Sylhet Today 24 PRINT

চার কারণে মরছে হাওরের মাছ, দাবি বিশেষজ্ঞদের

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ২২ এপ্রিল, ২০১৭

সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মাছের মৃত্যুর জন্য চারটি কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা অধিদপ্তর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি প্রতিনিধি দল শনিবার সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরের পানি পরীক্ষা করে পানি দূষণ ও মাছ মৃত্যুর চারটি কারণ চিহ্নিত করেন।

এর মধ্যে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা অধিদপ্তর মাছের মড়কের জন্য প্রাথমিকভাবে তিনটি কারণ শনাক্ত করেছে। এগুলো হলো- পানিতে অক্সিজেন কমে যাওয়া, অ্যামোনিয়া গ্যাস বেড়ে যাওয়া ও অ্যাসিডিটির প্রভাব।

অপরদিকে, মাছ ও হাঁসের মড়কের জন্য ফসলের মাঠে ব্যবহার করা কীটনাশকও একটি কারণ বলে মনে করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা দল। তারা বলছে, বন্যার পানি ফসলের মাঠ ডুবিয়ে দেয়ায় এই কীটনাশক ও এসিড ছড়িয়ে পড়েছে।

যদিও পরিবেশবাদীরা দাবি করেছেন, সীমান্তের অপারে ভারতের মেঘালয়ে অপরিকল্পিতভাবে ইউরেনিয়াম উত্তোলনের প্রভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে হাওরের পানি। শনিবার দুপুরে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক মানববন্ধন কর্মসূচী থেকেও এমন আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে এখন পর্যন্ত ৫০ মেট্রিক টন মাছ মরে গেছে বলে জানিয়েছেন শুক্রবার জানিয়েছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সৈয়দ মেহেদী হাসান।

এরপরদিন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা অধিদপ্তরের একটি প্রতিনিধিদল সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরের পানি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এসব কারণ চিহ্নিত করেন।

হাওরে মাছের মড়কের কারণ খুঁজে বের করতে মৎস্য অধিদপ্তরের তিন সদস্যের গবেষকদল শুক্রবার পানি পরীক্ষা করতে আসেন। তারা সুনামগঞ্জের খরচার হাওর, দেখার হাওর, মাটিয়ান হাওরসহ ছোটখাটো হাওরের বিভিন্ন জায়গা থেকে পানির নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করেন। তাতে অক্সিজেনের উপস্থিতি কম দেখতে পান তারা। সেই সঙ্গে অ্যামোনিয়া গ্যাস বেড়ে যাওয়া ও অ্যাসিডিটির প্রভাবে মাছ ও জলজ প্রাণীর মৃত্যু হচ্ছে বলে তাদের ধারণা। তবে, ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার পর প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলে  জানান গবেষকদল।

পরীক্ষার পর প্রাথমিকভাবে গবেষকরা জানান, হাওরের পানিতে ধানের পচনে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে। যেখানে থাকার কথা ৪ থেকে ৫ পয়েন্ট অক্সিজেন, সেখানে আছে মাত্র ৩.৫ পয়েন্ট। এর প্রতিকার কীভাবে করা যাবে তা আরো গবেষণার পর বলা যাবে বলে জানান তারা।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা অধিদপ্তরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন খান বলেন, পানিতে অক্সিজেনের ব্যাপক ঘাটতি আছে। মাছের শ্বাসকষ্ট হতে পারে এটা থেকে। ফলে মাছ মারা যাচ্ছে। এ ছাড়া পানিতে অ্যামোনিয়া গ্যাসের আধিক্য পাওয়া গেছে। এটাও মাছের মৃত্যুর একটা কারণ হতে পারে।

গবেষকদলের পরীক্ষায় পানিতে অ্যামোনিয়া গ্যাস শনাক্তের সঙ্গে সঙ্গে অ্যাসিডিটির উপস্থিতিও লক্ষ করা গেছে, যা মাছের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক।  

যে তিন কারণের কথা বলেছে গবেষকদল সেটিই চূড়ান্ত নয়। আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেব তারা। মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা  বলেন বলেন, ‘মাছের নমুনা ও পানি আমরা ল্যাবরেটরিতে নিয়ে যাচ্ছি। আরো বিষদভাবে পরীক্ষা করে দেখব। তখন আমরা চূড়ান্তভাবে বলতে পারব মাছ মরার সঠিক কারণটা কী।’

