Sylhet Today 24 PRINT

মাধবপুরে পরীক্ষামূলক ভুট্টা চাষে সফল মামুন মিয়া

মাধবপুর প্রতিনিধি |  ২৪ এপ্রিল, ২০১৭

ভুট্টা চাষের কথা কখনোই ভাবেননি কৃষক মামুন মিয়া। কারণ ভুট্টা চাষের কোনো অভিজ্ঞতাই তার ছিল না। তাছাড়া তার এলাকায় আগে কেউই ভুট্টা চাষ করেন নি। ফলে এ ফসল চাষ করে আদৌ সফল হওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে মনে অনেক সংশয় ছিল।

কিন্তু তার সব ভুল ভেঙে দেন উপ সহকারি কৃষি অফিসার অর্ধেন্দু দেব অসিত। তিনি তাকে ভুট্টা চাষ করতে শুধু উৎসাহিতই করেননি, কিভাবে ভুট্টা চাষ করতে হয় সে পরামর্শ দেয়া থেকে শুরু করে কৃষি বিভাগ থেকে বীজ, সারসহ বিভিন্ন সহযোগিতা এনে দিয়ে উদ্বুদ্ধ করেন। ফলে প্রথমবার পরীক্ষামূলক ভুট্টা চাষ করেই সফল হয়ে যান এ কৃষক।

কৃষক মামুন মিয়ার বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার চৌমুহনী ইউনিয়নের জয়পুর গ্রামে। বাড়ির পাশেই ভুট্টা চাষ করেছেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে মামুন মিয়ার ভুট্টা চাষের খবর জেনে সরেজমিনে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, তার সুদীর্ঘ ক্ষেতে শুধু ভুট্টা আর ভুট্টা। প্রায় ৮ ফুট লম্বা প্রতিটি ভুট্টা গাছেই ফলন হয়েছে। একেকটি গাছে ২ থেকে ৪টি পর্যন্ত ভুট্টা দেখা গেছে। সবুজ গাছে হালকা হলদে ভুট্টাগুলো প্রকৃতিকে যেন এক অপরূপ সুন্দর রঙে সাজিয়ে দিয়েছেন। ক্ষেতেই কথা হয় সফল এ ভুট্টা চাষির সাথে।

কৃষক মামুন মিয়ার প্রতিবেদককে বলেন, চাষাবাদের সাথে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত থাকলেও কখনো ভুট্টা চাষ করব এটা ভাবিনি। কারণ, ভুট্টা চাষের কোনো ধারণাই আমার ছিল না। কিন্তু গত  বছরে নভেম্বরে একদিন হঠাৎই ফোন করেন ব্লকের দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারী কৃষি অফিসার অর্ধেন্দু দেব অসিত। তিনি আমাকে ভুট্টা চাষের জন্য প্রস্তাব দেন এবং বলেন আমার জমিতে একটি ভুট্টার প্রদর্শনী কেন্দ্র করলে কৃষি অফিস সার্বিক সহযোগিতা করবে। মনে সংশয় থাকলেও তার কথায় সাহস পেয়ে রাজি হয়ে যাই।

পরে কৃষি অফিস থেকে ৪ কেজি বীজ, ৬২ কেজি সার ও পরিচর্যার জন্য এক হাজার টাকা পাঠানো হয়। ২০ ডিসেম্বর আমার ৫০ শতক আয়তনের জমিতে প্রদর্শনীর জন্য সুপার সাইন ২৭৬০ প্রজাতির ভুট্টা বপন করেছি। তারপর মাধবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আতিকুল হক, উপ সহকারী কৃষি অফিসার অর্ধেন্দু দেব অসিত এবং কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের পরামর্শ মতো নিয়মিত পরিচর্যা করতে থাকি। মাঝে পোঁকার উপদ্রব হয়েছিল। কিন্তু কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে ক্ষেত এখন পোকার উপদ্রবমুক্ত হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, নিজে পরিচর্যা করার পাশাপাশি মাঝে মাঝে দিনমজুর দিয়েও কাজ করাই। নিবিড় পরিচর্যায় গাছগুলো বড় হতে থাকে। বর্তমানে প্রতিটি গাছেই ভুট্টার ফলন আছে।

কৃষক মামুন মিয়া আরও বলেন, এখন ফলন তোলার সময় হয়ে এসেছে। আগামী ২০/২৫ দিনের মধ্যেই ভুট্টা তোলা যাবে বলে ধারণা করছি। কৃষি বিভাগ থেকে বীজ, সার ও অন্যান্য সহযোগিতা দেয়ার পরও আমার নিজ থেকে আরো ৭-৮ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। তবে যা ফলন হয়েছে তাতে লাভের ব্যাপারে আমি আশাবাদী। তাই আমাদের এ ভুট্টা প্রথমে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে চাহিদা পূরণ করা হবে। পরে অতিরিক্ত থাকলে অন্যত্র রপ্তানি করব।

