শামস শামীম, সুনামগঞ্জ | ২৫ জুন, ২০১৭
বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের বাড়ির ঘাটে আছড়ে পড়ছে কালনী নদী ও ভরাম হাওরের ঢেউ। কালনীর তীর ডুবে গেছে ভরামের বিস্তৃত জলে। রৌদ্রজ্জ্বোল দুপুর হাওরের বুকে রূপার থালা বিছিয়ে দিয়েছে। হাওর-নদী এখন একাকার। নিষ্প্রাণ ঘাট লাগোয়া কড়চ বৃক্ষগুলো জলে ডুবে সাপলুডু খেলছে। দূরের হাওরে মাছ ধরছে ফসলহারা কৃষক, তার কণ্ঠে বেদনার গান।
নৌকা থেকে নামার পরই বাউল সম্রাটের বাড়ি থেকে শোনা গেল ‘হাওর এলাকায় থাকি আমরা কৃষাণ/ হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করি ফলাই বোরো ধান/ এসে বন্যার জল, অকালে ডুবাইয়া নিল/হাওরের ফসল, মানুষ হয়েছে পাগল/ গরিবের নাই সহায় সম্বল বড়ই নিদান/...চৈত্র মাসে বৃষ্টির জলে নিল বোরো ধান, ভেবে মরি হায় কি করি বাঁচে কি না প্রাণ।’
শাহ আবদুল করিমের ভাগ্নে ও তার গানের পাণ্ডুলিপিকার বাউল শাহ আবদুল তোয়াহেদ গাইছেন তাঁর মুর্শিদ মামার লেখা এই গানটি। ফসল হারা কৃষকের আকুল আকুতি করুণ সুরে উগড়ে দিচ্ছেন। চোখ তাঁর ছলছল। কারণ, তাঁর পরিবারও ফসল হারিয়েছে। তার পাশে বসা বাউল সম্রাটের শিষ্য ও হাওর এলাকার সম্ভ্রান্ত কৃষক পরিবারের সন্তান বাউল রণেশ ঠাকুর। স্বভাবি রঙঢঙে তিনি গাইলেন বাউল সম্রাটের লেখা গান, ‘ঈদ আসলে কি দুঃখ দিতে?/আপন পর বেছে নিলে আসলে না সবার বাড়িতে...’।
বাউল সম্রাটের বাড়ির আঙ্গিনায় আষাঢ়ের রোদগলা দিনে ছায়ায় বসে গান শুনছিলেন গ্রামের কৃষক শরাফত উল্লাহ (৫৫)। তিনি জানান, দুর্যোগ-দুর্বিপাক হাওরের মানুষের নিত্য সঙ্গী। কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় এভাবে কখনো নিঃস্ব হয়নি হাওরবাসী। এবার সবার গোলা শূন্য, কারো ঘরে ভাত নেই। প্রতিদিন ভাতের জন্য অস্থির থাকতে হয় কৃষকদের। তাঁর জীবদ্দশায় এবছরের মতো কখনো আধপেটে খেয়ে ইফতার ও সেহরি করেননি তিনি।
তাঁর পাশে বসা তাড়ল গ্রামের ষাটোর্ধ কৃষক কাছা মিয়া। এসেছেন ধল বাজারে। গানের শব্দ শুনে নৌকা ভিড়িয়ে বাউল সম্রাটের বাড়িতে ছুটে এসেছেন। কাছা মিয়া এ বছর ৮ একর জমিতে চাষ করেছিলেন। খরচ হয়েছিল লাখ খানেক টাকা। সঞ্চিত সেই টাকা জমি তৈরিতে খরচ হওয়ায় এখন হাত শূন্য। হাওর ডুবে যাওয়ায় গোলায়ও ধান নেই। ছেলেরা এখন বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকের কাজ করছে। ঈদে নাতি-পুতিরা নতুন জামার আব্দার করলেও নির্বাক তিনি। পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তাদের থেকে।
কাছা মিয়া বলেন, "নাতিরা যখন কয়, দাদা ঈদ আইছে, নয়া কাপড় দিতানা? তখন আমার বুকটা ভাঙ্গি যায়। তাই পালাইয়া পালাইয়া থাকি।"
