Sylhet Today 24 PRINT

‘ইলা দূর্গতি আমরার জীবনে আইছে না’

তপন কুমার দাস, বড়লেখা |  ২৪ এপ্রিল, ২০১৭

বাবারে সংসারে দুর্ভিক্ষ লাগি গেছে। ইলা দূর্গতি আমরার জীবনে আইছে না। রুজি-রোজগারেরও কোন উপায় নাই। বড় কষ্টে আছি আমরা। সামনে রোজা মাস কিলা চলতাম। ঘরের ভাতে বছর চলত। এখন চাউল কিনিয়া করিয়া খাওয়া লাগের। আল্লায় জানইন আমরার কপালে কিতা আছে। আল্লায় কি কঠিন পরীক্ষায় পালাইলা আমরারে! চোখের সামনে আমরার ২৫ কিয়ার ধান ডুবি গেল। একমুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারলাম না।

সোমবার (২৪ এপ্রিল) হাকালুকি হাওর পারের হাল্লা এলাকার হাওরে সব হারিয়ে নিঃস্ব কৃষাণী রেনু বেগম এ কথাগুলো বলছিলেন।

একই এলাকার কৃষাণী বেগম ক্ষোভের সাথে জানালেন, সরকার চাউল দিলে নেতা হকলে মারিয়া (লুট করে) নেইন গিয়া। আমার ভাগে ইতা সাহায্য পড়ে না। এখন পর্যন্ত কোন সরকারি সাহায্য পাইলাম না।

চলতি বছরে অকাল বৃষ্টি ও আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহ এলাকার হাওরাঞ্চলের বিস্তির্ণ কৃষিভূমির বোরো ধান। তবে ধানের ক্ষতির পর হাওরাঞ্চলের দ্বিতীয় সম্বল মাছও সম্মুখীন হয় দুর্যোগের। হাকালুকি হাওরে সারা বছরের সম্বল ধানের পর মাছের মড়কে হাওর পারের হাজার হাজার কৃষক ও জেলে পরিবারে এখন চলছে হাহাকার।

গত এক সপ্তাহ ধরে হাওরে মাছ শিকারে না যাওয়ায় এসব জেলে পরিবারগুলো অনেকটা না খাওয়ার মতোই জীবন যাপন করছেন। সাথে সংকট দেখা দিয়েছে গো-খাদ্যের। গো-খাদ্যের সংকটে অনেকে কম দামে গোয়ালের গরুটিও বিক্রি করছেন। কেউ-বা বিক্রি করছেন ঋণের দায়ে।

হাওরপারে এ যেন নীরব দুর্ভিক্ষের অশনি সংকেত। এরকম আভাস পাওয়া গেল স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে। এবারের অকাল বন্যায় বড়লেখার হাকালুকি হাওর পার এলাকায় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন প্রায় ৪ হাজার ১২০ কৃষক ও ১০ হাজার জেলে পরিবার। সব হারিয়ে নিঃস্ব কৃষক পরিবারগুলো এ বছর পরিবারের জীবন-জীবিকা নিয়ে উদ্বিগ্ন।

সোমবার (২৪ এপ্রিল) সরেজমিনে হাকালুকি হাওরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা। এদিন হাকালুকি হাওর পারের দূর্গত এলাকা পরিদর্শনে আসেন ঢাকাস্থ মৌলভীবাজার ও বড়লেখা সমিতির নেতৃবৃন্দ। হাওর অঞ্চলকে জাতীয় দুর্যোগপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আগামী বছরের বৈশাখ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে সহায়তা প্রদানের জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ঢাকাস্থ মৌলভীবাজার সমিতির সভাপতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী তবারক হোসেন।

হাকালুকি হাওর এলাকার কৃষক রফিক উদ্দিন জানালেন, ৪০ কিয়ার ধান ক্ষেত করছিলাম। সব শেষ হয়ে গেল। এক বছর ক্ষেত করলে আমাদের দুই বছরের ধান ওঠে। আমরা বোরো ধানের উপর নির্ভরশীল। ২২ জনের পরিবার আমাদের। সারাটা বছর পরিবার নিয়া চলতাম কিলা এই চিন্তায় আছি। চাউল কিনিয়া (ক্রয় করে) খাওয়া লাগের। দোকানদারও দাম বাড়াইলাইছে। এক বস্তা চাল কিনতে লাগে ২৫ শ' থেকে ২৬ শ' টাকা।

