Sylhet Today 24 PRINT

বড়লেখা ভূমি অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য

তপন কুমার দাস, বড়লেখা প্রতিনিধি  |  ১১ মে, ২০১৫

বড়লেখা উপজেলা ভূমি অফিস যেন ঘুষ-দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এখানে ঘুষ ছাড়া কোন কাজই হয় না। দালাল না ধরলে নড়ে না কোন ফাইল। ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের মূল্য তালিকা সম্বলিত সাইনবোর্ড ও কাগজ সরবরাহের নির্ধারিত সময়ের উল্লেখ কেবলই লোক দেখানোর। সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী সেবা পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ভূমি অফিসের নানা অনিয়ম-দুর্নীতি আর ঘুষ বাণিজ্যের ভয়াবহ চিত্র। দালাল পরিবেষ্টিত বড়লেখা উপজেলা ভূমি অফিসে দালালদের কাছে কোন কাজই অসাধ্য নয়। জমির বৈধ মালিক যেই হোন না কেন, চাহিদা মত টাকা এবং দাগ খতিয়ান নম্বর দিলেই তা হয়ে যায় অন্যের।

আবার বৈধ কাগজপত্র থাকা স্বত্ত্বেও ঘুষের রেটে হেরফের হলে প্রকৃত ভূমি মালিকদের হতে হয় হয়রানির শিকার। নামজারির জন্য যেখানে সরকার নির্ধারিত ফি ২৭২.৫ টাকা হলেও ভোক্তভোগীদের অভিযোগের সত্যতা খুঁজতে পরিচয় গোপন রেখে এ প্রতিবেদক মাসুক নামে এক দালালের কাছে গ্রাহক সেজে নামজারি করার কথা বলতে তিনি বললেন, ‘খাজনাসহ ৪৫০০ টাকায় নামজারি পর্চা করে দিতে পারবেন।’ খাজনা পরিশোধ রয়েছে এমন কথা জানালে ওই দালাল বলেন তাইলে সরকারি ফি অনুযায়ী ৩৫০০ টাকা লাগবে।  ৩৫০০-৫০০০ হাজার টাকার নিচে কোন কাজে হাতেই দেয় না কর্মচারী কিংবা দালাল।

ভূমি অফিসে দালালের উৎপাতে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। দালাল-কর্মচারী সবাই মিলে গড়ে তুলেছে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট। এদের নেই কোন লুকোচুরি, লাজলজ্জ্বা কিংবা ভয়ভীতি। এমনভাবে ঘুষের দরদাম চলে এ যেন তাদের ন্যায্য পাওনা। দাবিমত টাকা দিলে ভূমি সংক্রান্ত নানা তদন্ত প্রতিবেদন, সার্ভে রিপোর্ট আর নামজারি খতিয়ানের মাধ্যমে জমি সংক্রান্ত তথ্য পাল্টে যাওয়ার গুরতর ঘটনাও ঘটছে।   

 এসব অনিয়মের বেড়াজালে প্রতিনিয়ত সর্বস্বান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। জাল দলিল, পর্চা, মৌজা ম্যাপ (নকশা), একই জমি বহু জনের কাছে বিক্রি, রেকর্ডের সময় নির্ধারিত লোকের অনুপস্থিতিতে তার জমি নিজের অংশের মধ্যে ঢোকানোসহ নানা ধরনের দূর্নীতির সঙ্গে পরিচিত ভূক্তভোগীরা। দলিলপত্র ঠিক থাকলে টাকার পরিমাণ কম হাঁকা হয়। একটু এদিক-সেদিক হলে আর রক্ষা নেই, কাড়ি কাড়ি টাকা ঢেলেও নিস্তার মেলে না। টাকার বিনিময়ে দুর্বলতার খবর প্রতিপক্ষের কাছে পাচার করা হচ্ছে।  এমনকি ‘র’র নিচে বিন্দু না পড়লেই টাকার অংক বেড়ে যায় কয়েক হাজার।