ঈদের জামার আব্দারের কারণে কৃষকরা সন্তান-সন্ততির কাছ থেকে পালিয়ে থাকেন, তাই নয়। হাওরে কিস্তির জাল ছড়ানো রাখা এনজিওর ঋণ থেকে বাঁচতেও অনেকে পালিয়ে থাকেন। এমনই একজন কাছা মিয়ার পাশে বসা উজানধল গ্রামের কৃষক নবী হোসেন। তিনি বলেন, "ব্রাক থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিছিলাম। কিস্তির জন্য এখন বাড়িত আইয়া বইয়া থাকে। তাই ভাইগ্যা (পালিয়ে) থাকি। তার ৩ একর জমি হাওরে তলিয়ে যাওয়ার পর খাবার সংকটে আছেন এই কৃষক। স্ত্রী ও চার সন্তানকে ঈদের জামা দেওয়া হয়নি। অথচ অন্যান্য বছর ফসল তোলার পর নতুন জামা এবং ঈদের জন্য আলাদা নতুন জামা-কাপড় কেনা হতো। এবার কোনটাই হয়নি।"
বাউল শাহ আবদুল তেয়াহেদ বলেন, "ফসল তোলার পর গ্রামে গ্রামে আমাদের গান গাওয়ার ডাক পড়তো। বিয়া-শাদিতে গান গাইতাম। এবার কেউ ডাকছে না। বিয়া-শাদীও হচ্ছে না। মানুষের ঘরে ভাত নাই। বাউলরার মন খারাপ। তারার কণ্ঠেও গান আসছে না।"
শাল্লা উপজেলার মাহমুদ নগর গ্রামের কৃষক ফুল মিয়া (৬৫) ছায়ার হাওরে ৭ একর জমি চাষ করেছিলেন। সম্পূর্ণ ফসল তলিয়ে গেছে তাঁর। এখন তিনি সপরিবারে গুঙ্গিয়ার গাও গ্রামে থাকেন। শাল্লা ডিগ্রি কলেজের বারান্দায় বসে তিনি পাটি বুনছেন। বিক্রি করে সেই টাকায় নাতিকে ঈদের জামা কিনে দেবেন।
ফুল মিয়া বলেন, "বাজান কি কইমু, ইবার সব নিছেগা। মহাপ্রলয় অইছে হাওরে। মাইনষের, গরু-বাছুরের, হাস-মুরগির খাবার নাই। ইলা ঈদ আমার জীবনে আয় নাই।"
তিনি জানান, প্রতি ওয়াক্তের খাবারের চিন্তা করতে গিয়ে মানুষ ঈদের আনন্দই ভুলে গেছে। সেহরি ও রোজা পালন করেছে নামমাত্র খেয়ে। গরিবরা হাত পেতে খাবারের সংস্থান করতে পারলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের অবস্থা শোচনীয়।
তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ঘুঙ্গিয়ার গাও কলেজ বস্তি এলাকায় ৭ম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ে আল্পনা আক্তারের সঙ্গে কথা বলছিলেন সাজেদা বেগম। পাশে এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছেলে অপু আহমদও কলেজে ভর্তি হওয়ার টাকা সংগ্রহ করে রাখার জন্য মাকে তাড়া দিচ্ছিল। আল্পনা বায়না ধরেছে, নতুন জামা কিনে দেওয়ার জন্য। দুই সন্তানের আবদার মেটাতে গিয়ে এই নারী হঠাৎ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। সন্তানদের উদ্দেশ্যে বলেন, "ভাতই খাইতে পারতাম না, জামা কাপড় কিতার? টাকা-পয়সা নাই, কিভাবে তোমরারে দিতাম? খাইয়া-পইড়া বাছি না, তোমরারে লেখাপড়া করামু কি দিয়া? আর লেখা-পড়া লাগতো না। যাও, গিয়া কাম করো।"
সাজেদা বেগম জানান, ফসল তোলার পর ঈদ এলে পরিবারে খুশির আমেজ বহুগুণ বাড়ে। নানা পিঠা তৈরি করেন। নতুন জামা পড়ে ছেলে-মেয়েরা আনন্দে গ্রাম ঘুরে বেড়ায়। এবার এই আনন্দ নেই। ঈদের পিঠাপুলি কৃষকের কাছে এবার স্বপ্ন।
