Sylhet Today 24 PRINT

আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যার্তদের মানবেতর জীবন

মারূফ অমিত |  ০৮ জুলাই, ২০১৭

লাঠি ভর করে হাঁটছেন ৭০ উর্ধ কবির মিয়া।  তার আশেপাশে বাচ্চারা খেলাধুলা করছে। তার বাড়িতে প্রায় তিন হাতের উপর পানি। এখন আশ্রয় নিয়েছেন এই আশ্রয়কেন্দ্রে।

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকার ফরিদপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার তিনটি আশ্রয়কেন্দ্রের একটি এটি। আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা কবির মিয়া জানালেন, তিনি এখানে ১৫ দিন যাতৎ আছেন পরিবার নিয়ে। স্কুলের ক্লাসরুমে জায়গা কম এবং মানুষ বেশি হওয়ায় অনেক গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে তাদের।

এই স্কুলে আশ্রয়ে থাকা একজন কচুর লতি পরিষ্কার করছেন। কথা বলে জানা গেলো, বাড়িতে পানি উঠার কারণে ৪ বাচ্চা নিয়ে তিনি প্রায় দুই সপ্তাহ থেকে আছেন এখানে। নাম নন্দিতা রাণী কর। তিনি জানালেন, উনি কর্মধা গ্রামের বাসিন্দা। তাদের বাড়ির ভেতর হাঁটু পানি। পানিবাহিত রোগের কারণে তার বাচ্চার ডায়রিয়া হয়েছিল। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে আসা মেডিক্যাল টিমের দেওয়া ঔষধে কিছুটা সেরেছে।

পাশেই বসে ছিলেন বাণি রানী কর। ত্রাণ পেয়েছিলেন কিনা তা জিজ্ঞেস করলে তিনি জানালেন, মোটামোটি চাল চিড়া পেয়েছি। নগদ পেয়েছি ৫ শ টাকা। তবে এটা দিয়ে বেশি দিন চলবে না বলে তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।

পাশের রুমে গিয়ে দেখা গেলো সঞ্জু রাণী কর নামের আরেজনকে। চুপচাপ বসে আছেন মুখ ভার করে। ত্রাণ পেয়েছেন কিনা তা জিজ্ঞেস করলেই বলে উঠেন, কিছুই পাইনি আমি। চাল চিড়া চিনি অনেক কিছুই বিতরণ হয়েছে কিন্তু আমার নাকি লিস্টে নাম নাই । তাই কিছুই পাইনি। আমি থাকব কেমনে, কি নিয়ে বাঁচব।

'যদি পারেন তবে আমার জন্য কিছু করেন' বলেন তিনি।

আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রিতদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত ত্রাণ পাচ্ছেন না তারা। এছাড়া টয়লেট ব্যবস্থাও অপ্রতুল। ফলে দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। নানাধরণের রোগবালাইও ছড়িয়ে পড়ছে।

আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরতে ঘুরতে এসে হাজির হন রতন নামক একজন। তিনি স্কুল দপ্তরি। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সহায়তায় তিনি সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি জানালেন, এখানে ৩৮ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। তারা নিয়মিত ত্রাণ পাচ্ছে। এখন পর্যন্ত বাচ্চাদের কোন রোগবালাই হয়নি।

সঞ্জু রাণী করের ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ত্রাণ সবাইকে দেওয়া হয়েছে। আমি লিস্ট করেছি। তিনি গত সাপ্তায় এসেছেন তাই প্রথমে যা দেওয়া হয়েছিলো তা পাননি। পরবর্তীতে সবই পেয়েছেন।  

এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেল, এলাকার অনেক মানুষই এখন পানিবন্দি, দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। আশ্রয়কেন্দ্রের পাশে থাকা ওয়াসিম মিয়া এবং দেবব্রত পাল দ্বীপ জানালেন, আমাদের নিজস্ব উদ্যোগে অনেক মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করেছি। প্রতিদিন খুচড়ি রান্না করে আমরা আশ্রয়কেন্দ্র গুলোতে পৌছে দিচ্ছি নিজ উদ্যোগে।

উপজেলার আরেক আশ্রয় কেন্দ্র চন্ডিপ্রসাদ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়।

এই আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা ৪০ বছর বয়সী আশা রাউত জানান, আমরা বিলের পাশে থাকতাম। পানির কারণে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছি । কবে পানি কমে তা  উপরওয়ালাই জানেন।
তিনি জানালেন, মোটামোটি ত্রাণ পেয়েছেন। তবে আশংকায় আছেন তার বাচ্চা নিয়ে। দুদিন থেকে তার পাতলা পায়খানা হচ্ছে।

অন্য রুমে গিয়ে দেখা গেলো একজন চুপচাপ বসে আছেন। নাম জিজ্ঞেস করতেই বললেই শান্ত রাউত। কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতে বললেন, আমাদের আবার জীবন। কোন মতে বেঁচে আছি। পানিবিন্দি। কাম কাজ নাই। কিভাবে যে সংসার চালাবো আর নিজে বাঁচব তা কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।

ফেঞ্চুগঞ্জ সাব রেজিস্টার অফিসের বারান্দায়ও অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন। যদিও প্রশাসন এটিকে আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করেননি। তাদের সাথে কথা বলে জানা গেল, তারা বেদে জনগোষ্ঠি।

ফেঞ্চুগঞ্জ বন্যা মনিটরিং সেল এর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রভাত চন্দ্র পাল জানান, আমাদের উপজেলায় তিনটি আশ্রয় কেন্দ্রে ফরিদপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, চন্ডিপ্রসাদ মডেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, এবং ছত্তিশ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মোট ২৮৩ জন মানুষ আছেন। তাদেরকে ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ মেডিক্যাল টিম স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি জানান, আমরা গত ৫ জুলাই ছত্তিশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থাপিত বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রে ৬ টি পরিবারের ২৬ জন মানুষকে ওয়াটার পিউরিফিকেশন ট্যাবলেট এবং হাইজেনিক কিট দিয়েছে। এছাড়া ত্রাণ  পাচ্ছেন পর্যাপ্ত।  

উল্লেখ্য, ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বন্যায় উপজেলার প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ পানিবন্দি। এলাকার লোকজন গরু-বাছুর, হাঁস, মুরগিসহ অন্যান্য প্রাণী নিয়ে দুর্ভোগের সাথে দিনাতিপাত করছেন। উপজেলার ভেলকোনা, সুরিখান্দি, সাইল খান্দি, গংগাপুর, ছত্তিস, পিটাইটিক, বাগমারা, ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার, ভরাউট, ৯০ মেগাওয়াট, বারহাল, ঘিলাছড়া, খড়িয়া টিলা, পাঠান চক, আটঘর, দিনপুর, চানপুর, দনারামসহ প্রায় ৫০টি গ্রামের মানুষের বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে। বন্যার পানি দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি দিনদিন মারাত্মক রূপ ধারণ করছে। বর্তমানে উপজেলার প্রায় ৬০ ভাগ মানুষ দুর্ভোগে পোহাচ্ছেন।  

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.