দেবাশীষ দেবু | ০৫ মার্চ, ২০১৭
বিশিষ্ট জিনবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী বলেছেন, একমাত্র বাংলাদেশেই বিজ্ঞানকে বুদ্ধিভিত্তিক চর্চা ধরা হয় না। বিজ্ঞানীরা এখানে বুদ্ধিজীবী নন। আমি ধানের নতুন জাত আবিষ্কার করি, পুরনো জাতকে সংরক্ষণ ও নতুনভাবে চাষ করি; কিন্তু বুদ্ধিজীবী নই। অথচ আমি যদি এসব না করে ধান নিয়ে কবিতা লিখতাম তা হলে আমাকে বুদ্ধিজীবী বলা হতো।
তিনি বলেন, যে ধান উৎপাদনে অবদান রাখে, বিভিন্ন জাতের ধান উৎপাদন ও বিস্তারে অবদান রাখে সেও বুদ্ধিজীবী। কেবল যারা লেখালেখি করে তারাই বুদ্ধিজীবী না।
শনিবার সন্ধ্যায় সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকম কার্যালয়ে এসে একান্ত আলাপচারিতায় এসব কথা বলেন ড. আবেদ চৌধুরী।
মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায় জন্ম নেওয়া আবেদ চৌধুরী আধুনিক জীববিজ্ঞানের বিশ্বের প্রথম সারির গবেষকদের একজন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থায় একদল বিজ্ঞানীর সমন্বয়ে গঠিত গবেষকদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পাশাপাশি নিজের এলাকা কুলাউড়ায় নতুন ও হারিয়ে যাওয়া জাতের ধানের উৎপাদন ও প্রসারে কাজ করছেন। তরুণদের বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহী করে তুলতেও কাজ করছেন ড. আবেদ।
নিজের কাজ ও বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে শনিবার সন্ধ্যায় সিলেটটুডে'র সাথে আলাপ করেন তিনি।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে আবেদ চৌধুরী বলেন, আমাদের এখানে শিক্ষা উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়। শিক্ষা জীবনঘনিষ্ঠ নয়। সম্রাট অশোকের পর দিল্লীর সিংহাসনে কে বসেছিলেন সেটা আমাদের পাঠ্যপুস্তকে শেখানো হয়। কিন্তু পিএইচডি করেও একজন শিক্ষার্থী নিজের শরীর, শরীরবিজ্ঞান, পুষ্টিবিজ্ঞান সম্পর্কে কিছু জানি না। আমরা কি খাচ্ছি, কেনো খাচ্ছি জানি না। প্রকৃতি সম্পর্কে জানি না। শস্যগুলো কেনো হারিয়ে যাচ্ছে তা জানি না। অথচ আমাদের পাঠ্যপুস্তকে এগুলো শেখানোর প্রয়োজন ছিলো।
তিনি বলেন, এক্ষেত্রে ধর্মান্ধতার একটা প্রভাব আছে। ধার্মিক হয়ে যাও, প্রজ্ঞাবান হইও না- এমন একটা বার্তা আমাদের সমাজে দেওয়া হচ্ছে।
সারা সমাজ, এমনকি আমার পরিবারেও এরকম একটা ধারণা আছে যে- লেখাপড়া না করে কেবল মোনাজাত করলেই হয়ে যাবে। কিন্তু আসলে তো এটা ঠিক না। এমনটি বলে ইসলামেরও ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। সমাজে এরকম ধারণা ছড়িয়ে পড়লে মানুষ জানবে কি করে। মানুষকে তো জানাতে হবে,- বলেন আবেদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, এসব নিয়ে এখন কিছু বলাটাও ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও আমাদের বলতে হবে। বিজ্ঞান নিয়ে, পরিবেশ-প্রকৃতি নিয়ে, শস্যকণা নিয়ে কথা বলতে হবে।
বিজ্ঞান শিক্ষায় অনাগ্রহ ও অজনপ্রিয়তার কথা উল্লেখ করে এই জিন বিজ্ঞানী বলেন, এক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদেরও কিছু দায় আছে। তারা খুব খটমট করে বক্তৃতা করবেন কিংবা কঠিন করে লিখবেন- তাতে মানুষ আগ্রহ পাচ্ছে না। সহজ ভাষায় বিজ্ঞানকে উপস্থাপন করতে হবে। এই দায় বিজ্ঞানীদের নিতে হবে।