একই উপজেলার ছব্বিশা গ্রামের স্বচ্ছল কৃষক সিরাজ মিয়া বলেন, আমি প্রতি বছর দেড় হাজার মণ ধান পাই। এবার দেড় মণ ধানও তুলতে পারিনি। ঘরে খাবার নাই। ৭টি গরু ছিল, চারটি বিক্রি করে এতদিন চলেছি। কয়েকদিন আগে বউয়ের দেড় ভরি স্বর্ণ বিক্রি করে দিয়েছি। সেই টাকায় এখন চলছি। এভাবে কতদিন চলতে পারব জানি না। ঈদের আনন্দ এবার হাওরের কৃষকের ঘরে নেই বলে জানান এই স্বচ্ছল কৃষক।
শাল্লা উপজেলার কামারগাঁও গ্রামের হতদরিদ্র কৃষক মজর আলী হাওরে এক একর জমি বর্গা চাষ করেছিলেন। বাঁধ ভেঙ্গে তলিয়ে গেছে সেই ফসল। স্বামী-স্ত্রী মিলে কাঁচা কিছু ধান তুলতে হাওরে নেমেছিলেন। কয়েক মুঠো কাঠার পর তাদের চোখের সামনে সেই ফসল ডুবে গেছে। যে কয়েক মুঠো ধান তুলতে পেরেছিলেন, সেই ৩০-৪০ কেজি কাঁচা ধান শুকিয়ে ঘরে রেখেছেন। ঘরে খাবার নেই। এখন সেই ধান গাইল-চিয়ায় ভানতে দেখা গেল।
মজর আলীর স্ত্রী ললিতা বেগম বলেন, "ঈদ আইলে আমরা ছেলে-পুলে নাতিনাশারে হান্দেশ, পিঠা, ফাপড়া, কাডা, ডোবা কইরা খাবাইতাম। ইবার ঘরে ভাত নাই, ঈদের পিঠাচিড়াও নাই। কেউর ঘরো নয়া কাপড়-চোপড়ও আয়নি।" শুধু তিনি নন, তাদের গ্রামের অভাবী ৯২টি পরিবারের কোন কৃষক তাঁর সন্তানকে নতুন জামা-কাপড় কিনে দিতে পারেননি।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গাচাষী, মাঝারি ও বড় কৃষক মিলিয়ে সুনামগঞ্জে ৫ শ্রেণির প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কৃষক পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার কৃষক পরিবার। গত মে মাস থেকে তিন মাসের জন্য যৎসামান্য ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও হতদরিদ্র প্রায় দেড় লাখ কৃষক। মধ্যবিত্ত (মাঝারি) ৬৩ হাজার ১৮৮ কৃষক এবং প্রায় ২০ হাজার উচ্চবিত্ত কৃষক পরিবার কোন সহায়তা পায়নি। সরকারি হিসেবে, এবার ২ লাখ ২৩ হাজার ৮২ হেক্টর জমির মধ্যে তলিয়েছে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬১২ হেক্টর। তবে সরকারি এই ক্ষতির বিবরণের সঙ্গে বাস্তব ক্ষয়-ক্ষতির চিত্র আরো বেশি বলে কৃষকরা জানান।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে হতদরিদ্র ১ লাখ ৫৯ হাজার পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল প্রদান করা হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, "ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আমরা ১০ কেজি করে ১ লাখ ৫৯ হাজার পরিবারকে চাল দিয়েছি। আরো দেড় লাখ কৃষক পেয়েছে ৪০ কেজি চাল ও ৫০০ টাকা। মোটামুটি আমরা তিন লাখ পরিবারকে সহায়তা করতে পেরেছি। এছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন হাওরের দুর্গত কৃষকদের নানাভাবে সহায়তা করছে।"