নিউজ ডেস্ক | ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৪
একের পর এক বগি খুলে নেওয়া হচ্ছে সিলেট-ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী আন্ত:নগর ট্রেনগুলো থেকে। সীমাহীন দুর্ভোগে রয়েছেন সিলেটের ট্রেনের যাত্রীরা। আন্ত:নগর ট্রেনের বরাদ্দের ৭৫টি বগি থেকে ১৩টি বগি কম রয়েছে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে। যে কারণে টিকেট-সংকট বর্তমানে চরম আকার ধারণ করেছে। পর্যাপ্ত বগি না থাকায় যাত্রীদের টিকেট সরবরাহ করতে না পেরে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার ফেরারির মতো পালিয়ে বেড়ান। ঠিকমতো নিজের অফিস কক্ষে বসতে পারেন না। টিকেটের জন্য কাউন্টারের সামনে শতাধিক মানুষ জট বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকেন। সিলেটে বগি সংকটের চিত্র বার বার গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও কার্যত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বরং সংকট আরো ঘনিভূত করা হচ্ছে। যে কারণে প্রশ্ন উঠছে- কার স্বার্থে সিলেটের ট্রেনব্যবস্থাকে এমন নাজুক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? কেউ কেউ মনে করছেন- একটি মহল ট্রেনের অচলাবস্থা তৈরি করে নিজেদের পরিবহণ সেক্টরকে সুদৃঢ় করতে পরিকল্পিতভাবে সিলেটের ট্রেনব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে সিলেটের ট্রেনব্যবস্থার মারাত্মক ক্ষতিসাধন হতে পারে। এমন আশংকা করছেন এর সাথে সংশ্লিষ্টরা। অনুসন্ধানে জানা যায়- সিলেট-ঢাকা রুটে ৪টি এবং সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে ২টি মিলে মোট ৬টি আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেনের মধ্যে কালনি-১০টি, জয়ন্তিকা-১৩টি, উদয়ন-১৩টি, পারাবত-১৩টি, উপবন-১৩টি ও পাহাড়িকা ১৩টি বগি নিয়ে সিলেট রুটে যাত্রা শুরু করে। মোট ৭৫টি বগি নিয়ে আন্তঃনগর ট্রেনগুলো সিলেট-ঢাকা, সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে চলাচল করলেও বর্তমানে রয়েছে ৬২টি বগি। রেলওয়ের বর্তমান ট্রেন কম্পোজিশন বরাদ্দ ঘেটে দেখা যায়, সিলেট রুট থেকে খুলে নেওয়া হয়েছে ১৩টি বগি। যা একটি ট্রেনের সমান। অর্থ্যাৎ একটি ট্রেন সিলেট রুটে কম চলাচল করছে। কেটে নেওয়া বগির মধ্যে রয়েছে-কালনি-৫টি, জয়ন্তিকা-৩টি, উদয়ন-২টি, পারাবত-১টি, উপবন-১টি ও পাহাড়িকার ১টি বগি। সর্বশেষ গত ২৪ নভেম্বর সিলেট থেকে উদয়নের ১ম শ্রেণির একটি বগি খুলে নেওয়া হয়। সিলেটের কৃতি সন্তান সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সিলেট রুটে ট্রেনের অচলাবস্থা দূর করতে ২০১২ সালে চালু করেন ‘কালনী এক্সপ্রেস’ নামে একটি নতুন ট্রেন। সিলেটের মন্ত্রী হওয়ায় সিলেট বিদ্বেষীরা বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি। তাই রেল মন্ত্রণালয় থেকে তিনি সরে দাঁড়ানোর পর সেই কালনীর ৫টি বগি খুলে নেওয়া হয়। এটা সিলেটবাসীর জন্য চরম বৈষম্য বলে মনে করছেন সিলেটের মানুষ। রেলের সাথে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন রুটে একটি ট্রেন ১৭টি বগি নিয়ে চলাচল করে। রেলওয়ের নিয়ম মোতাবেক একটি ট্রেন সর্বোচ্চ ২৭টি বগি দিয়ে চলাচলের বিধান রয়েছে। কিন্তু সিলেটে সর্বোচ্চ ১৩টি বগি নিয়ে আন্তঃনগর ট্রেনগুলো চলাচল শুরু করে। কিন্তু আজ সেই অবস্থায়ও নেই সিলেট রেলওয়ে। ক্ষুব্ধ সিলেটবাসী মনে করছেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে বগির সংখ্যা বাড়ার কথা, সেখানে একটার পর একটা বগি খুলে নেওয়া হচ্ছে। তবে এর জন্য সিলেটের রাজনীতিবীদদের উদাসীনতাকে দায়ি করা হচ্ছে। অভিভাবকের দায়িত্বে যারা আছেন, তারা এ বিষয়টি নিয়ে উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছেন বলেই মনে করছেন অনেকে। সিলেট রেলওয়েতে কেবল বগি সংকটই নয়, করুণ অবস্থা বিদ্যমান বগিগুলোর ভিতরও। পারাবত-উদয়নের মতো ট্রেনে কোন এয়ার কন্ডিশন (এসি) নেই। উপবনে আছে, তাও ঠিকমতো কাজ করে না। যাত্রীরা এসি টিকেট কিনে প্রতারিত হচ্ছেন। কেবিন সংকট প্রকট। চেয়ারগুলো ভাঙাচোরা, অনেক চেয়ারের হাতল নেই। সবগুলোতে ছারপোকা ধরে আছে। টয়লেটের অবস্থা অপরিচ্ছন্ন। টেপ আছে, কিন্তু টয়লেটে ঢুকে পানি পাওয়া যায় না। অথচ সিলেটে ট্রেনের টিকেটের চাহিদা আকাশছোঁয়া। সিলেট থেকে রেভিনিউও যাচ্ছে বেশি। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬ লাখ টাকা রেভিনিউ যায় সরকারের কোষাগারে। প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটে প্রবাসীদের যাতায়াতে ট্রেনের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তারপরও সিলেটের ট্রেনব্যবস্থা দিন দিন নি¤œগামী। ট্রেনব্যবস্থার প্রতিটি স্তরের অবস্থা অত্যন্ত বেহাল। ট্রেনের ভিতরে যেনো ঘুনপোকায় ধরেছে। প্রথম শ্রেণি (এসি) থেকে শুরু করে শোভন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে চরম অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। এ ব্যাপারে সিলেট রেলওয়ের স্টেশন ম্যানেজার মো. আব্দুর রাজ্জাক জানান, চরম বগি সংকটে রয়েছে সিলেট। ছুটির মৌসুম থাকায় কোনভাবেই টিকেটের সংকুলান করতে পারছি না। যাত্রীরা উত্তেজিত হয়ে উঠে। দরজার সামনে শ’ দেড়শ’ লোক এসে দাঁড়িয়ে থাকে। অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ সামলানো বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ সময়সূচি নাম্বার ৫০ মোতাবেক প্রতিটি ট্রেনে যে বগি বরাদ্দ দেওয়া আছে, চাহিদার প্রেক্ষিতে তা দ্বিগুণ করা আবশ্যক। অন্যথায় যাত্রী পরিবহণ স্বাভাবিক হওয়া সম্ভব নয়।