Sylhet Today 24 PRINT

হাওরে অপ্রতুল ত্রাণ, বঞ্চিত প্রত্যন্ত এলাকার ক্ষতিগ্রস্তরা

জাহিদুল ইসলাম সবুজ, সুনামগঞ্জ থেকে ফিরে |  ০৬ মে, ২০১৭

তাহিরপুর উপজেলার বাঘমারা গ্রামের গৃহিণী খুশি রানী দাস। পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া ধান কেটে জড়ো করছেন বাড়ির পাশের সড়কে। ধান বলতে তেমন কিছু নেই। কেবলই চিটা। তবু যদি কিছু পাওয়া যায়, সে আশায় কেটে আনছেন।
 
খুশি রানী বলেন, 'বন্যায় ফসল হারিয়ে সবচেয়ে সমস্যা আছে আমদের মতো গৃহস্ত কৃষক পরিবারগুলো।  লোক লজ্জার ভয়ে ওএমএসের লাইনে দাঁড়াতে পারছি না, আবার ভিজিএফ কার্ডও পাচ্ছি না। ঘরে খাবারও নেই। সব তলিয়ে গেছে পানিতে। তাই বড় ছেলে কাজের খোঁজে সিলেটে চলে গেছে। আর ছোট দুই ছেলে আর ছেলের বউ নিয়ে ডুবে যাওয়া ধান কাটছি গরু-ছাগলের খাবারের জন্য। নিজে খাই না খাই, গবাদি পশুকে না খাওয়ালে শেষ অবলম্বনটুকু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যেতে হবে।'

পঞ্চাশোর্ধ এই বিধবা বলেন, '২ একর জমি আছে আমার, সবটাতেই ধান আবাদ করিয়েছিলাম, প্রায় সবটাই তলিয়ে গেছে, তবুও এলাকার মেম্বার চেয়ারম্যান আমাকে ত্রাণ পাওয়ার উপযুক্ত মনে করে না।'

টাঙ্গুয়ার হাওরের তীরবর্তী বড়দল গ্রামের কৃষক আজির উদ্দিন। তিনি বলেন, “৩ একর ধান বর্গা করেছিলাম, বাঁধ ভেঙ্গে অর্ধেকের বেশি ফসল তলিয়ে গেছে, তবুও বাকি ধানের আশায় ছিলাম। ভেবেছিলাম বেঁচে যাওয়া ধান দিয়ে কোনোমতে দিন কাটবে। কিন্তু গতরাতের শিলাবৃষ্টির পর আর এক ছড়া ধানও রইলো না।'

তিনি বলেন, 'আমার বড় দুই ভাই সিলেটে চলে গেছে কাজের সন্ধানে। সরকার যে পরিমাণ চাল দেয় তাতে আমার যৌথ পরিবারের খেয়ে বাঁচার উপায় নেই।“

গত শুক্র ও শনিবার সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওর এলাকা ঘুরে শোনা গেলো এমন হাহাকার। হাওরপাড়ের কৃষকদের কান্না যেনো থামছেই না। পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও তাদের দূর্ভোগ বাড়ছেই।  

জেলা প্রশাসনের হিসাবমতে, জেলার ১১ উপজেলায় কৃষকের সংখ্যা ২ লক্ষ ৭৭ হাজার ১৮৮ জন, তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসেবে এ অঞ্চলে তালিকাভুক্ত কৃষকের সংখ্যা ৩ লক্ষ ৩১ হাজার ৩১৬ জন। হাওর আন্দোলন সংশ্লিষ্টদের দাবি, অনিবন্ধিত কৃষকসহ এই সংখ্যা ৫ লক্ষাধিক।

সরকারী হিসাবমতে, এই অঞ্চলে ৬ লক্ষ মেট্রিক টন বোরো ধান উৎপাদন হবার কথা যা সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে কালবৈশাখি ঝড়, বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টি।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে ১ লক্ষ ৫০ হাজার জনকে ভিজিএফ-এর আওতায় সরকারী ত্রাণ দেয়া হচ্ছে। যা স্থানীয়দের মতে প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। ৩০ কেজি চালের সাথে নগদ ৫০০ শত টাকা স্বান্তনা যোগাতে পারছে না সর্বস্বান্ত কৃষকদের। ১৫ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণ কার্যক্রম ওএমএস এর মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে ১১০ টন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ডিলারদের সাথে কথা বলে জানা যায় সরবরাহের তুলনায় চাহিদা অনেক বেশি।

তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বুরহান উদ্দিন বলেন, “যে পরিমাণ ভিজিএফ কার্ড দেয়া হয়েছে তাতে সবাইকে ত্রাণ দেয়া সম্ভব হয় না, আর গৃহস্থ কৃষকরা ত্রাণের লাইনে দাঁড়িয়ে ত্রাণ নিতেও পারেন না। যার কারণে এই শ্রেনীর কৃষকরা ভুগছেন বেশি”।

তাহিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুলের সাথে আলাপকালে জানা যায়, তাহিরপুর উপজেলার ৭ টি ইউনিয়নে সর্বমোট ১৫ হাজার ৪০০ ভিজিএফ কার্ড ইস্যু করা হয়, কিন্তু এই ৭ ইউনিয়নে ভুক্তভোগী প্রায় অর্ধলক্ষাধিক পরিবার। খাদ্য গুদামে মজুদ কম থাকায় ত্রাণ বিতরণেও আছে ধীরগতি। এমন অবস্থায় সরকারের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আরো আন্তরিক হবার প্রয়োজন আছে।

সুনামগঞ্জ জেলা ভারপ্রাপ্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা আব্দুর রউফ জানান, জেলা খাদ্য গুদামের ধারণ ক্ষমতা চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিবহণ ব্যবস্থা উপযুক্ত না হওয়ায় ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছাতে সামান্য বিলম্ব হচ্ছে। তবে আমরা আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা করছি অন্তত প্রতিদিনের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম যেনো চালিয়ে নেয়া যায়।

এ অবস্থায় অপর্যাপ্ত ত্রাণ আর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা মাথায় নিয়ে কাজের সন্ধানে এলাকা ছাড়ছেন অনেকেই।

পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন “এখন যে পরিমাণ ত্রাণ দেয়া হচ্ছে তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে ত্রাণ সহায়তা পৌছাচ্ছে না। তবুও এই অবস্থা পেরিয়ে গেলে অবস্থা আরো ভয়াবহ হবে। এখন সবাই সাধ্যমত সাহায্য করলেও এক-দু'মাস পর আর এই অবস্থা থাকবে না, কিন্তু নতুন ফসল উঠার আগ পর্যন্ত কৃষককে বেঁচে থাকতে হবে ত্রাণের আশায়। তাই আমরা বার বার বলছি হাওর অঞ্চলকে দূর্গত এলাকা ঘোষণা করার জন্য। প্রয়োজনে সরকারি ত্রাণের পরিমাণ বাড়ানোর সাথে সাথে আন্তর্জাতিক সাহায্যের আবেদন করা উচিৎ।'

অপরদিকে বেসরকারি বা বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে গেলেও তা বিতরণ হচ্ছে তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জের উপজেলা সদর এলাকাতেই। এতে ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছেন না প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর ভুক্তভোগীরা। এমন অবস্থায় ত্রাণ বিতরণে সরকারসহ সকলকেই আরো অনেক বেশি আন্তরিক হওয়া উচিত বলে মনে করেন হাওর আন্দোলন সংশ্লিষ্টরা।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.