Sylhet Today 24 PRINT

সুনামগঞ্জ হাওর রক্ষা বাঁধ : মেয়াদ শেষেও অর্ধেক কাজ শেষ হয়নি

২ লাখ ২০ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমির ফসল নিয়ে শঙ্কায় কৃষকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ১৯ মার্চ, ২০১৭

মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও এখনো সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মান কাজ অর্ধেকও শেষ হয়নি। অনেক হাওরে বাঁধ নির্মান কাজ শুরুই হয়নি এখনো।

এতে পাহাড়ি ঢল ও অকালবন্যায় নিজেদের একমাত্র ফসল বোরো হারানোর শঙ্কায় ভূগছেন হাওরপাড়ের লক্ষাধিক কৃষক। এবার আগেভাগেই বৃষ্টি শুরু হওয়ায় তাদের এ শঙ্কা আরো বেড়ে গেছে। মার্চের শুরুতেই পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে জেলার ধর্মপাশা উপজেলার ৭টি হাওরের ফসল। বাঁধ নির্মানে গাফিলতির কারণে গত বছরও অকালবন্যায় তলিয়ে যায় বেশকয়েকটি হাওরের ফসল।

সুনামগঞ্জের হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের নির্মান কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিলো ২৮ ফেব্রুয়ারি। তবে গত সোমবার সুনামগঞ্জে সংবাদ সম্মেলন করে ‘হাওর অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম’ (হ্যাপ) নামের একটি সংগঠন জানিয়েছে, কোনো হাওরেই এখন পর্যন্ত ৪০ ভাগ বাঁধ নির্মান কাজ শেষ হয়নি। জেলার ১২টি হাওরে এখনো ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ এখনো শুরু করা হয়নি।
জানা যায়, গত বছরের ১৫ ডিসেম্ভর ফসলরক্ষা বাঁধ নিমার্ণের কাজ শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু বেশিরভাগ বাঁধেরই কাজ ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাস থেকে শুরু হয়েছে।

তবে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো)’র হিসেব মতে, পিআইসির কাজ ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ এবং ঠিকাদারদের কাজ ৫০ শতাংশ শেষ হয়েছে।

পাউবো’র কর্মকর্তারা বলছেন, সুনামগঞ্জ জেলার ১১টি উপজেলার ৪২টি হাওরে এ বছর ২৩০ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে কাজ হচ্ছে ১০ কোটি ৭২ লাখ টাকার। ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজ হচ্ছে ৪৬ কোটি টাকার। পিআইসি হাওরে বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙা অংশ মেরামত করছে। আর ঠিকাদারেরা করবেন নতুন বাঁধ তৈরি ও বাঁধ উঁচু করার কাজ।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় এ বছর ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। গত নভেম্বর থেকে বোরো চাষের মৌসুম শুরু হয়। ফসল উঠবে এপ্রিল মাসে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, দিরাই, শাল্লা, জগন্নাথপুর, ধরমপাশা উপজেলার হাওরগুলোতে এখনো বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হয়নি।
বাঁধ নির্মান কার্যক্রম পর্যবেক্ষন করে এসে হ্যাপ’র যুগ্ম আহবায়ক ও নাগরিক সংহতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ শরিফুজ্জামান শরিফ বলেন, হাওরের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো সঠিক সময়ে টেকসই ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং মেরামত না করা।  ২০০১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই হাওরাঞ্চলে সাতবার  কৃষকরা তাদের সোনালী ফসল ঘরে তুলতে পারেননি। একমাত্র বোরো ফসলের উপর এ অঞ্চলের কৃষকরা নির্ভরশীল। এ অঞ্চলের কৃষি ও কৃষকের কথা বিবেচনা করে হাওর রক্ষা বাঁধের জন্য সরকার বছর বছর বরাদ্দ বাড়ালেও বাস্তবে কৃষকরা এর সুফল পান না।

জামালগঞ্জ উপজেলার হালির হাওরে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হচ্ছে। এই হাওর ঘুরে দেখা গেছে, হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ কোনোটির অর্ধেক আবার কোনোটির তার চেয়ে কম হয়েছে।

গত বছর পাহাড়ি ঢলের পানিতে হাওরের কালীবাড়ি এলাকার বাঁধ ভেঙে হালির হাওরের ফসল তলিয়ে যায়। এবার ওই স্থানে বাঁধ নির্মাণের কাজ করছে চারটি পিআইসি। এর জন্য বরাদ্দ আছে ৪৬ লাখ টাকা। চারটি পিআইসির সভাপতি হিসেবে আছেন স্থানীয় চারজন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য। কিন্তু সব কাজ করছেন দুজন ইউপি সদস্য। তাঁরা হলেন মনু মিয়া ও সুফিয়ান আহমদ। এখনো বাঁধের কাজ অর্ধেক হয়নি। বাঁধের দুই দিকে কিছু মাটি ফেলা হয়েছে। কোনো কোনো স্থানে মাটির বদলে বালু ফেলা হচ্ছে।

মনু মিয়া বলেন, পাউবো থেকে সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়ার পর ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে কাজ শুরু করেছি। কয়েক দিন বৃষ্টি থাকায় কাজে সমস্যা হয়েছে। এখন আবার পুরোদমে কাজ চলছে। তাঁর অভিযোগ, পাউবো ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো করাচ্ছে পিআইসি দিয়ে আর যেগুলো বড় কাজ ও ঝুঁকি কম, সেগুলো করাচ্ছে ঠিকাদারদের দিয়ে।

সুফিয়ান মিয়া বলেন, ৪৬ লাখ টাকার মধ্যে মাত্র ১৪ লাখ টাকা পেয়েছি। টাকার অভাবে কাজ করতে দেরি হচ্ছে। উচ্চ সুদে টাকা এনে কাজ করাতে হচ্ছে।

সাচনাবাজার ইউপি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শামীম বলেন, বাঁধের কাজে ঠিকাদারেরা বেশি গাফিলতি করছেন। প্রতিবছর বাঁধ নির্মাণে বরাদ্দ বাড়ে, কিন্তু হাওরের ফসল রক্ষা করা যায় না।

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান বলেন, গত বছর এ উপজেলার ২২টি হাওরের ১৭টিতে ফসলহানি হয়েছিল। এবারও সময়মতো বাঁধ না হওয়ায় কৃষকেরা ফসল নিয়ে আতঙ্কে আছেন।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আফসার উদ্দিন বলেন, কাজ দ্রুত শেষ করতে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, এ মাসের মধ্যেই সব কাজ শেষ হবে।

বাঁধ নির্মানে কারো গাফিলতি বা অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। এছাড়া পুরো কাজ শেষ না করলে কাউকে বিল দেওয়া হবে না বলেও জানান পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.