নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৯ মে, ২০১৫
পরিবেশ অধিপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই উৎপাদন শুরু করে দিয়েছে ছাতকে প্রতিষ্ঠিত দেশের বৃহৎ শিল্প গ্রুপ আকিজ গ্রুপের মালিকানাধীন আকিজ ক্যামিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি। গত ৩ মাস ধরে এই কারখানায় পটাশিয়াম ক্লোরেড উৎপাদন করা হচ্ছে। যা দিয়াশলাই তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। যদিও আকিজের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন চালাচ্ছেন তারা। পরিবেশের প্রাথমিক ছাড়পত্রও তাদের রয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
তবে পরিবেশ আইন অনুযায়ী, পরিবেশের চুড়ান্ত ছাড়পত্র পাওয়ার আগে পরীক্ষামূলকভাবেও উৎপাদন শুরুর সুযোগ নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় একবছর আগে আকিজ ক্যামিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির পক্ষ থেকে পরিবেশের ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করা হলেও তরল বর্জ পরিশোধনাগার (ইটিপি) প্ল্যান না থাকায় ছাড়পত্র দেয় নি পরিবেশ অধিদপ্তর। যদিও এ ধরনের শিল্প কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে ইটিপি থাকা বাধ্যতামূলক।
এদিকে, উৎপাদন শুরুর পর থেকে আকিজ ক্যামিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির তরল বর্জ্য পরিশোধন না করেই ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে কারখানার পেছনের কৃষি জমি ও বিলে। বর্জের কারনে নষ্ট হয়ে গেছে আশপাশের শতাধিক একর জমির ধানক্ষেত। মারা যাচ্ছে বিলের মাছসহ জলজ প্রাণী। এই কারখানার ধোঁয়ায় নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন কারখানা পাশ্ববর্তী ৬ গ্রামের মানুষ। মারা যাচ্ছে গাছপালাও।
বর্জ ও ধোঁয়ার ক্ষতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে সম্প্রতি এলাকাবাসী শ্রম মন্ত্রী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। লিখিত অভিযোগ পেয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর সরেজমিনে কারখানা এলাকা পরিদর্শন করে। ছাড়পত্র পাওয়ার আগেই কারখানা চালু ও ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণও পায় তারা। এসময় কারখানা বন্ধ রাখার জন্য মৌখিকভাবে নির্দেশ দেন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তবে এই নির্দেশনা না মেনে কারখানা চালু রেখেছে আকিজ কর্তৃপক্ষ।
সম্প্রতি ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও আকিজ ক্যামিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি কর্তৃপক্ষকে ডেকে এনে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে নির্দেশ দেন।
সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার খুমনা এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে আকিজ ক্যামিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি। সম্প্রতি সরেজমিনে কারখানা এলাকা পরিদর্শনে ও এলাকাবাসীর সাথে আলাপ করে জানা যায়, এই এলাকায় প্রায় দুই বছর আগে স্থাপন করা হয় আকিজ ফুড এন্ড বেভারেজ কারখানা। এই কারখানার পাশেই একই সীমানা দেওয়ালের ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে আকিজ ক্যামিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি। কারখানার বাইরে এর কোনো সাইনবোর্ড নেই। এই বছরের শুরুর দিক থেকে অনকেটা গোপনেই এই কারখানায় উৎপাদন শুরু করা হয়।
উৎপাদন শুরুর পর থেকেই কারখানার পেছনের কৃষি জমিতে বর্জ্য ফেলা শুরু হয়। এতে শতাধিক একর জমির বোরো ধানের পুরোটাই এবার নষ্ট হয়ে যায়। বর্জ্যের কারনে ধান গাছ একটু বড় হতেই তাতে লালচে রং ধরে এবং কিছুদিন পরই পচন ধরতে শুরু করে। মারা যেতে শুরু করে পাশ্ববর্তী ধবল বিলের মাছসহ জলজ প্রাণী। কারখানার ধোঁয়ায় উন্মুক্তভাবে ছেড়ে দেওয়ায় শ্যামপাড়া, মুদুকুনি, রাজনামহল, গনককাই, বাঁশকালি ও মুক্তিরগাও এলাকায় অনেকেই কাশি ও শ্বাসকষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। মারা যাচ্ছে এই এলাকার গাছপালা।
বাঁশকালি এলাকার বাসিন্দা বারিক মিয়া বলেন, কারখানার বর্জ্যরে কারনে এবার আমার জমিতে একটা ধানও হয়নি। বিলেও মাছও নেই। এমন দূর্যোগ আর কখনো আসেনি।
কারখানার পাশ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়ার কারনে এই এলাকার সব গাছ মরে যাচ্ছে। অনেকেই কাশি, সর্দি, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যাপারে অভিযোগ জানিয়ে আসছি। কিন্তু কোনো সুরাহা হচ্ছে না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন, (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম কীম বলেন, আকিজ ক্যামিক্যাল কারখানার কারেন এলাকার পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। ছোট শিশুরা রোগাক্রান্ত হচ্ছে। আমরা এই কারখানা বন্ধ ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানাচ্ছি।
এ ব্যাপারে আকিজ ক্যামিক্যাল কারখানার প্রশাসনিক কর্মকর্তা রকিবুল হাসান বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রাথমিক ছাড়পত্র আমাদের আছে। চুড়ান্ত ছাড়পত্র প্রাপ্তির বিষয়টি পক্রিয়াধিন আছে। গত কিছুদিন ধরে পরীক্ষামূলকভাবে কারখানাটি চালু করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
রকিবুল হাসান বলেন, আগামী কিছুদিনের মধ্যে ইটিপি তৈরি করে নোবো। এলাকাবাসী আপত্তি জানানোর কারনে ইটিপি না করে আমরা পূর্ণ উৎপাদনে যাবো না। সুযোগ সুবিধা আদায় করতে না পেরে এলাকার কয়েকজন মিথ্যে অভিযোগ তুলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তারা কারখানা পরিদর্শন করেছেন। তারা এলাকাবাসীর অভিযোগের কোনো সত্যতা পাননি।
এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেটের সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আকিজ ক্যামিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য একবছর আগে আবেদন করেছিলো। কিন্তু তাদের ইটিপি না থাকায় ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। ছাড়পত্র ছাড়াই তারা উৎপাদন শুরু করে দেয়। যা সম্পূর্ণ বেআইনী। পরিবেশ আইনে ছাড়পত্র ছাড়া পরীক্ষামূলকভাবে চালুরও বিধান নেই। তিনি বলেন, আমি গত সপ্তাহে পরিদর্শন করে উৎপাদন শুরু ও কৃষিজমির ক্ষতির প্রমান পেয়েছি। এসময় তাদেরকে উৎপাদন বন্ধ রাখার জন্য মৌখিকভাবে নির্দেশ দিয়ে আসি।
তিনি বলেন, এ ধরনের কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে তরল বর্জ ও ধোঁয়া যাতে বাইরে না আসে, ভেতরেই পরিশোধন করা হয় এ জন্য আলাদা ডিজাইন থাকতে হয়। কিন্তু আকিজের সেটা নেই।
এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান বলেন, আকিজ ক্যামিক্যাল কোম্পানী বর্জ ব্যবস্থাপনা ভালোভাবে করতে না পারায় ফসলের কিছু ক্ষতি হয়েছিলো। আমি এলাকাবাসীর অভিযোগ পেয়ে দু’পক্ষকে ডেকে এনেছিলাম। এলাকাবাসীর অভিযোগ শুনেছি।