নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৩ মে, ২০১৭
সিলেটে পালিত হয়েছে সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়ের ২৪৫তম জন্ম বার্ষিকী। এ উপলক্ষে সোমবার সন্ধ্যায় নগরীর ব্রহ্ম মন্দিরে আলোচনা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, ঊনবিংশ শতাব্দির বাংলা রেনেঁসার মহানায়ক ও সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায় ছিলেন ভারতবর্ষের আধুনিককালের যুগশ্রষ্ঠা। যাকে রবীন্দ্রনাথ ভারতপ্রতীক বলে যথাযথই অভিহিত করেছেন যিনি আজকের এ যুগে এসেও পুরোমাত্রায় প্রাসঙ্গিক। তৎকালীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ থেকে সতীদাহ প্রথা নিরোধ, আধুনিক ও বিজ্ঞান সম্মত শিক্ষার প্রবর্তনসহ ধর্মীয় সংস্কার আলোন্দানের নেতৃত্ব দেন।
শ্রীহট্ট ব্রাহ্ম সমাজের সভাপতি এডভোকেট বেদানন্দ ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন সিলেট রামকৃষ্ণ মিশন ও আশ্রমের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ স্বামী চন্দ্রনাথানন্দ মহারাজ, বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান একেএম গোলাম কিবরিয়া, আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন লিডিং ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক রাজন দাস।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিলেট রামকৃষ্ণ মিশন ও আশ্রমের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ স্বামী চন্দ্রনাথানন্দ মহারাজ বলেন, রাজা রামমোহন রায় ছিলেন সুপন্ডিত ও অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী। বিভিন্ন ভাষা তাঁর আয়ত্বে ছিল বলে তিনি সকল ধর্ম ও দর্শনের স্বাদ তিনি সঠিকভাবে আস্বাদন করতে পেরেছিলেন । সমাজ সংস্কার করতে গিয়ে ইংরেজ শাসকদের গ্রহন করার বিষয়টি যদিও তার ব্যক্তি স্বাধীনতার আন্দোলনের বৈপরীত্যের পর্যায়ে পড়ে। তারপরও তার অবদান এখনও সমাজে গভীরভাবে অনুভূত হয়।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান একেএম গোলাম কিবরিয়া রাজা রামমোহন রায়ের অবদান সমুহ তোলে ধরে বলেন, রাজা রামমোহন বাংলা নবজাগরণের প্রবাদ পুরুষ ছিলেন বলেই আজ এই উত্তরাধুনিক কালেও তাঁর দিয়ে যাওয়া শিক্ষা জাতি হিসেবে আমাদের চিরস্মরনীয় হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদ বিষয়টা যখন পাশ্চাত্য দার্শনিক চিন্তার জগতে আভির্ভূত হয়নি তারও বহুকাল আগে থেকেই তিনি ভারতবর্ষে ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদের চর্চা করে গেছেন। তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়েও সেই সময় আন্দোলন করে যেটি এযুগের বহু চর্চিত বিষয়।
বিশেষ আলোচক লিডিং ইউনিভার্সিটির সহকারি অধ্যাপক রাজন দাস বলেন, রাজা রামমোহন রায় ১৮৩০ সালের ২৩ জানুয়ারি নুতন বাড়িতে স্থানান্তরিত হওয়ার সময় রামমোহন একটা ট্রাস্ট ডিড বা অর্পণনামা তৈরি করেন। এই অর্পণনামাটিতেই রাজা রামমোহনের চিন্তা চেতনার বিষয়টি গভীরভাবে ফুটে ওঠেছে। এই অর্পণনামায় যা লেখা ছিল তা হল-‘আমাদের এই ব্রাহ্ম সমাজে কোনো সাম্প্রদায়িক অভিধায় পরমেশ্বরের উপাসনা হইতে পারিবেক না। যে কেহ শ্রদ্ধাসহ এখানে উপাসনা করিতে আসিবেন। জাতি-ধর্ম-সম্প্রদায় ও সমাজগত অবস্থা নির্বিশেষে তাহারই জন্য এই মন্দির দ্বার মুক্ত থাকিবেক। কোনো প্রতিকৃতি কোনো মূর্তি এখানে স্থান পাইবেক না। জীব হিংসা পান-ভোজনাদি চলিবেক না। যাহাতে জগদ্বীশ্বরের ধ্যান ও উপাসনার বিস্তার হয়, প্রেম ভক্তি, নীতিজ্ঞান, দয়া ও সভ্যতার বিকাশ হয়, সম্প্রদায় নির্বিশেষে সর্বমানবে ঐক্যের বন্ধন সুদৃঢ় হয়। এই মন্দিরে তাহারই উপদেশ আলোচনা, উপাসনা ও সঙ্গীত হইবেক। অন্য কোনোরুপ হইতে পারিবেক না।’
এই অর্পণনামাই তার প্রতিভার একটি মহত্তম দান ও ব্রাহ্ম সমাজের একটি অমূল্য সম্পদ। এটি হল রামহোমনের ধর্মমতের স্পষ্ট বাণীরূপ।
সভাপতির বক্তব্যে শ্রীহট্ট ব্রাহ্ম সমাজের সভাপতি এডভোকেট বেদানন্দ ভট্টাচার্য বলেন, ব্রাহ্মসমাজ কোন বিশেষ ধর্মের মানুষের উপাসনার জন্য তৈরি হয়নি। এটি ছিল ধর্ম নিরপেক্ষ মুক্তবুদ্ধি ও জ্ঞান চর্চার মিলনস্থল। তিনি এ লক্ষ্যে সিলেট ব্রহ্ম মন্দিরটিকে রাজা রামমোহন রায়কৃত অর্পণনামা অনুসারে মুক্ত চিন্তার স্থান হিসেবে গড়ে তোলার আহবান জানান এবং পুরনো গ্রন্থাগারটিকে পুনর্গঠিত করার আহবান জানিয়ে প্রগতিশীল চিন্তার মানুষজনকে এগিয়ে আসার আহবান জানান।
শ্রীহট্ট ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদক বিজয় কৃষ্ণ বিশ্বাসের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন, রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার আরশ আলী ও কবি তুষার কর।
অনুষ্ঠানে ব্রহ্ম সঙ্গীত পরিবেশন করেন সঙ্গীত শিল্পী অনিমেষ বিজয় চৌধুরী ও কুমকুম ভৌমিক। নৃত্যশিল্পী নিলাঞ্জনা দাশ জুঁই এর পরিচালনায় নৃত্যশৈলীর ক্ষুদে শিল্পীর নৃত্য পরিবেশন করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মহনমোহন কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ সুষেন্দ্র কুমার পাল, সাবেক অধ্যাপক বিজিত কুমার দে, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অম্বরীশ দত্ত, বিভাষ শ্যাম যাদন, সমাজ সেবক বীরেন্দ্র সূত্রধর, সিলেট শিক্ষা বোর্ডের একাউন্টেন্ড অশোক চৌধুরী, ব্যাংকার অরুপ চৌধুরী, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপত্র দেবাশীষ দেবু, চিত্রশিল্পী সত্যজিত চক্রবর্তী, ব্যাংকার জয়মাল্য দাস, ব্যবসায়ী সুমন ভট্টাচার্য্য, স্থপতি শওকত জাহান চৌধুরী, স্থপতি অমিতাভ মঙ্গল প্রমুখ।