মারূফ অমিত | ০১ মে, ২০১৭
'সকাল বেলা উঠে আমাদের দম ফালানোর সময় নাই। খাইলাম কি না খাইলাম তার দিকে চউক যায় না। আটটার মধ্যে হাজিরা না দিলে বড় বাবু আমাদের ফিরিয়্যা দেয়, সারাদিনের হাজিরার টাকা যায়। তাই দৌড়াইয়া গিয়া হাজিরা দেই আগে।' এভাবেই দিনের শুরুর কথা বলছিলেন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ট্রান্সকম গ্রুপের মনিপুর চা বাগানের চা শ্রমিক গংগা মনি।
চা বাগানের বাজারকোণা লাইনে থাকা ৫০ উর্ধ বয়সী চা শ্রমিক গংগা মনি জানান, তাদের জীবন যাপন খুবই কষ্টের। লেবার লাইনেই আটকে আছে তাদের জীবন। দৈনিক ৮৫ টাকা মজুরি দিয়ে তাদের কিছুই হয় না। খাদ্য বাসস্থান চিকিৎসা কিছু ভালোভাবে হয়না তাদের জীবনে।
গংগা মনি বলেন, বড় বাবুরা আরাম করে বাংলোয় ঘুমায়। আর আমরা এই চৌদ্দ হাত ঘরে ১৩ ১৪ জন একসাথে থাকি। পোলার বউ, পোলা একঘরে একসাথে থাকে। আমাদের লাজ লজ্জার মাথা কাটা গেছে। ঝড় তুফানের দিন আইছে। দুইদিন পানিতে ভিজছি। বারিশার দিন ত আছেই সামনে।
চা বাগান ঘুরে দেখা যায় চা শ্রমিকদের বেশির ভাগ ঘরই ৮ বাই ১১ ফুট মাপের। যেখানে অন্তত তিনটি প্রজন্ম একসাথে বসবাস করে।
অন্য এক চা শ্রমিক শুকদা রাণী জানান, একদিনে ৫ শ টাকার সিগারেট বড় বাবুরাই উড়িয়ে বেড়ান অথচ এক সপ্তাহে তারা ৫ শ টাকা পান যা দিয়ে তাদের কিছুই হয় না।
বাগানের লেবার নং - ১৫৯৭ এই নারী শ্রমিক বলেন, আমরা কাজ করি জঙ্গলে জঙ্গলে, সাপে কাটে, জোঁকে কাটে কিন্তু আমাদের দেখার কেউ নাই সাহেব। এক দাওয়াই খানা আছে, এই আছে আর কি! কোন চিকিৎসাই পাইনা। লেবার লাইনেই আমাদের জীবন। আমাদের বাচ্চা কাচ্চা হইতে কি কষ্ট হয় তা আমরাই জানি।
হাসপাতালের ডাক্তারের কথা জানতে চাইলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'এক ডাক্তার আছে, মাঝে মাঝে দেখি হে বড় বাবুর গাড়িও চালায়। সাদা এক গোল্লা ছাড়া আর কিছুই দেয় না হাসপাতালে।'
চা শ্রমিকদের সাথে কথা বলার সময় জানা গেল, মনিপুর চা বাগানে চা শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্য সেবার জন্য একটি হাস্পাতাল আছে কিন্তু সেখানে নেই পর্যাপ্ত ডাক্তার এবং নার্স। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি না থাকার কারণে জরুরী সময়ে খুবই দুর্ভোগ পোহাতে হয় তাদের। চা শ্রমিকরা জানান, বাগান কোম্পানী একটি গাড়িও দেয়নি তাদেরকে। বিগত দিনগুলোতে সঠিক সময়ে হাসপাতালে না নেওয়াতে দুজন মানুষ মারাও গেছেন।
এদিকে চা বাগানের শত শত শিশু অপুষ্টির শিকার। অন্যদিকে নারী শ্রমিকরা মাতৃত্বকালীন ছুটিও ঠিক ভাবে পায় না। ১৯৬২ সালের টি প্ল্যান্টেশন লেবার অর্ডিন্যান্স এবং ১৯৭৭ সালের প্ল্যান্টেশন রুলসে চা-বাগানগুলোতে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা মালিকের দায়িত্ব থাকলেও তা প্রতিপালনের ব্যবস্থা নেই মনিপুর চা বাগানে।
এদিকে চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচীর খাদ্য সহায়তা প্রকল্পের আওতায় শ্রীমঙ্গল উপজেলাসহ সারাদেশের ২১ উপজেলায় ২০ হাজার চা শ্রমিকের জন্য ১০ কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল গতবছর। যেখানে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় ১৫০ চা শ্রমিকের বিপরীতে ৭ লাখ ৫০ হাজার বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। এই প্রকল্পের আওতায় একজন চাশ্রমিক পাঁচ হাজার টাকার খাদ্য সহায়তা এবং নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য চাল ৩৫ কেজি, ডাল ৯ কেজি, তেল ৬ লিটার, আলু ১৫ কেজি,আটা ১৫ কেজি, সাবান ৬টি, শাড়ি একটি ও লুঙ্গি পাবার কথা ছিল। কিন্তু মনিপুর চা বাগানের অনেক শ্রমিকই জানিয়েছেন একবার টাকা দেওয়ার পর তাদেরকে আর কিছুই দেয়া হয়নি। কিছু চাল ডাল পেয়েছেন এটা মাত্র কয়েক দিনের উপযোগী।
চা শ্রমিক শুকদা জানান, নিয়মত তারা খেতে পারেন না,। রেশনের আটা দিয়ে কোন মতে খান রুটি করে,। সাথে লবণ মরিচ দিয়ে কচি চা পাতা ভর্তা। কখনো কখনো পাহাড়ি আলু কুড়িয়ে সিদ্ধ দিয়ে খেতে হয় ক্ষুধা নিবারণের জন্য।
