তপন কুমার দাস, বড়লেখা | ০৯ জুলাই, ২০১৭
ঢেউয়ের পর ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে ঘরের ভিটায়। ঢেউয়ে ঘরের ভিটার মাটি ভাসিয়ে নিয়েছে। অনেক ঘরের ঘরের বেড়া ভেঙে পানির স্রোতে মিশে যাচ্ছে। কোনোটার বেড়া ভেঙে পড়েছে। মাটিশূন্য ভিটের মধ্যে বাঁশের খুঁটির উপর দাঁড়িয়ে আছে ঘর। টিকে থাকতে না পেরে বাড়িঘর ছেড়ে অনেকেই ছুটে গেছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। কেউবা গেছেন আত্মীয়স্বজনের বাড়ি।
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নের হাকালুকি হাওর পারের ভোলারকান্দি গ্রামে এখন এরকম বিধ্বস্ত ঘরবাড়ির সংখ্যা অনেক। ভোলারকান্দির পাশাপাশি আমবাড়ি, বাঘমারা, উত্তর বাঘমারা, দশঘরি, পাল্লা, বাড্ডা, বারোআলি, শালদিঘা, শান্তিনগর, পাটনাসহ হাওর পারের গ্রামগুলোর প্রায় পাঁচশতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে আফালে (ঢেউয়ে)। বন্যার পর আফালের আতঙ্ক হাকালুকি পাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে। গতকালের (শনিবার) বিকেলে হাওরে আফাল (ঢেউ) উঠছিল। এতে আরো শতাধিক ঘরের বেড়া ভেঙে পড়েছে।
ভোলারকান্দি থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে সুজানগর বাজারের কাছে ছিদ্দেক আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া ভোলারকান্দি গ্রামের পারভিন বেগম শনিবার বলেন, ‘আশ্রয়কেন্দ্রে আছি। বাড়ির অবস্থা খুব খারাপ। খোঁজ নিতাম পাররাম না। আফালে (ঢেউয়ে) পালং ভাসাই নিছে। ঘরর বেড়া ভাঙি গেছে। পানি কমলেও ঘর বানাইয়া যাইতাম পারাতম নায়। আফালে ভাঙা ঘর কিলা বানাইতাম (তৈরি করতামা) চিন্তায় আছি। কেউ সায্য (সাহায্য) না দিলে বানাইতাম (তৈরি) পারতাম নায়।’
শনিবার সকালের দিকে আজিমগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ছিদ্দেক আলী উচ্চ বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে আসা অনেকের সাথে কথা হয়। তাদের প্রায় সবারই কমবেশি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আশ্রয়কেন্দ্রের বাসিন্দা সোয়াদা বেগম বলেন, ‘বাড়িঘর না থাকায় ঘরর আসবাবপত্র চুরি অই গেছে। নৌকা ছাড়া বাড়িতে যাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। পানি কমলে তো বাড়িত যাইতাম পারতা নায়। ঘর বানাইয়া যাইতে অইব। ঘর বানানির টাকা লাগব। টাকার চিন্তায় রাইত (রাতে) ঘুম অয় না।’
ভোলারকান্দি গ্রামের তাজিরুন বেগম (৩৫) বলেন, ‘আফালে ঘরর কুন্তা (কিচ্ছু) রাখছে না। পরশু দিন (গত বৃহস্পতিবার) গিয়া দেখছি। ঘরর অবস্থা নাই। কোনদিন যে ঘরে যাইতাম পারমু জানি না। কিলা ঘর ঠিক করমু ভাবিয়া পাইরাম না।’
কুটি বিবি (৪৫) বলেন, ‘সারা ঘর দুয়ার পানিয়ে নিছেগি।’ পানি ও ঢেউয়ে ঘর ভেঙে যাওয়ার কথা জানালেন, মজিরুন বেগম, চমক বেগম, শফিকুল ইসলাম, তছিরুন বেগম, আখতার আলী, মনাই মিয়া, রোশনা বেগম, নাছিমা বেগম, সালাম উদ্দিন, উরপুর বেগম,আজমিলা বেগম, মনাই মিয়া প্রমুখ।
আলেকজান বেগম বলেন, ‘ঘরবাড়ি সারা নিছেগি। কল্লা ফলাইবার (মাথা ফেলার) জায়গা নাই। নিরুপায় হয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে আইছি। আল্লায় জানইন কোনদিন বাড়িত যাইমু। বাড়িত গিয়া ঘর কিলা ঠিক করমু এই টকাও নাই।’
