অরণ্য রণি | ২৮ এপ্রিল, ২০১৭
বাড়ির পাশের বিল থেকে টেংরা, পুটিসহ ছোট মাছ ধরে নগরীর কদমতলী বাজারে বিক্রি করতে এনেছিলেন দক্ষিণ সুরমার লালমাটিয়া এলাকার মৎস্যজীবী সুবল বিশ্বাস। সারাদিন বাজারে থেকেও মাছ বিক্রি করতে পারেন তিনি।
সুবল বলেন, মাছ বাজারে তো এখন ক্রেতাই নেই। যেসব ক্রেতা আসেন তারাও ভয়ে এইধরণের মাছ কিনতে চান না। কেবল ফিশারিজে চাষ করা মাছই কিনে নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, বৈশাখ মাস থেকে হাওড়ে-বিলে পানি আসে, তখন মাছ ধরা পড়ে। এই কয়েকমাসই আমরা ব্যবসা করতে পারি। বাকী সময় তো বেকার থাকতে হয়। কিন্তু এ বছর বৈশাখেও মাছ বিক্রি হচ্ছে না।
কেবল সুবল বিশ্বাস নয়, এমন হতাশা সিলেটের সকল মৎস্যব্যবসায়ীদের। পানি দূষিত হয়ে সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার বিভিন্ন এলাকার হাওরে মাছের মৃত্যুর পর ধ্বস নেমেছে সিলেটে মাছের ব্যবসায়। গত কয়েকদিন ধরেই অনেকটা ক্রেতা শুণ্য মাছের বাজার। ক্রেতাদের মধ্যে মাছ নিয়ে অনেকটা আতঙ্ক বিরাজ করছে।
শুধু মাছ বাজার নয়, সুপার শপগুলোতেও মাছের ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে।
স্বপ্ন সুপার শপ, সিলেটের এসিসটেন্ট আউটলেট অপারেশন ম্যানেজার নাহিদ তারানা চৌধুরী বুধবার বলেন, গত ১০/১২ দিন ধরে বিলের ও হাওরের মাছ একেবারেই বিক্রি হচ্ছে না। সকালে যে মাছগুলো আমাদের বিভিন্ন শাখা এসেছিলো, বিকেল পর্যন্ত তা বিক্রি হয়নি। রুই, কাতলাসহ কিছুসংখ্যক ফিশারিজের মাছ বিক্রি হলেও তার পরিমান একেবারেই সামান্য। তিনি বলেন, আমাদের মাছ বিক্রি প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে।
তবে সিলেট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুলতান আহমদ জানিয়েছেন, হাওরের পানিতে দূষণ কমে গেছে। এখন হ্ওাড়ের মাছ ধরা ও খাওয়ায় কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। নির্বিঘ্নে খাওয়া যেতে পারে।
বুধবার সিলেটের বৃহৎ পাইকারী মাছ বাজার কাজিরবাজার ও খুচরা বাজার লালবাজারে গিয়ে দেখা যায়, অনেকটা ক্রেতাশূণ্য মাছ বাজার। মাছবাজারের চিরচেনা হৈ-হুল্লা নেই। অনেকটা শান্ত বাজার। বাজারে হাওড়ের মাছও নেই। আছে রুই, কাতলা, ইলিশ, তেলাপিয়া, কইসহ খামার ও নদীর মাছ। তবু ক্রেতারা মাছ কিনতে এসে শঙ্কিত।
লালবাজারে মাছ কিনতে এসেছিলেন নগরীর সোবাহানীঘাট এলাকার গৃহিনী রুজিনা বেগম। তিনি বলেন, মাছ কিনতেই তো এখন ভয় করে। যেভাবে কথাবার্তা শুনছি তাতে মাছ খেলে কি থেকে কি হয়ে যায় এই নিয়ে ভয় হয়।
এই বাজারেই মাছ কিনতে আসা আরেক ক্রেতা কবির আহমদ বলেন, হাওরের মাছ না আসার সুযোগে বিক্রেতা মাছের দাম অনেকটা বাড়িয় দিয়েছেন। শোল মাছ আগে নিতাম ৩৫০ টাকা কেজি দরে আর এখন নিতে হচ্ছে প্রায় ৫০০ টাকা কেজি দরে। ফিশারিজ ও হিমাগারে সংরক্ষিত মাছ বাজারে বেশি দেখা যাচ্ছে। এই মাছগুলোত কোলেস্টরলের পরিমাণ বেশি থাকে যা স্বাস্থসম্মত নয়।
লালবাজারের মাছ বিক্রেতা ফাজিল আহমেদ বলেন, মাছের মড়কের কারণে বাজারে এখন মাছের দাম বেশি। হাওরাঞ্চল থেকে এখন মাছ আসা বন্ধ। এখন যা বিক্রি করি সবই সিলেট বা সিলেটের আশপাশে ফিশারির মাছ। আগে প্রতি কেজি ঘোলা-ট্যাংরা বিক্রি করতাম ৩০০-৩৫০ টাকায় আর এখন বিক্রি করতে হচ্ছে ৫০০ টাকায়। ছোট চিংড়ি আগে বিক্রি করতাম ৩০০ টাকা কেজি করে, আর এখন বিক্রি করি ৪০০ টাকা কেজি দরে।
মো. ইব্রাহীম নামের আরেক মাছ বিক্রেতা বলেন, ফিশারিজের মাছের মধ্যে তেলাপিয়া আগে বিক্রি করতাম ১২০ টাকা কেজিতে আর এখন বিক্রি করতে হচ্ছে ১৫০ টাকা কেজিতে। রইনলা আগে ছিল ১৪০ টাকা আর এখন ১৭০ টাকা কেজি, ব্রিগেড মাছ আগে বিক্রি হত ১২০ টাকা কেজি দরে আর এখন বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা কেজি দরে।
কাজিরবাজার মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গির আলম বলেন, বাজারে তো এখন মাছই নেই। হাওড়ের মাছ আসছে না। চাঁনপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লাসহ কিছু এলাকা থেকে মাছ আনা হচ্ছে। ভারত ও বার্মা থেকে রুই আসছে। অথচ অন্যান্য বছর এমন সময়ে হাওড়ের মাছেই ভরা থাকতো বাজার।
তিনি বলেন, সরবরাহ কম থাকায় মাছের দাম কিছুটা বেড়েছে। তাছাড়া বিকিকিনিও একেবারে কমে গেছে। আরো কয়েকদিন এমন অবস্থা থাকতে পারে বলে ধারণা তার।