নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৪ মে, ২০১৭
তার বয়স যখন ১৮ মাস তখনই পরিবারের সবার চোখে ধরা পড়ে বিষয়টি। এরপর সিলেটের চিকিৎসকদের কাছে ধরণা দেন তারা। নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকায়। সেখানে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা জানালেন ৫ বছর পর বলা যাবে তার চোখের ‘কন্ডিশন’। ৫ বছর পর ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসরা বললেন তার চোখ আর কোনদিনই ভাল হবে না। সে দেখতে পারবেনা পৃথিবীর আলো।
মেয়ে রোকশানা বেগমের চোখ ভাল না হওয়ার সংবাদ শুনে ভেঙ্গে পড়েন সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সিংচাপইর জিয়াপুর গ্রামের শ্রমজীবী আনোয়ার পাশা। অথচ অন্ধত্ব রোকশানাকে দমাতে পারেনি। এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশু বিদ্যালয় (জিডিএফডিকে) থেকে বি গ্রেড পেয়ে সাফল্যের সঙ্গে এসএসসি পাশ করেছে সে।
রোকশানার বড়বোন রোমানা আক্তার জানান, তরা ৫ বোন ও চার ভাই। তার বোন যখন অনেক ছোট তখন থেকেই সে চোখে দেখতে পারেনা। তারা সাধ্যমত অনেক চিকিৎিসা করিয়েছেন। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। একদিন তারা জানতে পারেন সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারে দৃষ্টি প্রতিন্ধিদের একটি স্কুলের খবর। এরপর ২০০৮ সালে তাকে নিয়ে আসেন নগরীর জিন্দাবাজার গ্রিণ ডিজ্অ্যাবল্ড ফাউন্ডেশনের অফিসে। তাকে আনার পর অনেক কথা শুসতে হয়েছে গ্রামের লোকদের। কেউ কেউ তীর্যক মন্তব্যও করেন তাকে সিলেট ভতি করানোয়। একপর্যায়ে বোনের সঙ্গে জিডিএফএর একজন শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন রোমানা।
রোমানা জানান, অন্য সাধারন মানুষের থেকে তাদের লেখাপড়াটা আলাদা। তিনি বলেন, আমরা স্বাভাবিক নিয়মে লেখাপড়া করেছি আর অন্ধদের পড়তে হয় ব্রেইল পদ্ধতিতে। তাদেরকে সঠিকভাবে তত্ত্বাবধান করা গেলে তারাও এগিয়ে যেতে পারবে। তিনি জানান, তার বোনকে ষষ্ট শ্রেণী থেকে তিনি পড়াচ্ছেন। একই বক্তব্য প্রতিষ্ঠানের অন্য শিক্ষিকা, শারমিন, খালেদাসহ অন্যদের।
পরীক্ষায় পাশ হওয়ার আনন্দে অনেকটা চোখে জল আসে রোকশানার। রোকশানা জানায়, অনেক কষ্ট করে ব্রেইল পদ্ধতিতে তাকে লেখাপড়া করতে হয়েছে। সামর্থের মধ্যে জিডিএফ তাকে অনেক সহযোগিতা করেছে। জিডিএফর সহযোগিতায় সে আজ এসএসসি পাশ করতে পেরেছে বলেও জানায় রোকশানা। এসএসসি পাশ করার পর নিজেকে অন্য সাধারন মানুষের মতই মনে হচ্ছে বলে জানায় রোকশানা। আগামীতে তার লক্ষ্য অনার্স, মাস্টার্স পর্যন্ত লেখাপড়া করা। সবাই সহযোগিতা করলে সে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারবে বলে জানায় রোকশানা।
এ ব্যাপারে গ্রিণ ডিজ্অ্যাবল্ড ফাউন্ডেশনের নির্বাহী প্রধান মো. রজব আলী খান নজিব জানান, এবারের এস্এসসি পরীক্ষায় তার প্রতিষ্ঠান থেকে এক জন শিক্ষার্থী পাশ করেছে। গত বছর তার প্রতিষ্ঠন থেকে পাঁচ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী একসঙ্গে এসএসসি পাশ করে সারা দেশে নজির সৃষ্টি করে। তিনি জানান, ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়ালেখা করানো অনেক খরচের ব্যাপার। সরকারিভাবে ব্রেইল পদ্ধতির বই কিছটা সরবরাহ করা হচ্ছে। আর যারা বই পায়না তারা অডিও ভার্সনে লেখাপড়া করে। এছাড়া বিশেষভাবেও তাদেরকে পড়ানো হয়।
তিনি জানান, গেল বছর তার প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করা তিন শিক্ষার্থী বর্তমানে ইউনিভার্সাল কলেজে লেখাপড়া করছে। তিনি বলেন উন্নত বিশ্বে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের সকল সুযোগ সুবিধা ফ্রি। আমাদের দেশে কিছুটা শুরু হয়েছে তা পর্যাপ্ত নয়। তিনি বলেন তাদেরকে সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা দেওয়া হলে তারাও অনেক কিছু করে দেখাতে পারবেন বলে তিনি জানান।