মনিপুর চা বাগানের চা ফ্যাক্টরিতে কাজ করা আব্দুল মান্নান জানান,আগে ৬৯ টাকা ছিল দৈনিক মজুরী, এখন ৮৫ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু কোম্পানীর এসব টাকায় তাদের বেঁচে থাকা বড়ি দুর্বিষহ। বড় বাবুরা বাগান দেখতে আসেন, কিন্তু লেবারদের খোঁজ নেন না।
সপ্তাহে ৩ কেজি রেশনের চাল ও আটা। এ দিয়ে পরিবার নিয়ে তিন বেলা খাবার জোটে না শ্রমিকদের। সকালে লবণ দিয়ে এক মগ চা আর সাথে দুমুঠো চাল ভাজা খেয়ে বাগানে যেতে হয়।
তিনি জানান বাগান মালিকের জমি সরকারেরই খাস জমি। সামান্য অর্থে লিজ নিয়ে বেসরকারি কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকা আয় করে। অথচ চা শ্রমিকদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়না।
আব্দুল মান্নান বলেন, বাবুরা বিলাসিতায় ব্যস্ত, অথচ আনাদের বাগানের রাস্তাটা এখনো পিচ হয় নাই। বৃষ্টি বাদলার দিনে আমাদের চলাফেরায় কষ্ট হয়। এসবের দিকে বাবুদের কোন নজর নাই।
চা বাগান ঘুরে চা শ্রমিকদের ভাষার ব্যবহার দেখলে মনে হবে এখনও ব্রিটিশ শাসনামল চলছে। ব্যবস্থাপককে ডাকে 'বড় বাবু' বলে। সহকারি ব্যবস্থাপককে 'ছোট বাবু' বলে ডাকে। এছাড়া ব্যবস্থাপকের বাসার কাজের লোকদের 'বেয়ারা' বলে ডাকা হয়। এছাড়া কেউ বেড়াতে গেলে তাদেরকে 'সাহেব' বলে চা শ্রমিকরা।
কথা বলার সময় চা শ্রমিক অরুন মৃধা বলেন, বাবুরা বাবুগিরিতেই ব্যস্ত, আমাদের কে দেখবে। বাগানে কাজ করে আমরা কত কষ্ট করি, কিন্তু মরার সময় আমাদের মুখে জল দেবার কেউ নাই। আমরা আমাদের প্রার্থনা টাও ভালো করে করতে পারিনা। আমাদের মন্দিরে জেনারেটর লাইট ছিল সেটা কেটে দিছে। বাত্তি গেলে তা আর জ্বালানোর ব্যবস্থা নাই। আমরা মানুষ নাই বাবু।
বাংলাদেশে চা শিল্পের ইতিহাস ১৫০ বছরের। সিলেটে চা বাগান তৈরির শুরুর দিকে উন্নত জীবনযাপনের আশা নিয়ে জন্মমাটি ছেড়ে চা বাগানে কাজ করতে আসে দক্ষিণ ও মধ্য ভারতের অভাবী মানুষ। কিন্তু কাজে এসে তাদের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে যায়। চা শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের পুর্বপুরুষরা মাদ্রাজ, বিহার, উড়িষ্যা, উত্তর প্রদেশ, ঝাড়খন্ডের রাত্রি, ডোমকা, নাগপুর প্রভৃতি অঞ্চল থেকে এদেশে এসেছিল। কিন্তু তারা এখন নিজেকে বাঙ্গালী বলেই দাবী করে।
চা শ্রমিক বিজয় কর্মকার জানান, আমরা বাঙ্গালী। আমি ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ছি। আমি মনে করি আমি এ মাটির মানুষ।
মনিপুর চা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মধু মৃধা জানান, আমি লেবার সংঘের সভাপতি। আমার ঘরেই গরু বাছুর নিয়া থাকতে হয়। কোন মতে টিন দিয়ে ঘর ঠিক করেছি। কিন্তু জায়গা ত নাই।
তিনি আরো জানান, কথা বললেই মালিক পক্ষ মামলার ভয় দেখায়। অনেক সময় চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেয়। তাদের সাথে কথা বলা বড় ধরনের অন্যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শিক্ষা ব্যবস্থার কথা জানতে চাইলে মধু মৃধা জানান, আমাদের বাগানে কোন স্কুল ছিল না। একটা স্কুল হইছে কিছুদিন আগে কিন্তু সেটার ব্যবস্থাপনা খুবই খারাপ ।
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী সকল চা বাগানে স্কুল প্রতিষ্ঠার কথা রয়েছে। তবে সেটার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, চা বাগানে শিক্ষার আলো ছড়ানোর কার্যত কোণ ব্যবস্থা নেই। আর যাও আছে সেটা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থার (আইএলও) বিধান অনুযায়ী, ৮ ঘন্টা শ্রমের নিয়ম থাকলেও চা শ্রমিকদের কোন শ্রমঘন্টা নেই। আর বিনোদনের তো প্রশ্নই আসে না। চা শ্রমিকদের বিনোদন বলতে নেশায় বুদ হয়ে থাকা! তবে এখন অনেকে বিভিন্ন খেলাধুলা করে থাকে।
উল্লেখ্য, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার একাংশ জুড়ে ট্রান্সকম কোম্পানির মালিকানাধীন মনিপুর চা বাগানের স্থায়ী ৭ শ শ্রমিক এবনহ অস্থায়ী ভাবে ৬ শ শ্রমিক কাজ করে। বাগানের ৬ টি লেবার লাইনে বসবাস করেন প্রায় দুইহাজারের বেশি মানুষ।