হাওর এলাকার কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, আগের রাতে মেঘ (বৃষ্টি) হইছে। সকালে উঠিয়া দেখি চোখের সামনে সব ডুবে যাচ্ছে। রক্ষা করতে পারলাম না। চোখের সামনে ভেসে গেছে আমাদের সারা বছরের সম্বল। এখন পরিবার নিয়া খাব কি? অসহায় হয়ে গেছি। এলাকার মানুষ বড় কষ্ট করের। এখন পর্যন্ত কোন সরকারি সাহায্য পাইছি না আমরা।

দেশের সর্ববৃহৎ মিঠা পানির মৎস্য ভান্ডার খ্যাত হাকালুকি হাওরের ওপর বড়লেখা উপজেলার বর্ণি, তালিমপুর, সুজানগর ও দাসেরবাজার ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার জেলে পরিবারের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। বৈশাখ (মধ্য এপ্রিল) থেকে আশ্বিন (সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত হাওরের ভাসমান পানিতে মাছ শিকার করে বাজারে বিক্রি করেই চলে তাদের সংসার। কিন্তু এবার চৈত্র মাসেই দেখা দেয় অকাল বন্যা। ভারী বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে হাওরপারের হাজার হাজার কৃষকের অনেক স্বপ্নের বোরো ফসল আধ-পাকা অবস্থায় তলিয়ে যায়।

দীর্ঘদিন বন্যার পানিতে তলিয়ে থাকায় ধান গাছ পচে হাওরের পানি বিষাক্ত হয়ে পড়ে। আর এতে মারা যায় হাকালুকির বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। মাছ খেয়ে মারা যায় হাঁস। পচা ধান আর পচা মাছের দূর্গন্ধে পানি ও বাতাস দূষিত হয়ে পড়ে। পানি দূষণমুক্ত করার লক্ষ্যে প্রশাসন হাওরের পানিতে চুন ছিটানো শুরু করে। মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে এলাকায় চালানো হয় ব্যাপক প্রচারণা। হাওরের মাছ না খেতে গণসচেতনা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয় মতবিনিময় সভা। ব্যাপক প্রচারণার কারণে হাটবাজার মাছশূন্য হয়ে পড়েছে। এতে পথে বসার উপক্রম হয়েছে মাছ ব্যবসায়ীদের।

সরেজমিনে হাওর পারের জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে হতাশাগ্রস্থ অবয়ব লক্ষ করা গেছে। তালিমপুর ইউনিয়নের গলগজা গ্রামের জেলে দিলীপ বিশ্বাস, কলারতলী পারের জেলে আমিন আলী জানান, ৭-৮ দিন পূর্ব থেকে হাওরে মাছ মরতে শুরু করেছে। প্রশাসন মাইকিং করে মাছ ধরা বন্ধ করেছেন। নিষেধ অমান্য করে যারা মাছ ধরে বাজারে নিয়ে আসা হচ্ছে। সেইসব মাছ কিনছে না কেউ। গত এক সপ্তাহ ধরে মাছ ধরতে না যাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা মানবেতর জীবন যাপন করছেন জেলেরা।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবু ইউসুফ জানান, হাওরের অবস্থা আগের চেয়ে এখন অনেক ভাল। পানির রং পরিবর্তন হচ্ছে। মাছ মরাও বন্ধ হয়ে গেছে। বুধবার থেকে হাকালুকি হাওরের বড়লেখা অংশে জেলেরা মাছ ধরতে পারবেন।

বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, হাকালুকি হাওর অংশের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক ও মৎস্যজীবীদের তালিকা করা হয়েছে। খাদ্য ও অর্থ সহায়তা (জিআর) কর্মসূচির আওতায় ৪৫ মেট্রিক টন চাল ও নগদ সোয়া ২ লাখ টাকা বরাদ্ধ পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার (২৫ এপ্রিল) অথবা বুধবার (২৬ এপ্রিল) থেকে এগুলো ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিতরণ করা হবে। এছাড়া উপজেলা পরিষদের অপ্রত্যাশিত খাত থেকেও ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.