তিনি বলেন, বিজ্ঞানীদের আগে দার্শনিক হতে হবে। নিজস্ব দর্শন না থাকলে বিজ্ঞানী হওয়া যাবে না।
যারা বিজ্ঞান নিয়ে লিখেন তারা জনপ্রিয়তা পান না উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক বিজ্ঞানের লোকও এখন বিজ্ঞান ত্যাগ করে অন্য বিষয়ে লেখালেখি করেন। পপুলার বিষয়ে লেখালেখি করার পর এখন মানুষ তাদের নোটিশ করে।
সংবাদমাধ্যমকেও এই দায় নিতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমকে বিজ্ঞান সচেতনতায় এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু দেশের কোনো গণমাধ্যমে বিজ্ঞান বিষয়ক সম্পাদক নেই। বিজ্ঞানবিষয়ক লেখালেখি অনেক কম স্থান পায়।
তিনি বলেন, আজকাল তো শিক্ষা আর ক্লাসরুমে সীমাবদ্ধ নেই। পত্রিকার একটি নিবন্ধ পড়েও মানুষ অনেক কিছু শিখতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে মানুষ কি করে শিখবে এনিয়েও আমরা কাজ করছি।
নিজ এলাকা কুলাউড়া উপজেলার হাজিপুর ইউনিয়নে ৮০ বিঘা জমির মধ্যে তিনি কালো জাতের চাল, সোনালী চাল ও কালো টমেটো চাষ করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, হার্ভাড ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে সাদা চাল খাওয়ার কারণে মানব শরীরে রক্তে শর্করা বাড়ে। অথচ এমন একটি সময় ছিল, যখন মানুষ লাল চাল খেয়েছে। লাল চাল মানুষের স্বাস্থ্য উপযোগী ছিল।
তিনি বলেন, চালের আদি রং ছিল লাল। যেভাবে প্রকৃতি চেয়েছে। সমস্ত আউশ ও আমনের চাল লাল ছিল। ষাটের দশকের পরে প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত লাল চালকে মিলিং করে সাদা কারা মাধ্যমে খাওয়া শুরু হলো। চালের ওপর থেকে পুষ্টিগত বা উপকারী যে আশ সেটা সরিয়ে দেওয়া হলো। তখন থেকে ডায়াবেটিস মহামারি দেখা দেয়। কিডনি রোগীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে।
প্রকৃতিগতভাবে ফসলে থাকা রং সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই রং মানুষের বয়সকে ধরে রাখতো। হৃদরোগ প্রতিরোধক ছিল। এখন এসব কারণে চল্লিশের কোটায় পৌছার আগেও মানুষ হৃদরোগাক্রান্ত হয়।
ড. আবেদ বলেন, এখন সমস্ত সাদা চালকে লাল করা যাবে না। তাই সাদা চালের সঙ্গে সুপার রাইস বা সোনালী চালের ২০ভাগ সংমিশ্রণ ঘটিয়ে রান্না করলে শর্করা ভাত খেলেও বাড়বে না। সোনালী চাল মেশালেও সাদা রংই থেকে যাবে। এর দামও থাকবে সহনীয় পর্যায়ে।
ভবিষ্যতে নিজের উৎপাদিত কালো চাল (ব্ল্যাক রাইস) ও কালো টমেটো (ব্ল্যাক টমেটো) বাজারজাত করা হবে জানিয়েছেন ড. আবেদ চৌধুরী।
ড. আবেদের মতে, ‘আমরা সমস্ত কিছু গ্রামে করছি। সিলেটকে এগিয়ে নিতে কাজ করছি। গ্রামে কর্মসংস্থানের যোগাড় হবে। মানুষ কাজের জন্য শহরে আসে, এখন থেকে কাজের জন্য গ্রামে যাবে।
তিনি বলেন, মানুষ যাতে চাকরী না খুঁজে উদ্যোক্তা হয় তাদের এই স্বপ্ন দেখাতে হবে।
সিলেটটুডে কার্যালয়ে ড. আবেদ চৌধুরীর সাথে আলাপচারিতায় সময় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দেশ টিভি'র সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধি বাপ্পা ঘোষ চৌধুরী, সমকাল'র সিলেট ব্যুরো প্রধান চয়ন চৌধুরী, সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকম'র প্রধান সম্পাদক কবির য়াহমদ, সম্পাদক আব্দুল আলিম শাহ, ডেইলি স্টার'র সিলেট প্রতিনিধি দ্বোহা চৌধুরী প্রমুখ।