নবীগঞ্জ প্রতিনিধি | ২১ মার্চ, ২০১৭
নবীগঞ্জে নারীদের সৌদি আরবে পাঠানোর নামে একাধিক দালাল চক্র করছে রমরমা ব্যবসা। নানা কৌশল অবলম্বন করলেও বন্ধ হচ্ছে না মানব পাচার। প্রতিনিয়ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারীদের পাচার করা হচ্ছে। পাচারের শিকার হয়ে অনেকেই হয়ে যাচ্ছেন স্থায়ী যৌন কর্মী, আবার বহু নারীর জীবনে ভয়ানক দুর্ভোগ নেমে এসেছে।
সম্প্রতি সৌদি আরবে ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসা নবীগঞ্জ উপজেলার পল্লীর এক যুবতীর বর্ণনায় বেড়িয়ে এসেছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। তার দেয়া তথ্য মতে সৌদি আরবে হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানের ১৯ নারী এক সাথে বন্দী ছিলেন। সে উদ্ধার হয়েছে কিন্তু বাকী ১৮ জন কোথায়? কি করছেন বা কেমন আছেন? জানেন না কেউই! যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেকেই ফিরে আসছেন দেশে। তবুও বন্ধ হচ্ছেনা নারী পাচার। নবীগঞ্জের কয়েকটি নারী পাচারকারী সিন্ডিকেট রয়েছে ধরা ছোয়ার বাহিরে। মোটা অংকের টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে নারীদের সৌদি পাঠানোর কার্যক্রম চালাচ্ছেন তারা।
সূত্রে জানা গেছে, কেবল বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীরাই নয়, সৌদি নাগরিকদের বিরুদ্ধে গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগ অন্য দেশগুলোও করেছে। ২০১৬ সালে সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মীর ওপর যৌন নির্যাতনের একটি খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নিন্দার ঝড় তুলেছিল। সে গৃহকর্মীর ওপর যৌন নির্যাতন চালাতে গিয়ে স্ত্রীর কাছে হাতেনাতে ধরা পড়েন এক সৌদি নাগরিক। স্বামীর আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে সেই নারী ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। একই বছর এক ভারতীয় গৃহকর্মী তার কাজ থেকে মুক্তি চাইলে গৃহকর্তা তার ওপর হামলে পড়েন। কেবল তাই নয়, ক্ষুব্ধ হয়ে গৃহকর্তা একটি ছুরি দিয়ে ওই গৃহকর্মীর হাত কেটে ফেলেন৷
২০১৬ সালে সৌদি আরবে যাওয়া অনেক নারীই ফিরে এসেছে বাংলাদেশে। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে উঠে এসেছে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের উপর নানা ধরণের নির্যাতনের কাহিনী। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল নারী কর্মীরা সেখানে প্রতিনিয়ত যৌন নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। নির্যাতিতরা নানা কারণে তা প্রকাশ করেন না, তাদের সঙ্গে দাসের মতো আচরণ করার অভিযোগও উঠে।
সম্প্রতি নবীগঞ্জের এক নারী সৌদিতে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসে নানা অজানা তথ্য দিয়েছে। নির্যাতিত মেয়েটির নাম কল্পনা বেগম। সে হবিগঞ্জে জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের কায়স্থগ্রামের মৎস্যজীবী এবাদ আলীর কন্যা। দরিদ্র পিতা-মাতার মুখে হাসি ফুটাতে স্থানীয় দালালের খপ্পরে ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর সে গৃহকর্মীর চাকুরী নিয়ে সৌদি আরবের দাম্মামে যায়।
এরপর তার উপর শুরু হয় শারীরিক ও পাশবিক নির্যাতন। সেখানকার দালাল তাকে টাকার বিনিময়ে ৩-৪ দিনের জন্য একেকজন আরব নাগরিকের কাছে ভাড়া দেয়। তখন শুরু হয় তার উপর পাশবিক নির্যাতন। বিষয়টি টেলিফোনে মা-বাবাকে জানিয়ে তাকে উদ্ধার করার আকুতি জানায় মেয়েটি।
তার তথ্য মতে, হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানের ১৯ নারী এক সাথে বন্দী রয়েছে। তাদেরকে কয়েকদিনের জন্য একেকজন সৌদি নাগরিকের কাছে ভাড়া দেয়া হয়। মোবাইলে কথোপকথনের এক পর্যায়ে কায়স্থগ্রামের মেয়েটি তার বাবাকে বলে ‘বাবা আমাকে বাঁচাও। যেভাবে পার আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করে বাংলাদেশে নেয়ার ব্যবস্থা কর’। মায়ের সাথে কথা বলার সময় সে মাকে বলে- ‘আম্মা, আম্মাগো আমারে বাঁচাও। দালাল সেকুল আমারে অন্য দালালের কাছে বেঁচে দিয়েছে। দাম্মামে একটি ঘরে আমাদের আটকে রাখা হয়। এছাড়া একেক দিন একেক বাড়িতে পাঠানো হয়। আম্মা আমারে যদি জীবিত দেখতে চাও তাহলে তাড়াতাড়ি আমারে দেশে নেয়ার ব্যবস্থা করো।’ টানা ৩১ মিনিটের ওই টেলিফোন কথাবার্তায় বেশির ভাগ সময়ই কল্পনা হাউ মাউ করে কেঁদেছেন। আর তাকে উদ্ধারের আকুতি জানান।