বাজারে প্রতিটি ভুট্টা খুচরা মূল্যে ১৫/১৬ টাকায় বিক্রি হয়। এ মূল্যে বিক্রি হলে কৃষকরা অবশ্যই লাভবান হবেন বলে তিনি মনে করেন।

একই ইউনিয়নের গোপীনাথপুর গ্রামের বদু মিয়া, শাহীন মিয়া ও জসীম, আ: সবুর, মাহতাব উদ্দিন সুমন এবার ভুট্টার চাষ করেছেন। বাম্পার ফলন হয়েছে তাদের জমিতেও।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কৃষক শাহীন বলেন, কৃষি বিভাগ ভুট্টা চাষে পরামর্শ ও সহযোগিতা দেবে জেনে আমিও ৩৩ শতক জমিতে ভুট্টার চাষ করেছি। এ জমিতে ২ কেজি মতো বীজ বপন করা হয়েছে। এছাড়া সার, কীটনাশক, শ্রমিক মজুরিসহ অন্যান্য মিলিয়ে আমার ৭/৮ হাজার টাকার মত খরচ পড়েছে।

তিনিও প্রথম দিকে ফলন কেমন হবে তা নিয়ে সংশয়ে থাকলেও পরে প্রতিটি গাছে ভুট্টা দেখে মুগ্ধ। এখন তার মনে হচ্ছে সব কষ্টই সার্থক হয়েছে।

তবে কৃষক মামুন মিয়া এবং শাহীন মিয়া দু’জনই দাবি করেন আবহাওয়া, প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুকূলে থাকলেও ভুট্টা চাষের জন্য পর্যাপ্ত পানি ঐ এলাকায় নেই। ফলে বাইরে থেকে পানি এনে ক্ষেতে দিতে গিয়ে খরচ কিছুটা বেড়ে গেছে। কিন্তু মধ্যখানে কিছু বৃষ্টি হওয়ায় তাদের পানি সংকট কমেছে। নইলে পানির জন্য আরো অনেক কষ্ট করতে হতো।

তারা দাবি করেন এলাকায় ক্ষেতে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হলে ভুট্টাচাষীরা যেমন উপকৃত হবে তেমনি উপকৃত হবেন অন্য চাষিরাও।

তাদের দাবি যে মিথ্যা নয় তা স্বীকার করে চৌমুহনী ব্লকের দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা অর্ধেন্দু দেব অসিত ও ব্লকের দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা অর্ধেন্দু দেব অসিত বলেন, মামুন, বদু মিয়া, শাহীন মিয়া, জসীম, আ: সবুর, মাহতাব উদ্দিন সুমন, সরকারি প্রদর্শনীর জন্য কৃষি জমিতে ভুট্টার চাষ করেছেন। এছাড়া তাদের অনুসরণ করে আরো কিছু কিছু কৃষক ভুট্টা চাষ করেছেন। আমরা সবাইকে পরামর্শ ও কৃষি উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করেছি। আমাদের পরামর্শ মেনে চাষ করায় সব কটি জমিতে বাম্পার ফলন হয়েছে। যা ফলন হয়েছে তা তোলা হলে হেক্টর প্রতি ৭/৮ টন হবে বলে তিনি ধারণা করছেন।

তাঁরা আরো বলেন, ভুট্টার কোনো অংশই ফেলার নয়। ভুট্টা যেমন খাবার হিসেবে বিক্রি হয় তেমনি এর থেকে পাওয়া বিভিন্ন অংশ, গো-খাদ্য, মুরগির খাদ্য, জ্বালানিসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। ফলে যারা ভুট্টার চাষ করছেন সবাই লাভবান হবেন।

এদিকে এ দুই কৃষক ছাড়াও এবার আরো ১৬ জন কৃষক সাড়ে ৬০ একর জমিতে ভুট্টার চাষ করেছেন জানিয়ে মাধবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আতিকুল হক প্রতিবেদককে বলেন, কৃষকদের চেষ্টা ও আমাদের আন্তরিকতায় সবকটি জমিতে প্রথম চাষেই বাজিমাত করেছেন কৃষকরা। তাদের এ ফলন দেখে আগামী দিনে আরো বহু কৃষক ভুট্টা চাষে এগিয়ে আসবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.