বাস্তবায়নে কিছুটা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অধিক জনসংখ্যা, জায়গার অভাব, বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থসঙ্কট- এসবের কারণে একসাথে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তবে কিছু কিছু করে করা যেতে পারে।

এই ভাবনাচিত্রে নগরীর কয়েকটি প্রধান সড়ককে ভিন্নভাবে সংগঠিত করে রিংরোডের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। রিংরোডগুলো চক্রাকারে সুরমা নদী পার হয়ে শহরের কেন্দ্রস্থলকে আরো শোভনীয়ভাবে নির্দিষ্ট করবে।

আগামীর সিলেট’র ভাবনাচিত্রে ১৯৩০ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সিলেট নগর গড়ে ওঠার কয়েকটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। রয়েছে সিলেটের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বর্ণনা।

এই ভাবনাচিত্রে শহরের সড়ক ও ছড়াগুলোর পাশে হাঁটার পরিবেশ, যানবাহন চলাচল, পার্কিং ব্যবস্থা গোছানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সিলেটের আদি বাড়িগুলোকে ঐশ্বর্য উল্লেখ করে এগুলো সংস্কার করে আর্ট ও ক্রাফট গ্যালারি, স্টুডিও ও প্রদর্শনীকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সুরমা নদী সংরক্ষণ ও নদীর পাড়কে সবুজে ঢাকা পথচারী চত্বর হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া জনসমাগম ও উন্মুক্ত স্থান গড়ে তোলা, সড়ক বড় করা, নতুন আঙ্গিকে জলজ  উদ্যান, সুরমা নদীর তীর, কারাগার কমপ্লেক্স, পুকুরপাড়ের জনপরিসর, ইকোলজিকেল পার্ক, নদী তীরে কনভেনশন সেন্টার, আর্ট ক্যাম্পাস, শিশুদের পার্ক গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন হলে নগরীর চিত্র কেমন হবে তার নকশাও তুলে ধরা হয়েছে প্রদর্শনীতে।

নিত্য অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে উঠছে সিলেট নগরী। ভরাট হয়ে যাচ্ছে পুকুর-দিঘী। নিয়ম- নীতি না মেনে গজিয়ে উঠছে উঁচু উঁচু ভবন। ফুটপাত দখল হয়ে যাচ্ছে আর সরু হয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট। ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে নাগরিক দুভোর্গ। এই পরিকল্পনাহীনতার বিপরীতে সবুজে ঘেরা এই নান্দনিক সিলেটের স্বপ্ন মনে ধরেছে উৎসবে আগতদের। ফলে উৎসবের মূল মঞ্চের বাইরের এই স্থাপত্য প্রদর্শনী দেখতে ভিড় করছেন অনেকে।

স্থাপত্য প্রদর্শনীর প্যাভিলিয়নের সজ্জাও মন কেড়েছে আগতদের। বাঁশ দিয়ে সাজানো হয়েছে পুরো মঞ্চ। আর প্রদর্শনীস্থলেই আলাদা আলাদা জারে রাখা হয়েছে সিলেটের বিভিন্ন পুকুর, দিঘী, ডোবা ও সুরমা নদীর পানি। যেসব জলাশয়গুলো ইতোমধ্যে ভরাট হয়ে গেছে, সেগুলোর পানির বদলে মাটি রাখা হয়েছে জারগুলোতে।

এই প্রদর্শনীর সাথে যুক্ত লিডিং ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক স্থপতি রাজন দাশ বলেন, প্রায় ছয় মাস পূর্বে স্থপতি ড. কাজী খালিদ আশরাফের নেতৃত্বে দেশসেরা কয়েকজন স্থপতি মিলে 'আগামীর সিলেট' নামের এই পরিকল্পনা তৈরি করেছেন।

আর সিলেটের বিভিন্ন জলাধার ভরাট, দখল ও দূষণ হয়ে যাওয়ার চিত্র ধরতেই জারে করে নগরীর ৭৭টি জলাশয়ের পানি ও মাটি প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে।

বেঙ্গল সাংস্কৃতিক উৎসবের পর নগরীর রিকাবীবাজারের মোহাম্মদ আলী জিমনেসিয়াম হলে ৬ মার্চ থেকে মাসব্যাপী এই প্রদর্শনী চলবে বলে জানান তিনি।

আগামীর সিলেট'র এই ভাবনাচিত্রে সিলেট নগরীর প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, জনসংখ্যা ও যানজট বৃদ্ধি, জলাশয় ও টিলা হারিয়ে যাওয়া, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া, বিদ্যুৎ ও সুপেয় পানির অভাব এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অপ্রতুলতাকে। আর প্রবাসী জনগোষ্ঠি ও তাদের পাঠানো রেমিটেন্স, দেশের মোট জিডিপিতে ৮.৭ শতাংশ অবদান, শিক্ষার হার বৃদ্ধি, চা শিল্প, নাগরিকদের আয় বৃদ্ধি ও দেশের বৃহত্তম পর্যটন আকর্ষনকে- সিলেটের সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.