এই মোবাইল রেকর্ডিং নিয়ে কল্পনার মা-বাবা যান হবিগঞ্জ সিলেট সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া চৌধুরী কেয়ার কাছে। অতঃপর এমপি কেয়া চৌধুরীর প্রচেষ্টায় সিআইডি পুলিশ সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে কল্পনাকে উদ্ধার করে। সেই সাথে ঢাকা নয়াপল্টন এলাকার গ্রীণ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল লি. ট্রাভেল এজেন্সি থেকে দালাল চক্রের ৩ সদস্যকে আটক করা হয়। বর্তমানে উদ্ধারকৃত কল্পনা তার মা-বাবার কাছে আছে। সেখান থেকে আসার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কল্পনা নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে।
এছাড়াও উপজেলার দিনারপুরের স্বপ্না নামের ২০ বছর বয়সী এক যুবতী দালালের পাল্লায় পড়ে লেবানন গিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ রয়েছে। কেমন আছে বা কি করছে এই খবরটুকুই তার মা-বাবাকে দিতে পারছেনা কেউ। এ ঘটনায় ফেব্রুয়ারি মাসে মামলা দায়েরের প্রেক্ষিতে এক দালাল ও তার পিতাকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে নবীগঞ্জ থানা পুলিশ।
এদিকে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনার পর কিছু দিন মানবপাচারকারী চক্রটি আত্মগোপন করে পালিয়ে বেড়ায়। কিছু দিন মানব পাচার বন্ধ থাকলেও স্থানীয় দালালরা ফের শুরু করেছেন তাদের অপতৎপরতা। নবীগঞ্জ উপজেলার দিনারপুরসহ বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় দালালরা, বেকার নারীদের সোনালী স্বপ্ন এবং মোটা অংকের টাকা আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সৌদি আরবে পাঠানোর নামে প্রতারণা করে আসছেন। তারা ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে নারীদের পাঠান সৌদি আরব। সৌদি আরবে যারা রয়েছেন তাদের সাথে পরামর্শ করে বয়স যতো দেওয়া প্রয়োজন তা দিয়ে তৈরি করছেন পাসপোর্ট। এভাবে সৌদি আরব গিয়ে নানা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন গ্রাম গঞ্জের বিভিন্ন গৃহবধূসহ নারীরা।
সচেতন সমাজের নাগরিকদের ভাষ্য, দেশে নারী পাচারের আইন থাকলেও এর প্রয়োগ হচ্ছে না। যদি কোন স্থানীয় দালালদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে নতুন দালালদের সৃষ্টি হতো না।
এ প্রসঙ্গে নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা নারী উন্নয়ন ফোরামের সভাপতি নাজমা বেগম বলেন, নারী পাচার হচ্ছে এক ধরনের সহিংসতা। নারী পাচারের ফলে বিদেশে নারীরা শারীরিক মানবিক এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নারী পাচার রোধে আইন হয়েছে কিন্তু আইনের কার্যকারিতা পরিলক্ষিত হচ্ছেনা বলেও জানান তিনি।
এ ব্যাপারে নবীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ এস.এম আতাউর রহমান বলেন, নারী পাচারের বিষয়ে অভিযোগের প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নবীগঞ্জে মানব পাচারকারী কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ইতিমধ্যে একাধিক মানবপাচারকারী চক্রকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।'
ওসি আরো বলেন, সচেতনতাই পারে নারী ও শিশু পাচার বন্ধ করতে। এজন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে গণমাধ্যমকে।
এ ব্যাপারে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তাজিনা সারোয়ার বলেন, নারী ও শিশু পাচার একটি জঘন্য অপরাধ এবং পাচারের ফলে নারী ও শিশুরা চরম নির্যাতনের শিকার হয়। আর পাচার হওয়া শিশু বাধ্যতামূলক শ্রম, নারীরা গৃহপরিচারিকা ও যৌন কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাই মানব পাচার রোধে সকলকে সচেতন থাকতে হবে।
ইউএনও আরো বলেন, সুখী, সমৃদ্ধ ও সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে সর্বক্ষেত্রে সকল শিশুকে পূর্ণ মর্যাদাবান মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার নানাবিধ প্রকল্প হাতে নিয়েছে।