বড়লেখা ভূমি অফিসে কর্মচারীর চেয়ে বাইরের দালালের সংখ্যা বেশি। এসব দালালরা সরকারি কর্মচারীর মত বিভিন্ন রেকর্ডপত্র নাড়াচাড়া করে। দেখে বুঝার উপায় নেই এরা বাহিরের লোক। অভিযোগ রয়েছে এসব দালালরা বালামে ভুল ও মিথ্যা তথ্য সংযোজন করে আবার তা ঠিক করে দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ভূমি মালিকের নিকট থেকে হাতিয়ে নেয় হাজার হাজার টাকা।

সরেজমিন ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা ভূমি অফিসে কমপক্ষে ৫০ জন দালাল সক্রিয়। এরা নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে উপজেলার সকল এলাকার ভূমিসংক্রান্ত কাজকর্ম। এসব দালালদের কাছে জিম্মি সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষজন। দালালের উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হচ্ছেন, বশির আহমদ, সাইফুর রহমান সেলু, আকদ্দছ আলী, জমির মিয়া, মুজিবুর রহমান, মতিউর রহমান, মদরিছ আলী, মুহিবুর রহমান মবু, মাসুক আহমদ, বোধাই মিয়া, আব্দুল কুদ্দুছ, সামছু মিয়া, আব্দুল হান্নান, হেলাল আহমদ, আরকুম আলী, ইলাছ আলী।  

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভূক্তভোগী বলেন, ভূমি অফিসের দেয়ালও যেন ঘুষ খায়। তহশিলদার ও কর্মচারীরা দিনে কত টাকা যে ঘুষ নেয় তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। ভূমি অফিসের ঘুষ দুর্নীতির বিষয় সকলেরই জানা তারপরও কোন প্রতিকার নেই। প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেনের এমন দৃশ্য দেখলে মনে হবে এযেন সর্ষের মধ্যে ভূত।  

সূত্র জানায় ভূমি অফিসে কর্মরত (স্থানীয়) কয়েকজন কর্মচারী ঘুষ বাণিজ্য করে কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। জনশ্রুতি রয়েছে এদের একজন ঘুষের টাকায় পৌরশহরে অর্ধকোটি টাকার জমি কিনেছেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই।

একজন ভূক্তভোগী বলেই বসলেন, ভূমিমন্ত্রী কি ভূমি অফিসের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ-দুর্দশা লাঘবে তৎপর? মন্ত্রী স্বয়ং কিংবা তার কোনো বিশ্বস্ত প্রতিনিধি হঠাৎ ছদ্মবেশে যদি এ উপজেলা ভূমি অফিস পরিদর্শনে আসেন, তাহলে দেখতে পাবেন তার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ মাঠ পর্যায়ের ভূমি কর্মকর্তারা জনসাধারণকে সেবা দেয়ার নামে কীভাবে দফায় দফায় ঘুষ আর সেলামি আদায় করেন। আমরা আশা করব, ভূমিমন্ত্রী প্রতি মাসে একবারের জন্য হলেও মাঠপর্যায়ের ভূমি অফিসগুলো পরিদর্শন করবেন। যদি না করেন, তাহলে কি আমরা ধরে নেব তিনি জেনে-শুনে-বুঝে এ ‘ঘুষ-বাণিজ্য’ জিইয়ে রাখার পক্ষে? তাহলে এ থেকে কি আমাদের রক্ষা নেই?  

বড়লেখা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শারমিন সুলতানা জানান, যোগদানের পর থেকেই তিনি সরকার নির্ধারিত ফিজে নামজারীসহ অন্যান্য কাজ করে দিচ্ছেন। জনগণ যাতে হয়রানীর শিকার না হন এজন্যও তিনি বিভিন্ন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করেন। তিনি চেষ্টা করছেন ভূমি অফিসটি দালাল মুক্ত রাখার।  

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.