বড়লেখা উপজেলার তালিমপুর, দাসেরবাজার, সুজানগর, নিজবাহাদুরপুর, বর্নি, উত্তর শাহবাজপুর, দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে বন্যা। হাকালুকি হাওরের বন্যায় মৌলভীবাজারের এ উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের প্রায় দেড় লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দী। উপজেলার শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও বন্ধ আছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পানিবাহিত রোগ-ব্যাধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত এক সপ্তাহে বড়লেখা উপজেলায় হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে শতাধিক ডায়রিয়া রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। পানি কমায় বন্যার কিছুটা উন্নতি হলেও পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগ কমেনি।
সুজানগর ইউনিয়নের ভোলারকান্দিসহ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, অনেক বাড়িঘর ঢেউয়ে ভেঙে পড়েছে। অনেকে ঘরের মধ্যে মাচা বেঁধে বসবাস করছেন। রান্নাঘর ডুবে যাওয়ায় থাকার ঘরে রান্নাবান্না করছেন।
ভোলারকান্দি গ্রামের আব্দুল মুতলিব ঘরসহ বেশকিছু ঘর দেখা গেল, বেড়া ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে গেছে। বেড়ার স্থান ফাঁকা হয়ে আছে। গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তের সুরমান আলী ও রিপন মিয়া বাড়ির পাঁচটি ঘরের প্রায় সবকটি ঘরেরই ভিটের মাটি ভাসিয়ে নিচ্ছে ঢেউ। বাড়ির তিনটি ঘরে পানি উঠায় এরা যে ঘরগুলোতে পানি উঠেনি, সেগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন। গ্রামের বাসিন্দা মৎস্যজীবী মুফিজ আলী বলেন, ‘কুনু (কোনো) ঘরর পিছ (পেছন) নাই। আফালে সারা মাটি লইয়া গেছেগি। আমার ঘরটি শূন্যর উপর আছে। যে কোন সময় ভাঙিয়া পড়বে।’
এদিকে হাকালুকি হাওরে পানি বেশি হওয়ায় মাছ কম ধরা পড়ছে। এতে বন্যাকবলিত এলাকার মৎস্যজীবীরা জীবিকা সংকটে পড়েছেন। ভোলারকান্দি গ্রামের রিপন মিয়া বলেন, ‘হাওরে দুইদিনে ১৯০ টাকার মাছ পাইছি। চাউল-তেল কুন্তা আনা যার না। বেসরকারিভাবে একদিন ত্রাণ পাইছি। সরকারিভাবে কোনতা পাইছি না। কষ্টের কথা কেউর কইবার নায়।’ এরকম মাছ না পাওয়ায় জীবিকা-সংকটের কথা জানালেন সুরমান আলীসহ অনেকে মৎস্যজীবী।
সুজানগর ইউপি চেয়ারম্যান নছিব আলী রোববার রাতে সিলেটটুডেকে বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে ৫০০ এর উপরে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন মানুষের নতুন আতঙ্ক হচ্ছে আফাল (ঢেউ)। গতকালের (শনিবার) বিকেলে আফাল (ঢেউ) উঠছিল। এতে শতাধিক ঘরের বেড়া ভেঙে পড়েছে। আফালে (ঢেউয়ে) ইউনিয়নের গ্রামীন তিনটি কাছা রাস্তা একেবারে ভেঙে গেছে। এগুলো থাকার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ঢেউয়ে ঘরের বেড়া ভেঙে ফেলেছে। এখন পানি কমলে রাস্তা, ঘর নির্মাণের জন্য জরুরিভিত্তিতে মাটি ও ঢেউটিন দরকার।’
বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম আব্দুল্লাহ আল মামুন রোববার রাতে সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘পানি কিছুটা কমেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করা হচ্ছে। সরকারি বরাদ্দ যা পাচ্ছি, তাই দিচ্ছি। বন্যার পানি ও ঢেউয়ে বিধ্বস্ত ঘর তৈরি এবং ভিটা উঁচু করতে ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতার জন্য টিআর, কাবিখা, ইজিপিপি কর্মসূচির আওতায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায্য করার জন্য এক হাজার বান্ডেল ঢেউটিন বরাদ্ধ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।’