গবেষক প্রতিনিধিদলের অন্য দুই সদস্য হলেন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. ইশতিয়াক হায়দার রাসেল ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আশিকুর রহমান।

অপরদিকে, সুনামগঞ্জের হাওরে মাছ ও জলজপ্রাণীর অস্বাভাবিক মড়কের কারণ খতিয়ে দেখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের একটি দল শনিবার সকালে তাদের কাজ শুরু করে। এ সময় তারা এই মত প্রকাশ করেন।

দলটি সারাদিনই বিভিন্ন হাওরের পানি পরীক্ষা করবেন। দাকার হাওরে সকাল আটটায় পানি পরীক্ষা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আজমল হোসেন ভূঁইয়া জানান, অন্যান্য এলাকা থেকেও এসিডিটি ও কীটনাশক পানির সঙ্গে আসতে পারে বলে মনে করছেন তিনি। যার ফলে মাছের মড়ক দেখা দিছে।

দলটির আরেক সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মনিরুজ্জামান খন্দকার জানান, ধানের পচা দুর্গন্ধ থেকে মানুষের শরীরে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে এটা সাময়িক।

দলটি আরও জানিয়েছে, বিশ্ব ঐতিহ্য টাঙ্গুয়ার হাওরে মাছ ও জলজ প্রাণী মারা গেলেও অন্য হাওরের তুলনায় তা কম। তবে হাওরের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

গত তিন দিন ধরে বিভিন্ন গবেষকরা একাধিক হাওর পরিদর্শন করে জানিয়েছে অ্যামোনিয়া গ্যাস বৃদ্ধি, অক্সিজেন ও ক্ষারের অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় মাছ মারা যাচ্ছে এবং পানি দূষিত হচ্ছে।

শুক্রবার থেকে হাওর এলাকায় শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টি এখনও পুরোপুরি থামেনি। বন্যা আক্রান্ত জনপদের বাসিন্দারা এতে ভীত হয়ে উঠলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা দলটি বলছে এই বৃষ্টি পানির দূষণ দূর করে দিতে পারে।

এদিকে, শনিবার সকালে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পরিবেশবাদীদের উদ্যোগে ‘উৎকণ্ঠিত নাগরিক জমায়েত’-এর আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেট শাখা ও সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই নাগরিক জমায়েতে স্বাগত বক্তব্যে বাপা-সিলেট শাখার সাধারন সম্পাদক  ও সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার আব্দুল করিম কিম বলেন, উত্তর-পূর্ব ভারতের খাসিয়াহিলে অপরিকল্পিত খনিজ উত্তোলনের ফলে বিগত কয়েক বছরে সেখানকার নদী ও জলাশয় দূষণের অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন সংবাদ মেঘালয় ও আসামের মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে । গত ফেব্রুয়ারিতে খাসি স্টুডেন্ট ইউনিয়ন (কেএসইউ) উত্তর-পশ্চিম মেঘালয়া সংবাদ সম্মেলন করে খাসিয়াহিলে ইউরেনিয়াম উত্তোলনের ফলে রেনিকা নদীতে ব্যাপকভাবে মাছ ও জলজপ্রাণ মড়কের অভিযোগ করে।

তিনি বলেন, এই রেনিকা নদীর পানি আমাদের কংস ও জাদুকাটা নদী হয়েই বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ফলে এখানে মাছ মৃত্যুর পেছনে ইউরেনিয়াম উত্তোলনের প্রভাব থাকতে পারে।

এ আয়োজনে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি ও কেমিস্ট্রি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. মেহেদী হাসান খান বলেন, সিলেট অঞ্চলের উজান এলাকা হচ্ছে ভারতের উত্তরপূর্ব এলাকা। সেখানে পরিবেশ বিধ্বংসী কোনো কার্যক্রম চললে ভাটি তথা সিলেট অঞ্চলে ক্ষতিকর প্রভাব সবার আগে পড়বে। কয়লা ও ইউরেনিয়াম খনি থেকে নিগর্ত এসিডে মেঘালয়ের বিভিন্ন নদীর দূষণের খবর পাওয়া গেছে । পানি বিবর্ণ হয়েছে। দূষণের কারনে সেখানে জলজ প্রাণীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এখানের পানিতে সেই দূষণ পৌঁছেছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.