Sylhet Today 24 PRINT

উৎসমুখ ভরাট হয়ে অস্তিত্ব সঙ্কটে সুরমা

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ২২ মার্চ, ২০১৭

ভরাট হয়ে পড়েছে দেশের দীর্ঘতম নদী সুরমার উৎসমুখ। ফলে বছরে আট মাসই পানি থাকে না এই নদীতে। এছাড়া উৎসমুখ থেকে প্রথম ৩২ কিলোমিটারে সুরমা নদীতে জেগেছে ৩৫টি চর।

এতে বিপাকে পড়েছেন নদী তীরবর্তী মানুষ। নদীর গতিপথ বদলে যাওয়াসহ কৃষিখাতেও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। স্থানীয় এলাকাবাসী ও পরিবেশকর্মীরা দীর্ঘদিন থেকেই এই নদী খননের দাবি জানিয়ে আসছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারাও মনে করেন, দ্রুত এই নদীর উৎসমুখ খনন করা প্রয়োজন। তবে সীমান্ত নদী হওয়ায় যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে এই নদী খনন করতে হবে বলে জানান তারা।

ভারতের মনিপুর থেকে আসা বরাক নদী সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্তের অমলসীদ নামক এলাকায় সুরমা ও কুশিয়ারা নামে বিভক্ত হয়েছে। সুরমা নদী প্রায় ২৫০ কিলোমিটার ও কুশিয়ারা ১২০ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে আবারো এক সাথে মিলিত হয়ে রূপ নেয় মেঘনায়।

নদীর গতি প্রকৃতিতে কুশিয়ারায় তেমন পরিবর্তন না এলেও সুরমায় অনেকটাই সংকটাপন্ন।  বরাক নদীর স্রোতধারা সরাসরি কুশিয়ারা নদীতে যায়। ফলে কুশিয়ারায় সারা বছরই পানি বহমান থাকে। আর মোহনা বা উত্স মুখে পলি আর বালি জমে চর পড়ায় সুরমা নদীতে পানির স্রোত সরাসরি প্রবেশ করতে পারেন শুকনো মৌসুমে। মোহনায় প্রায় ১৮০ ডিগ্রি বাঁক নিয়ে সুরমার দিকে পানি প্রবাহ থাকায় বছরে প্রায় ৮ মাসই সুরমা নদীতে প্রবেশ করে না বরাকের পানি।   

নদীতীরবর্তী মানুষদের জীবিকারও অন্যতম উৎস এ নদী। পানিশূন্য হয়ে পড়ায় নদী তীরবর্তী জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, সিলেট সদর, গোলাপগঞ্জ উপজেলার কৃষিজীবী ও মৎস্যজীবী মানুষেরা পড়েছেন বিপাকে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, উৎসমুখ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষকালে বরাক থেকে আসা পানির ৫ থেকে ১০ শতাংশ সুরমায় প্রবেশ করে। আর অন্যন্য মৌসুমে কোনো পানিই প্রবেশ করে না। সব পানি চলে যায় কুশিয়ারায়। ফলে বছরের প্রায় আট মাসই পানিশূন্য থাকে সুরমা। এই সময়কালে কানাইঘাটের লোভা পর্যন্ত পুরো নদী মরে যায়।

সুরমার উৎসমুখ দ্রুত খনন করা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করছি। কিন্তু এই নদী ভারত থেকে এসেছে এবং প্রথম ২৫ কিলোমিটার সীমান্ত লাইন দিয়ে গেছে। ফলে নদী খননের জন্য যৌথ নদী কমিশন থেকে উদ্যোগ নিতে হবে।

এদিকে, পানিশূন্যতার কারণে জকিগঞ্জের আমলসীদ থেকে কানাইঘাট উপজেলার ৩২ কিলোমিটার এলাকায় জেগে উঠেছে ৩৫টির চর জেগে উঠেছে। এসব চর দিয়ে শুষ্ক মৌসুমে পায়ে হেঁটেই নদী পার হন স্থানীয় লোকজন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক ও সুরমারিভার ওয়াটারকিপার আব্দুল করিম কিম বলেন, শুষ্ক মৌসুমে সুরমা নদীতে যে সামান্য পানি দেখা যায় তা বরাক থেকে আসে না। এগুলো লোভা নদীর পানি। সুরমা কানাইঘাটে এসে লোভার সাথে মিশেছে। পানি না থাকায় বালি জমে সুরমা নদীতে জকিগঞ্জ থেকে কানাইঘাট পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটারে ৩৫ টি চড় জেগেছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ৭/৮ বছর ধরেই সুরমার উৎসমুখ ভরাট হওয়া শুরু হয়েছে। গত ২/৩ বছর ধরে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। একসময় সুরমা মরা গাঙে পরিণত হবে।

তিনি জানান, গত ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবসে অমলসীদে বরাক, সুরমা ও কুশিয়ারার মোহনায় মানববন্ধন ও সমাবেশ করে বাপা। স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে নিয়ে আয়োজিত এ কর্মসূচী থেকে সুরমার উৎসমুখ খননের দাবি জানানো হয়।

জকিগঞ্জের বারোঠাকুরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহসিন মর্তুজা চৌধুরী বলেন, নদী পানিশূন্য হয়ে পড়ায় এই অঞ্চলের কৃষিজীবী ও মৎসজীবীরা বিপাকে পড়েছেন। কমে এসেছে ফসল উৎপাদন। সেচের অভাবে অনেক জমিতেই এখন উৎপাদন হয় না।

তিনি বলেন, শুষ্ক মৌসুমে পানি পাওয়া যায় না আবার তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে কয়েকদিনের বৃষ্টিতেই নদী ভরাট হয়ে বন্যা দেখা দেয়। এছাড়া উৎসমুখে পলি জমায় দিন দিন নদীর গতিপথও পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি দ্রুত সুরমা নদীর উৎসমুখ খননের দাবি জানান।

এ ব্যাপারে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ড. নাজমানারা খানুম বলেন, আমরা জানি দেশের বৃহত্তম নদীগুলোর একটি সুরমা। সুরমার নদীটি দীর্ঘতম নদী হওয়া এর দু'কুল ঘেষে গড়ে উঠেছে অনেক গ্রাম গঞ্জ নগর বন্দর। এর সাথে মিশে রয়েছে ইতিহাস ঐতিহ্য। সুতরাং নদীটির উত্স মুখ খনন করার উদ্দ্যোগ নেয়া হবে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে বিষেশজ্ঞদের মতামত নিয়ে বিজ্ঞানসম্মতভাবে খনন প্রক্রিয়ার জন্য সিলেট বিভাগীয় প্রশাসন উদ্দ্যোগ নেবে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.